আত্মজীবনী : ভাস্কর ভট্টাচার্য্য

চট্টগ্রাম ভার্সিটির ৩০১ নং কক্ষে সাধারণ ইতিহাস বি.এ. অনার্স প্রথম বষের্ ও ক্লাশ চলছে। শিক্ষকের নির্দেশনায় সকলেই ক্লাশে নোট নিচ্ছিলেন। একজন শিক্ষার্থী ( দৃষ্টি প্রতিবন্ধী) তিনি ও অন্যদের ন্যায় নোট নিচ্ছিলেন। তবে তার নোট নেওয়ার পদ্ধতি ছিল অন্যদের তুলনায় ভিন্ন অর্থাৎ ব্রেইল  পদ্ধতি। শিক্ষক ভাবলেন ,তিনি খেলছেন। ঈষৎ ভর্ৎসনার

সুত্রে জানতে চাইলেন তুমি খেলছো,নাকি শুনছো? শিক্ষক এবার তার উপর প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়ে নির্দেশ দিলেন,. তাকে ক্লাশ থেকে বেরিয়ে যেতে। নইলে আমি ডিপার্টমেন্টের হেডের নিকট অভিযোগ করতে বাধ্য হব। এবার শিক্ষার্থী  বিনয়ের সহিত শিক্ষককে বোঝালেন, দেখুন স্যার আমি ব্রেইল শ্লেটে নোট নিচ্ছি। আমি খেলছিনা। তিনি লেখাগুলি পড়ে শোনা লেন। শিক্ষক যার পর নাই খুশী হলেন। অভিভূত হয়ে বললেন, একি যাদু! এভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বন্ধুটি সারা ক্লাসে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলেন। ক্রমে অন্ধকার থেকে উৎসারিত হলেন আলোর পানে। তার নাম ভাস্কর ভট্রাচার্য্য। তার পিতা শ্রীতোষ ভট্টাচার্য্য একজন সরকারী চাকুরীজীবি ও মাতা মিসেস শ্রীতোষ একজন আদর্শ গৃহিনী। পরিবারে দু’ ভাইয়ের মধ্যে ভাস্কর বড়। ১৯৭৯ সালের ১লা জুলাই চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার বাগদন্ডী গ্রামে তার জন্ম।

জন্মের পর চোখে মুখে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে দু’বছর বয়সেই দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ছিলেন ভাস্কর। ভাস্কর যত বড় হতে থাকে ততই বাবা মা ওস্বজনদের মনোবেদনার যন্ত্রনা বেড়ে যায় এই দৃষ্টিহীন ছেলেকে নিয়ে তারা কোথায় যাবে? কি হবে ভাস্করের ভবিষ্যৎ? পড়ালেখাই বা করবে কিভাবে? বাবা মা যখন সমস্ত আশা নিমজ্জনের মুখে এসব মনোবেদনার যন্ত্রনায় ভুগছিলেন তখনি এক চক্ষু চিকিৎসকের পরামর্শে  শহরে একটি দৃষ্টিহীনদের প্রাইমারী স্কুলের সন্ধান পেলেন। ভাস্কর গ্রাম ছেড়ে শহরে এলেন। মুরাদপুর অন্ধ সরকারী বিদ্যালয় হতে তিনি পাইমারী পাঠ শেষ করেন। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ার বই কোথাও আছে কোথাও নেই, ব্রেইল পেপার, ব্রেইল ফ্রেমের স্বল্পতা এমনি পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে তিনি স্কুল কলেজের পাঠ শেষ  করেন। কিন্তু সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়ে তিনি পড়েন এক বিপত্তিতে। দৃষ্টিহীন ছাত্রদের ভর্তির ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনীহা। কেননা শিক্ষকগন জানেন না কিভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রদের শিক্ষা পদ্ধতি কেমন। এসময় বেঁকে বসলেন প্রতিবাদী ভাস্করের সাথে আরো ক’জন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী। যারা তাদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত, সামনে তারা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখবেন বলে দৃঢ়বাদী। সকলে মিলে শুরু করেন আমরণ অনশন। অবশেষে  তাদের পক্ষে বেশ কিছু শিক্ষক সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। ভাস্কর শেষ পর্যন্ত ভর্তি হলেন স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃতিত্বের সাথে অনার্স এবং মাষ্টার্স সম্পন্ন করেন।

