সাবরিনা সুলতানা – বি-স্ক্যান প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি

তিনি বাংলাদেশের একজন ব্লগার । পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ ব্লগারদের মাঝে তিনি একজন যিনি ইন্টারনেটকে ব্যবহার করে লিখতে ভালবাসেন। কিন্ত তিনি অন্য সকলের থেকে আলাদা কারণ তিনি লিখেন হৃদয় থেকে।

সত্যটা হলো তিনি অন্য সকলের মত লিখতে পারেন না, তিনি শুধু  ল্যাপটপের বোতামগুলো চাপতে পারেন তার কার্যক্ষম মাত্র দুটি আঙ্গুলে। কিন্তু তার হৃদয় অবিরাম স্পন্দিত হয়ে চলে লেখার মাধ্যমে নিজের ভাবনাগুলো প্রকাশের আকাংক্ষায়।

বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে সাবরিনার এই পথ চলা শুরু হয়। ১৯৯৮ সালে দৈনিক আজাদীতে তার প্রথম লেখা ছাপা হয় “স্বপ্ন কখনও সত্যি হয় না” শিরোনামে। যে মেয়েটি দু’বেনি দুলিয়ে দুষ্টুমী করে বেড়াতো সারা বাড়িময় তার সেই চঞ্চলতা থেমে গেল সাত বছর বয়সে মাস্কুলার ডিস্ট্রফী নামক ভয়ংকর রোগের আঘাতে। এই রোগ ধীরে ধীরে শরীরের সকল মাংসপেশীর কার্যক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। পঞ্চম শ্রেণীতে থাকাকালীন সময়ে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষকের পরামর্শে। বাবা মাও ভাবলেন ঘরে বসেই যা পারে শিখুক।

সাবরিনার প্রতিবন্ধিতাকে নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখিন করে তুললো। চারদেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে যেতে বাধ্য হলো। বন্ধ হয়ে গেল স্কুলে যাওয়া, সামাজিক মেলামেশা,  আত্মীয় স্বজনের বিয়ে বা কোন জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়া। এই জীবনকেই মেনে নিয়েছিলো সাবরিনা স্বাভাবিক ভেবেই। কিন্তু কয়েক বছর না যেতেই ছোট বোনেরও একি রোগে আক্রান্ত হওয়া সাবরিনা মেনে নিতে পারেননি। প্রচন্ড হতাশা ও ক্ষোভ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন যা জাতীয় ও চট্টগ্রামের স্থানীয় দৈনিকে ছাপা হয়েছিলো। ২০০৮ এর সে সময়টায় ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাইরের পৃথিবীর সাথে তার প্রথম যোগাযোগ। সোসাল নেটওয়ার্কিং এর জগৎ ফেসবুকে এসে নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করলেন। ফেসবুকেই পরিচয় হলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন মানুষের সাথে। এই চিঠিটি এখানে প্রচারের মাধ্যমে মানুষকে সচেতনত করতে শুরু করলেন। এ করতে গিয়ে ফেসবুকেই পরিচয় পোলিওতে আক্রান্ত সালমা মাহবুবের সাথে। মনে মনে এমন কাউকেই যেনো খুঁজে বেড়াচ্ছিলেন স্বপ্ন পূরণের সাথী হিসেবে। মূলত এই চিঠিকে কেন্দ্র করেই ফেসবুকে ১৭ই জুলাই ২০০৯ এ গড়ে উঠে বাংলাদেশী সিস্টেমস চেঞ্জ এ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক (বি-স্ক্যান) একটি সেচ্ছাসেবী সংগঠন। যার উদ্দেশ্য ছিল প্রতিবন্ধী মানুষ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরী করা এবং দৃষ্টিভংগী পরিবর্তন করা। ফেসবুকের পাশাপাশি তখন থেকেই ব্লগকে এই প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়া হয়। পত্রিকায় যেমন একটি লেখা দিলে সেটা ছাপতে প্রচুর সময় নেয় অন্যদিকে ব্লগে লেখা ছাপা হয়ে যায় ততক্ষনাৎ। তাই খুব সহজেই বি-স্ক্যান এর ভাবনাগুলো ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মহলে। অনেকেই এগিয়ে আসেন একসাথে কাজ করা অঙ্গীকার নিয়ে। সাবরিনার লেখা এভাবে পৌছে যায় জার্মানীর সংবাদ সংস্থার আয়োজিত ডয়েচে ভ্যালে ব্লগ প্রতিযোগিতায়। তারা প্রতি বছর বিভিন্ন দেশের সেরা ব্লগারদের মাঝে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকেন। ২০১১ এর এ আয়োজনে বিচারকদের রায়ে মাত্র দু’ভোটের ব্যবধানে তিউনিসিয়ার ব্লগারের কাছে সাবরিনা পরাজিত হন।

সাবরিনার শারীরিক অবস্থা বর্তমানে আগের চেয়ে আরো খারাপ। লেখালেখিও তেমনভাবে আর করতে পারছেন না, তবে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার আদায়ের স্বপ্ন তিনি দেখে যাবেন আজীবন ।