বি-স্ক্যান প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক – সালমা মাহবুব

“একটি হুইলচেয়ারের অভাবে কারুর জীবন থেমে আছে, কারুরবা নেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা! সহায়ক চলাচলের ব্যবস্থা নেই বলে চার দেয়ালের আলো-আঁধারীতে কাটছে কারুর জীবন” এসব শুনলে নিজেকে স্থির রাখতে পারেন না। সমাজে সর্বত্র প্রতিবন্ধী তথা ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তির অংশগ্রহণ এবং সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে যিনি সবসময়ই সোচ্চার। তাদের একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালগুলোতে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন- প্রচারণা চালানোসহ বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে র‌্যাম্প যুক্ত বাঁধা মুক্ত একটি সুন্দর অবকাঠামো তৈরীতে যিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন সেই মানুষটি নয় মাস বয়স থেকে দূরারোগ্য পোলিওর সাথে যুদ্ধ করছেন। যতটা না শারীরিক তারচে’ বহুগুণে সামাজিক এই যুদ্ধে জয়ী হবার সার্বক্ষনিক আপ্রাণ চেষ্টাগুলো ধরা পরে তার কার্যক্রমে।

পোলিওতে আক্রান্ত হবার পর মা-বাবা চিকিৎসার জন্যে অনেক জায়গায় ছুটোছুটি করেছেন। অনেক ডাক্তারের কাছে গিয়েছেন কিন্তু পোলিও ভাল হয় না। দু’পা পোলিওতে আক্রান্ত হওয়ার কারণে হাঁটার মতোন শারীরিক সক্ষমতা একেবারেই ছিলো না তার। যার ফলে জীবনের সিংহভাগ কেটে গেছে চারদেয়ালের মাঝে। ঘরের বাইরে যাওয়ার মত পরিবেশ বা সহায়ক ব্যবস্থাও তখন ছিল না বলে কখনো স্কুলের চেহারা দেখেননি তিনি। শুরু হলো ঘরে বসেই ‘অ’ ‘আ’ ‘ক’ ‘খ’ এর সাথে পরিচয়। বাবা মা একজন শিক্ষক নিযুক্ত করলেন তাঁদের একমাত্র কন্যা সালমা মাহবুবকে শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যে। বাবা মায়ের ভালোবাসা ও ছোট দু’ভাইয়ের উৎসাহে ঘরে বসে যতটা সম্ভব পড়াশোনা করলেন। অনেক বছর পর প্রথম স্বাধীনতার হাতছানি নিয়ে ঘরে এলো একটি হুইলচেয়ার। কিছুদিন পরে ইন্টারনেটের ব্যবহার একরাশ সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলো। পোলিও আক্রান্তদের সুখ-দুঃখের কথা জানতে এবং জানাতে ফেসবুকে একটি গ্রুপ খুললেন “পোলিও ভিকটিম”। ধীরে ধীরে অনলাইনে বিভিন্ন ওয়েবসাইট ঘোরাঘুরি করে জানতে পারলেন বাইরের দেশগুলোতে প্রতিবন্ধী মানুষেরা বিভিন্ন ধরণের সহায়ক ব্যবস্থার সাহায্যে একেবারেই স্বাভাবিক মানুষের মতোন ঘরে বাইরে সর্বত্রই একা একা চলাফেরা করছেন। ছাত্র জীবন শেষ করে নিশ্চিন্তে কর্মজীবনে ঢুকে যাচ্ছেন। তাদের সম্বোধিত করা হয় “ভিন্নভাবে সক্ষম” নামে। যে সমস্তই আজো আমাদের দেশে এক সুন্দর স্বপ্নের মতোন।

সমাজের অবহেলিত মানুষদের জন্যে কিছু করার অনেকদিনের সুপ্ত বাসনা মাথাচারা দিয়ে উঠলো ফেসবুকে সাবরিনা সুলতানার সাথে পরিচয়ের পর। সাবরিনার আহ্ববানে সাড়া দিলেন তিনি, বিশেষত প্রধানমন্ত্রীকে লেখা সাবরিনার চিঠিটি অনুপ্রাণিত করেছে বেশি জনসচেতনতা মূলক এই কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। সাবরিনার চিঠিটি যেনো হুবুহু সালমার মনের কথা ছিলো। তিনি ভাবলেন এখন সময় এসেছে পরিবর্তনের। মানুষের দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তনে কথা বলতে হবে। ঘরে বসে এ কাজ সম্ভব নয় বুঝেই ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন তিনি। প্রতিবন্ধী- অপ্রতিবন্ধী সমমনা মানুষদের একত্র করতে শুরু করলেন।

বর্তমানে তিনি বি-স্ক্যানের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালনের পাশাপাশি জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের ‘ প্রবেশগম্যতা এবং সহায়ক প্রযুক্তি থিমেটিক গ্রুপ’ এর আহবায়ক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই দেশকে প্রতিবন্ধী মানুষের বাসযোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে যাওয়াই তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এখন।