 

ভাস্করের মনে দাগ কেটে আছে বিভিন্ন ঘঁটনার। যেমন একবার বিশ্ব সাদা ছড়ি দিবস উপলক্ষ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ভাস্কর। সাদা ছড়ি নিয়ে তিনি উক্ত অনুষ্ঠানস্থলে যান। প্রবেশমুখে তিনি বাধাঁপ্রাপ্ত হন। সরকারী কর্মীটি তার সাথে কোন বাক্য বিনিময় না করে দৃষ্টিহীন হিসেবে তার হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে যেন তার দায়িত্ব শেষ করেন। সে মুহুর্তে অপমানে, আত্মগ্লানিতে নিজেকে একটা ক্লেদাক্ত যন্ত্রনার মত মনে হয়েছিল ভাস্করের কাছে। অবশেষে বিনয়ের সাথে তিনি আমন্ত্রণপত্রটি দেখান। তখন কর্মকর্তাটি সলজ্জ হাসিতে ভাস্করের কাছে ক্ষমা চান। এরপর উক্ত কর্মকর্তা সেমিনারে বক্তব্য রাখাকালীন তার ব্যক্তি জীবনের শিক্ষা হতে সবাইকে দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, প্রতিবন্ধীদের যাতে ছোট করে না দেখা হয়।

 

ভাস্করকে  কখন ও লজ্জার, কখন ও কষ্টের এমনতরো অনেক অভিজ্ঞতা  নাড়া দিয়েছে। পড়াশুনার পরে অন্যান্য প্রতিবন্ধীদের ন্যায় তিনি ও চাকুরী নামের সোনার হরিণের ন্যায় পিছনে ছুটেছেন। কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা কিভাবে কি কাজ করবেন এমন অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের বিভিন্ন সংস্থাগুলোতে জানা ছিল না। তাই তিনি সুযোগ খুঁজছিলেন অদূর ভবিষ্যতে কিভাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন। তিনি পেয়ে যান সেই সুযোগ। সুযোগ পেলেন জাপানে ট্রেনিং এর। ভাস্কর জাপানে এলেন সম্পূর্ন নতুন পরিবেশে। নতুনভাবে জীবন শুরু করেন। ট্রেনিং এর অংশ হিসেবে তিনি জাপানী ব্রেইল সিস্টেম, ডিজিটাল একসেসিবল ইনফরমেশন সিস্টেম, জাপানী ব্লাইন্ড স্কুল সিস্টেম, জাপানী ব্রেইল লাইব্রেরী সিস্টেম,জাপানী ল্যাংগুয়েজ ও ব্রেইল,সেল্টারড ওয়ার্কশপ ও লিডারশীপ এবং কম্পিউটার এন্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি ট্রেনিং পান। তিনি ২০০২ সালে জাপানে বছরব্যাপী ৪র্থ ডাস্কিন লিডার শীপ ট্রেনিং শেষ করে দেশে ফিরেন।এই ট্রেনিং ভাস্করকে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে জীবন গঠনে সাহায্য করে। ভাস্করের মতে, জাপান খুব সুন্দর দেশ। দেশটির  অবকাঠামো প্রতিবন্ধীদের জীবন যাত্রার জন্য খুবই মসৃণ ও সহজ। জাপানী নারীরা খুবই দয়ার্দ্র। জাপানীরা তাদের পারিবারিক আবহে যে সময় কাটায় তার চেয়ে বেশী সময় অতিবাহিত করে নিজেদের পেশাগত জীবনে। জাপানীরা ঘরে প্রবেশের পূর্বে নিজেদের জুতা খুলে ঘরে প্রবেশ করে। যে কক্ষে তারা জুতা খুলে রাখে জাপানী ভাষায় তাকে বলে টাটামী রুম।

 

এ ছাড়া তিনি থাইল্যান্ডে ডাস্কিন লীডারশীপ ফলোআপ ট্রেনিং করেন।  তিনি বিশ্বেও নানা দেশে প্রশিক্ষন, কর্মশালা,থেকে অর্জিত ধারনা ও জ্ঞান সমুহ দেশে প্রতিবন্ধীদের কাজে লাগাবার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

