অটিস্টিক শিশুদের জন্য রোবট প্রযুক্তি

রোবট বলতে সাধারনত আমরা অনুভূতিহীন একটি যন্ত্র বলেই ধারণা করি। যেমন, তাদেরকে ব্যবহার করা হয় গাড়ি তৈরি করা, বোমা নিষ্ক্রিয়করন, কারখানায় পণ্য উৎপাদন ইত্যাদি নানারকম সুনির্দিষ্ট কিছু কাজে। কিন্তু বর্তমানে একদল গবেষক কাজ করছেন এই রোবট কে একটি ভিন্ন ধরনের কাজে ব্যবহার করার জন্য, আর তা হচ্ছে শিশুদের অটিজম চিকিৎসায় একে ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এই ধরনের শিশুরা মানুষের সাথে সঠিকভাবে তাদের অভিব্যাক্তি ও অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। এরা সাধারন মানুষের চেহারার অভিব্যাক্তিও বোঝতে অক্ষম হয়ে থাকে, এমনকি কখনো কখনো তারা পরিচিত মানুষের চেহারাও চিনতে পারে না। যার ফলে মানুষের সাথে মেলামেশায় তারা আগ্রহী হয়ে উঠে না। “আই ট্র্যাকিং” বা অটিস্টিক শিশুদের চোখের অভিব্যাক্তি নিয়ে একধরনের গবেষণায় দেখা গেছে, এইধরনের শিশুরা মানুষের মুখের দিকে তাকাতে পছন্দ করে না বরং কোন বস্তুর দিকে তাকাতেই তারা বেশি সাচ্ছ্বন্দবোধ করে। আর এই চিন্তা থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা” প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরী করেছেন “ব্যান্ডিট” ও “জেনো” নামক এক ধরনের বিশেষ রোবট। গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন যে, অটিস্টিক শিশুরা খুব সহজেই এই ধরনের রোবট দ্বারা আকর্ষিত হয়। অটিস্টিক শিশুরা রোবটের সাথে যেইভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করতে পারে, সাধারন মানুষের সাথে তারা তা করতে পারে না।

অটিজম চিকিৎসায় সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, অটিস্টিক শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার জন্য তাদেরকে খেলার সাথী দেয়া এবং সাধারন মানুষের সাথে মেলামেশায় আগ্রহী করে তোলা। সেই উদ্দেশ্যে গবেষকেরা “ব্যান্ডিট” রোবটে যোগ করেছেন নড়নচড়ন ও বিভিন্ন মানবীয় অভিব্যাক্তি প্রকাশে সক্ষম এমন মুখ যা সহজেই শিশুদেরকে আকর্ষণ করে, ক্যামেরাযুক্ত চোখ ও সেন্সরযুক্ত সংবেদনশীল হাত। রোবটের ক্যামেরাযুক্ত চোখ অটিস্টিক শিশুর সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে আর এর বিশেষ সেন্সরটি ব্যবহৃত হয় শিশুর সাথে খেলার সুবিধার জন্য। অর্থাৎ শিশুটি যদি রোবটটি হতে দূরে চলে যায়, তাহলে যাতে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে এর কাছাকাছি চলে আসতে পারে। “ব্যান্ডিট” রোবট খুব সহজেই অটিস্টিক শিশুর অভিব্যাক্তি অনুকরণ ও খেলা করতে পারে। রোবটটি যেমন তার চেহারায় সুখ-দুঃখের অভিব্যাক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারে সেই সাথে শিশুকে গান শোনানো, মুখে বাবল তৈরি করা ইত্যাদি কাজ আনায়েসেই করতে পারে। এই রোবটটির বাহ্যিক গঠন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে একে খুব বেশি যান্ত্রিক বলে মনে না হয়, আবার একদম মানুষের মতও মনে না হয়। অর্থাৎ অটিস্টিক শিশুটি যাতে রোবটটিকে একটি বন্ধুবৎসল কৃত্রিম খেলার সাথী মনে করতে পারে।

আরেক ধরনের রোবট হচ্ছে “জেনো”। এর বাহ্যিক গঠনে যুক্ত হয়েছে “ফ্লাবার” নামক এক বিশেষ ধরনের পলিমার, যার ফলে একে স্পর্শ করলে মানুষের চামড়ার মতই অনুভূতি পাওয়া যায়। মোটরের সাহায্যে এর মুখাবয়ব এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে এটি প্রায় দশ রকমের মানবীয় অভিব্যাক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারে। গবেষকেরা এই ধরনের রোবটকে এমন এক ধরনের সফটওয়্যারের নিয়ন্ত্রণে এনেছেন, যা কিনা অটিস্টিক শিশুদের আচার-আচরণ ও অভিব্যাক্তির ভাল ও খারাপ দিকগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে নির্ণয় করতে সাহায্য করে, যা শিশুদের অটিজম চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করে।

গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন যে, এই ধরনের রোবটের সহায়তায় অটিস্টিক শিশুরা ধীরে ধীরে খেলতে ও কথা বলতে শিখছে। এমনকি তারা সাধারন মানুষের সাথেও মিশতে আগ্রহী হয়ে উঠছে। এই ধরনের প্রযুক্তি ভিত্তিক চিকিৎসায় সহজেই অটিস্টিক শিশুরা নিয়মিতভাবে তাদের অনুভূতিগুলো আদান-প্রদান করতে শিখে আর সেই সাথে সামাজিক আচরণগুলোর প্রতিও সক্রিয় হয়ে উঠে।

প্রকৃতপক্ষে, অটিস্টিক শিশুদের চিকিৎসায় ব্যাবহৃত এই ধরনের রোবট তাদের মানসিক উন্নয়নে একধরনের সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে। কারন এই ধরনের রোবট কখনো তাদের প্রতি বিরূপ আচরণ করে না বরং এটি অক্লান্তভাবে অটিস্টিক শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য কাজ করে যায়।

(ওয়েবসাইটের তথ্য অবলম্বনে)

সাইদুর রহমান সুজন

যন্ত্রকৌশল বিভাগ

৪র্থ বর্ষ, চুয়েট

sujan1380@gmail.com