বর্তমানে ভাস্কর বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ইপসা নামে একটি প্রতিষ্ঠানে প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত। যেখানে তিনি কাজ করছেন প্রতিবন্ধীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ন কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষন, ডেইজী ( ডিজিটাল একসেসিবল ইনফরমেশন সিস্টেম) বুক প্রোডাকশন, আমেরিকান জজ ( জব একসেস উইথ স্পিচ) সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কম্পিউটার শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা। এই সংস্থায় কাজের মাধ্যমে তার একটি আশা পূরণ হয়েছে তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য একটা কেন্দ্র কম্পিউটার ল্যাব করতে সক্ষম হয়েছেন। যেখান থেকে বিনা অর্থে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা কম্পিউটার সহ সংস্কৃতি, মৌলিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পড়া ,শেখা, তথ্য আবিষ্কার এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার ও কম্পিউটার শেখার বিকল্প নেই। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাড়া ও অন্যান্য প্রতিবন্ধীরা এই ল্যাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। এজন্য তিনি ইপসা’র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

ভাস্কর মনে করেন, কখনই প্রশিক্ষন লদ্ধ জ্ঞান অর্থহীন নয়। তিনি ভবিষ্যতে জাপানের ন্যায় দেশে একটি ব্রেইল লাইব্রেরী গড়ার ইচ্ছে লালন করে যাচ্ছেন। এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন ও সাকা ব্লাইন্ড সামিট( ওবিএস) ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ইউনিয়ন( ডব্লিউবিসি) কার্যক্রমগুলি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পক্ষে স্তিমিত হয়ে পড়েছে। তিনি মনে করেন, এখনই বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সহায়তা করার ও তাদের পক্ষে কথা বলার সময় ও সুযোগ এসেছে।

 

এতসবের পর ও তিনি রোটারী ক্লাব অব ইসলামাবাদ জেলা ৩২৪০ চট্টগ্রাম, ভিজুয়্যালী ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি, চিটাগং এসোসিয়েশন অব দা ব্লাইন্ড, চিলড্রেন লিউকোমিয়া এসিসটেন্স সাপোর্ট এন্ড সার্ভিসেস , চিটাগং সোসাইটি ফর ডিজএ্যাবল্ড সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছেন। ভাস্করের নানা শ্রেণী পেশার লোকের সাথে মিশতে ভালোবাসেন। অবসরে তিনি ই মেইলে নতুন নতুন বন্ধুত্ব করেন বন্ধুদের সাথে চ্যাট করতে  ভালোবাসেন। তিনি ইংরেজী ও জাপানী ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারেন।

 

আমি তোমাদেরই লোক:

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এই ২০ জন তরুণ-তরুণী নিয়ে প্রফেশনাল ডেভলোপমেন্ট ট্রেনিং শুরু হয় ২০০৭ সালে। প্রশিক্ষণ প্রকল্পটির সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন ইপসার পোগ্রাম অফিসার ভাস্কর ভট্টচার্য। প্রশিক্ষণে আসা

তরুণ-তরুণীদের উদ্ধুদ্ধ করা, তাদের অভাব অভিযোগ শোনাসহ সার্বক্ষণিক সাহচর্য দেওয়ার কাজটি হাসিমুখে করে যাচ্ছেন যে প্রানবন্ত তরুনটি তিনি নিজেও একজন দৃস্টি –  প্রতিবন্ধী । কম্পিউটার বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা ভাস্করের। জাপান, থাইল্যান্ড, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বাংলাদেশে ’ডেইজি ফর অল প্রজেক্টেও’ ফোকাল পারসনও তিনি।

২০০৪ সালে

প্রতিবন্ধীদের কম্পিউটার শেখার ব্যপারে তিনি বলেন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভিন্নভাবে গড়ে উঠতে সাহায্য করে। নির্ভরতাহীন জীবনযাত্রার জন্য কম্পিউটারই সেরা মাধ্যম। পাশের দেশ ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিবন্ধীরা ব্যাংক বীমাসহ কর্পোরেট সেক্টরগুলোতে যোগ্যতার সংঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের দেশে সেই তুলনায় এখনো তারা তেমন কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। একবার যদি চাকরীদাতারা প্রথাগত ধারনা থেকে বেরিয়ে এসে এদের যোগ্যতা যাচাই করে দেখেন,আমার মনে হয় তাদের চিন্তা ভাবনাই পাল্টে যাবে – বলেন ভাস্কর। তিনি বিশ্বাস করেন, সেদিন আসবেই যেদিন এসব শারিরীক অক্ষমতা মানুষকে আর দমিয়ে রাখতে পারবে না।

গেল মাসে ভাস্করের বিয়ে হলো । বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এই ২০ তরুণ তরুণী। হাসি আনন্দে মেতে পুরো অনুষ্ঠানটিকে মাতিয়ে তুলেছেন তারা।

নিজের সহকর্মী সম্পূর্ণ সুস্থ তরুণী শ্যমশ্রীকে ভালবেসে বিয়ে করেছেন ভাস্কর। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কী করে মন জয় করলেন এই তরুণীর? ভাস্করের সরস উত্তর, ওকে বলেছিলাম, সারা জীবন হাত ধরে রাখতে পারবে এমন লোক তুমি আর কোথায় পাবে? ব্যস কেল্লা ফতে। শ্যমশ্রী বললেন, ওর মতো এমন রুচিবান, সুরসিক মানুষ আর দেখিনি। ওর দৃষ্টিহীনতা আমাদের ভালোবাসার সংসারে কোন বাধাই নয়। তাহলে আর কী? আপনারা সুখী হোন।

ভাস্করের অভিপ্রায়  তার কর্মকান্ড দ্ধারা বাংলাদেশের প্রতিবন্ধীদের জীবনের বাঁধা সমূহ  অপসারিত করা। আমরা তার অব্যাহত প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই ও তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

২০০৪ সালে ভাস্কর বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ‘ইপসা‘ য় এ্যাকশন এইড’ বাংলাদেশ এর অর্থায়নে পরিচালিত ডিস্কন  প্রোগ্রামে মনিটরিং অফিসার’ হিসাবে যোগদান করেন । ইপসা’র প্রতিবন্ধীতা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হয়ে তিনি প্রতিবন্ধীদের সংগঠিত করার মাধ্যমে সংগঠন  গড়ে তোলার জন্য আগ্রহী হন এবং তিনি সারা সীতাকুন্ড ব্যাপী প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠন  গড়ে তোলে এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন এবং প্রায় ৪০ টি প্রতিবন্ধী স্বনির্ভর সংগঠন গড়ে তোলেন।

২০০৮ সালে তিনি প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে সীতাকুন্ডে  প্রতিবন্ধী ফেডারেশন গড়ে তোলে। এছাড়াও ডিজেবিলিটি রাইট ফোরাম এর পক্ষে তিনি সীতাকুন্ড ,রাঙ্গামটি,কাউখালী মিরস্বরাই ও অন্যান্য অঞ্চলেও প্রতিবন্ধী সংগঠন গড়ে তুলেছে।

ভাস্কর নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালেখি করেন। কম্পিউটার জগতের একজন নিয়মিত ই – লার্নিং ও তথ্য প্রযুৃক্তির  উপর নিয়মিতভাবে বিভিন্ন প্রবন্ধ লেখেন।

২০১০ সালে

আত্মজীবনী : ভাস্কর ভট্টাচার্য্য

 

চট্টগ্রাম ভার্সিটির ৩০১ নং কক্ষে সাধারণ ইতিহাস বি.এ. অনার্স প্রথম বষের্ ও ক্লাশ চলছে। শিক্ষকের নির্দেশনায় সকলেই ক্লাশে নোট নিচ্ছিলেন। একজন শিক্ষার্থী ( দৃষ্টি প্রতিবন্ধী) তিনি ও অন্যদের ন্যায় নোট নিচ্ছিলেন। তবে তার নোট নেওয়ার পদ্ধতি ছিল অন্যদের তুলনায় ভিন্ন অর্থাৎ ব্রেইল  পদ্ধতি। শিক্ষক ভাবলেন ,তিনি খেলছেন। ঈষৎ ভর্ৎসনার

সুত্রে জানতে চাইলেন তুমি খেলছো,নাকি শুনছো? শিক্ষক এবার তার উপর প্রচন্ড ক্ষেপে গিয়ে নির্দেশ দিলেন,. তাকে ক্লাশ থেকে বেরিয়ে যেতে। নইলে আমি ডিপার্টমেন্টের হেডের নিকট অভিযোগ করতে বাধ্য হব। এবার শিক্ষার্থী  বিনয়ের সহিত শিক্ষককে বোঝালেন, দেখুন স্যার আমি ব্রেইল শ্লেটে নোট নিচ্ছি। আমি খেলছিনা। তিনি লেখাগুলি পড়ে শোনা লেন। শিক্ষক যার পর নাই খুশী হলেন। অভিভূত হয়ে বললেন, একি যাদু! এভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বন্ধুটি সারা ক্লাসে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করলেন। ক্রমে অন্ধকার থেকে উৎসারিত হলেন আলোর পানে। তার নাম ভাস্কর ভট্রাচার্য্য। তার পিতা শ্রীতোষ ভট্টাচার্য্য একজন সরকারী চাকুরীজীবি ও মাতা মিসেস শ্রীতোষ একজন আদর্শ গৃহিনী। পরিবারে দু’ ভাইয়ের মধ্যে ভাস্কর বড়। ১৯৭৯ সালের ১লা জুলাই চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার বাগদন্ডী গ্রামে তার জন্ম।

জন্মের পর চোখে মুখে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণের ফলে দু’বছর বয়সেই দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ছিলেন ভাস্কর। ভাস্কর যত বড় হতে থাকে ততই বাবা মা ওস্বজনদের মনোবেদনার যন্ত্রনা বেড়ে যায় এই দৃষ্টিহীন ছেলেকে নিয়ে তারা কোথায় যাবে? কি হবে ভাস্করের ভবিষ্যৎ? পড়ালেখাই বা করবে কিভাবে? বাবা মা যখন সমস্ত আশা নিমজ্জনের মুখে এসব মনোবেদনার যন্ত্রনায় ভুগছিলেন তখনি এক চক্ষু চিকিৎসকের পরামর্শে  শহরে একটি দৃষ্টিহীনদের প্রাইমারী স্কুলের সন্ধান পেলেন। ভাস্কর গ্রাম ছেড়ে শহরে এলেন। মুরাদপুর অন্ধ সরকারী বিদ্যালয় হতে তিনি পাইমারী পাঠ শেষ করেন। ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ার বই কোথাও আছে কোথাও নেই, ব্রেইল পেপার, ব্রেইল ফ্রেমের স্বল্পতা এমনি পরিবেশে কঠোর পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে তিনি স্কুল কলেজের পাঠ শেষ  করেন। কিন্তু সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গিয়ে তিনি পড়েন এক বিপত্তিতে। দৃষ্টিহীন ছাত্রদের ভর্তির ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অনীহা। কেননা শিক্ষকগন জানেন না কিভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রদের শিক্ষা পদ্ধতি কেমন। এসময় বেঁকে বসলেন প্রতিবাদী ভাস্করের সাথে আরো ক’জন দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থী। যারা তাদের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত, সামনে তারা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রাখবেন বলে দৃঢ়বাদী। সকলে মিলে শুরু করেন আমরণ অনশন। অবশেষে  তাদের পক্ষে বেশ কিছু শিক্ষক সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। ভাস্কর শেষ পর্যন্ত ভর্তি হলেন স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে। কৃতিত্বের সাথে অনার্স এবং মাষ্টার্স সম্পন্ন করেন।

 

ভাস্করের মনে দাগ কেটে আছে বিভিন্ন ঘঁটনার। যেমন একবার বিশ্ব সাদা ছড়ি দিবস উপলক্ষ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একটি সেমিনারে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন ভাস্কর। সাদা ছড়ি নিয়ে তিনি উক্ত অনুষ্ঠানস্থলে যান। প্রবেশমুখে তিনি বাধাঁপ্রাপ্ত

হন। সরকারী কর্মীটি তার সাথে কোন বাক্য বিনিময় না করে দৃষ্টিহীন হিসেবে তার হাতে কিছু টাকা গুজে দিয়ে যেন তার দায়িত্ব শেষ করেন। সে মুহুর্তে অপমানে, আত্মগ্লানিতে নিজেকে একটা ক্লেদাক্ত যন্ত্রনার মত মনে হয়েছিল ভাস্করের কাছে। অবশেষে বিনয়ের সাথে তিনি আমন্ত্রণপত্রটি দেখান। তখন কর্মকর্তাটি সলজ্জ হাসিতে ভাস্করের কাছে ক্ষমা চান। এরপর উক্ত কর্মকর্তা সেমিনারে বক্তব্য রাখাকালীন তার ব্যক্তি জীবনের শিক্ষা হতে সবাইকে দৃষ্টি আকর্ষন করে বলেন, প্রতিবন্ধীদের যাতে ছোট করে না দেখা হয়।

 

ভাস্করকে  কখন ও লজ্জার, কখন ও কষ্টের এমনতরো অনেক অভিজ্ঞতা  নাড়া দিয়েছে। পড়াশুনার পরে অন্যান্য প্রতিবন্ধী

দের ন্যায় তিনি ও চাকুরী নামের সোনার হরিণের ন্যায় পিছনে ছুটেছেন। কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা কিভাবে কি কাজ করবেন এমন অভিজ্ঞতা আমাদের দেশের বিভিন্ন সংস্থাগুলোতে জানা ছিল না। তাই তিনি সুযোগ খুঁজছিলেন অদূর ভবিষ্যতে কিভাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন। তিনি পেয়ে যান সেই সুযোগ। সুযোগ পেলেন জাপানে ট্রেনিং এর। ভাস্কর জাপানে এলেন সম্পূর্ন নতুন পরিবেশে। নতুনভাবে জীবন শুরু করেন। ট্রেনিং এর অংশ হিসেবে তিনি জাপানী ব্রেইল সিস্টেম, ডিজিটাল একসেসিবল ইনফরমেশন সিস্টেম, জাপানী ব্লাইন্ড স্কুল সিস্টেম, জাপানী ব্রেইল লাইব্রেরী সিস্টেম,জাপানী ল্যাংগুয়েজ ও ব্রেইল,সেল্টারড ওয়ার্কশপ ও লিডারশীপ এবং কম্পিউটার এন্ড ইনফরমেশন টেকনোলজি ট্রেনিং পান। তিনি ২০০২ সালে জাপানে বছরব্যাপী ৪র্থ ডাস্কিন লিডার শীপ ট্রেনিং শেষ করে দেশে ফিরেন।এই ট্রেনিং ভাস্করকে আত্মপ্রত্যয়ী

হয়ে জীবন গঠনে সাহায্য করে। ভাস্করের মতে, জাপান খুব স›ুদর দেশ। দেশটির  অবকাঠামো প্রতিবন্ধীদের জীবন যাত্রার জন্য খুবই মসৃণ ও সহজ। জাপানী নারীরা খুবই দয়ার্দ্র। জাপানীরা তাদের পারিবারিক আবহে যে সময় কাটায় তার চেয়ে বেশী সময় অতিবাহিত করে নিজেদের পেশাগত জীবনে। জাপানীরা ঘরে প্রবেশের পূর্বে নিজেদের জুতা খুলে ঘরে প্রবেশ করে। যে কক্ষে তারা জুতা খুলে রাখে জাপানী ভাষায় তাকে বলে টাটামী রুম।

 

এ ছাড়া তিনি থাইল্যান্ডে ডাস্কিন লীডারশীপ ফলোআপ ট্রেনিং করেন।  তিনি বিশ্বেও নানা দেশে প্রশিক্ষন, কর্মশালা,থেকে অর্জিত ধারনা ও জ্ঞান সমুহ দেশে প্রতিবন্ধীদের কাজে লাগাবার জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

বর্তমানে ভাস্কর বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ইপসা নামে একটি প্রতিষ্ঠানে প্রোগ্রাম অফিসার হিসেবে কর্মরত। যেখানে তিনি কাজ করছেন প্রতিবন্ধীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, তাদের জন্য মর্যাদাপূর্ন কর্মসংস্থানের জন্য দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষন, ডেইজী ( ডিজিটাল একসেসিবল ইনফরমেশন সিস্টেম) বুক প্রোডাকশন, আমেরিকান জজ ( জব একসেস উইথ স্পিচ) সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কম্পিউটার শেখার সুযোগ সৃষ্টি করা। এই সংস্থায় কাজের মাধ্যমে তার একটি আশা পূরণ হয়েছে তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য একটা কেন্দ্র কম্পিউটার ল্যাব করতে সক্ষম হয়েছেন। যেখান থেকে বিনা অর্থে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা কম্পিউটার সহ সংস্কৃতি, মৌলিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি মনে করেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পড়া ,শেখা, তথ্য আবিষ্কার এবং স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার জন্য তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার ও কম্পিউটার শেখার বিকল্প নেই। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাড়া ও অন্যান্য প্রতিবন্ধীরা এই ল্যাবে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন। এজন্য তিনি ইপসা’র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

ভাস্কর মনে করেন, কখনই প্রশিক্ষন লদ্ধ জ্ঞান অর্থহীন নয়। তিনি ভবিষ্যতে জাপানের ন্যায় দেশে একটি ব্রেইল লাইব্রেরী গড়ার ইচ্ছে লালন করে যাচ্ছেন। এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন ও সাকা ব্লাইন্ড সামিট( ওবিএস) ওয়ার্ল্ড ব্লাইন্ড ইউনিয়ন( ডব্লিউবিসি) কার্যক্রমগুলি দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পক্ষে স্তিমিত হয়ে পড়েছে। তিনি মনে করেন, এখনই বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সহায়তা করার ও তাদের পক্ষে কথা বলার সময় ও সুযোগ এসেছে।

 

এতসবের পর ও তিনি রোটারী ক্লাব অব ইসলামাবাদ জেলা ৩২৪০ চট্টগ্রাম, ভিজুয়্যালী ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি, চিটাগং এসোসিয়েশন অব দা ব্লাইন্ড ,চিলড্রেন লিউকোমিয়া এসিসটেন্স সাপোর্ট এন্ড সার্ভিসেস , চিটাগং সোসাইটি ফর ডিজএ্যাবল্ড সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত রয়েছেন। ভাস্করের নানা শ্রেণী পেশার লোকের সাথে মিশতে ভালোবাসেন। অবসরে তিনি ই মেইলে নতুন নতুন বন্ধুত্ব করেন বন্ধুদের সাথে চ্যাট করতে  ভালোবাসেন। তিনি ইংরেজী

 

আমি তোমাদেরই লোক:

 

দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এই ২০ জন তরুণ-তরুণী নিয়ে প্রফেশনাল ডেভলোপমেন্ট ট্রেনিং শুরু হয় ২০০৭ সালে। প্রশিক্ষণ প্রকল্পটির সমন্বয়কারীর দায়িত্ব পালন করছেন ইপসার পোগ্রাম অফিসার ভাস্কর ভট্টচার্য। প্রশিক্ষণে আসা

তরুণ-তরুণীদের উদ্ধুদ্ধ করা, তাদের অভাব অভিযোগ শোনাসহ সার্বক্ষণিক সাহচর্য দেওয়ার কাজটি হাসিমুখে করে যাচ্ছেন যে প্রানবন্ত তরুনটি তিনি নিজেও একজন দৃস্টি –  প্রতিবন্ধী । কম্পিউটার বিষয়ে অসাধারণ দক্ষতা ভাস্করের। জাপান, থাইল্যান্ড, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। বাংলাদেশে ’ডেইজি ফর অল প্রজেক্টেও’ ফোকাল পারসনও তিনি।

নিজের সহকর্মী সম্পূর্ণ সুস্থ তরুণী শ্যমশ্রীকে ভালবেসে বিয়ে করেছেন ভাস্কর। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, কী করে মন জয় করলেন এই তরুণীর? ভাস্করের সরস উত্তর, ওকে বলেছিলাম, সারা জীবন হাত ধরে রাখতে পারবে এমন লোক তুমি আর কোথায় পাবে? ব্যস কেল্লা ফতে। শ্যমশ্রী বললেন, ওর মতো এমন রুচিবান, সুরসিক মানুষ আর দেখিনি। ওর দৃষ্টিহীনতা আমাদের ভালোবাসার সংসারে কোন বাধাই নয়। তাহলে আর কী? আপনারা সুখী হোন।

ভাস্করের অভিপ্রায়  তার কর্মকান্ড দ্ধারা বাংলাদেশের প্রতিবন্ধীদের জীবনের বাঁধা সমূহ  অপসারিত করা। আমরা তার অব্যাহত প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানাই ও তার দীর্ঘায়ু কামনা করি।

২০০৪ সালে ভাস্কর বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা ‘ইপসা‘ য় এ্যাকশন এইড’ বাংলাদেশ এর অর্থায়নে পরিচালিত ডিস্কন  প্রোগ্রাম।