অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং এ জয় হোক শারীরিক প্রতিবন্ধিতার, দূর হোক অসহায়ত্ব

আমি মনে করি একজন শারিরীক প্রতিবন্ধী মানুষ তার প্রতিবন্ধিতার জন্য যতটা না অসহায় বোধ করেন তারচেয়েও বেশি মানসিক হীনমন্যতা বা অসহায়ত্বে ভোগেন, প্রাপ্তবয়স্ক হবার পরও অর্থনৈতিকভাবে পারিবারিক নির্ভশীলতার কারণে। আমার এই লেখাটি সেই সকল অসহায় মানুষগুলোর জন্য যারা একটু ইচ্ছে করলেই প্রতিবন্ধিতা সত্ত্বে¡ও নিজেকে গড়ে তুলতে পারেন একজন ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষ হিসেবে। আমি যেভাবে পেরেছি!
দু’বছর বয়সে পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে আর দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ হারিয়ে ফেললাম। দুই পা সারা জীবনের জন্যই অচল হয়ে গেল আর আমি হয়ে পড়লাম সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল। কিন্তু আমার দরিদ্র অসহায় পিতা-মাতা তাদের জীবনের এই শ্রেষ্ঠ সম্পদকে কিছুতেই কারো বোঝা হতে দেবেন না পণ করলেন। আমাকে সমাজে মর্যাদার সাথে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দু’জন নতুন এক জীবন সংগ্রামে নামলেন। যেখানে প্রতিটি পদে পদে অসংখ্য প্রতিকুলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাদের। আর্থিক অসচ্ছলতা সত্ত্বে¡ও তাদের প্রতিবন্ধী ছেলেটিকে স্কুল-কলেজ শেষ করে বিশবিদ্যালয়ের দোর গোড়ায় পৌঁছে দিয়েছেন। আমার ‘মা’ আমাকে কোলে করে স্কুলের দ্বিতীয়, তৃতীয় তলায় ক্লাস করাতে নিয়ে যেতেন। শুধু চেয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী বলে ছেলেটি যেন কারো বোঝা হয়ে না থাকে। এমনিভাবে আমি এস.এস.সি, এইচ.এস.সি, বি.বি.এ. পাশ করে এম.বি.এ. পড়ছি নর্থসাউথ ইউনিভার্সিটিতে। এছাড়াও গত তিন বছর ধরে অনলাইনে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে কাজ করছি। নিজের পড়ালেখার খরচ চালানোর পাশাপাশি বাবার সাথে আমিও সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পেরেছি। এত অল্প সময়ে এটা সম্ভব হবে কল্পনাও করি নি। কিন্তু তবুও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এর কাছে শুকরিয়া জানাই, বাবা-মা’র স্বপ্ন সার্থক করতে পেরেছি বলে। আজ আমার বিহঙ্গ শরীরটাকে মুক্ত আকাশে পাখির মতো উড়ার সাহস যোগায় ফ্রিল্যান্সিং। হয়তো আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে পেরেছি বলেই অধরা স্বপ্নগুলো অর্জনের পথে এগিয়ে যাবার সাহস পাই আরো বেশি। তাই ফ্রিল্যান্সিংই এখন আমার ধ্যানজ্ঞান বা বলা যায় বিধাতা প্রদত্ত এক আশীর্বাদ।
সত্য কথা বলতে কী, বাবা-মা’র কঠোর পরিশ্রমই আমাকে হয়তো বড় বেশি স্বপ্নবাজ করে তুলেছে। প্রতিনিয়ত কিছু করার তীব্র এক আকাঙ্খা আমাকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়ায়। একটা সময় নিজের আত্ববিশ্বাসকে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজন হয় আর্থিকভাবেও নিজেকে সক্ষম করে গড়ে তোলার। কিন্তু শারীরিক ও সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা ডিঙ্গিয়ে পড়ালেখার পাশাপাশি আমার জন্য তা ছিল খুব কষ্টের। তখনি জানতে পারি অনলাইনে ঘরে বসেই কাজের খবর। আর টেকনোলজির প্রতি আগ্রহ ছিল সব সময়। আমার এলাকাতেই একটি কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার এ ভর্তি হই এবং ফ্রিল্যান্সিং এর ব্যাপারটা জানতে পারি। ওডেস্ক (Odesk) এ একাউন্ট খোলা, বিড করা, বায়ারদের সাথে কমিউনিকেট করা ইত্যাদি। কিন্তু আমার ট্রেনিং সেন্টারটি তিনতলায় হওয়াতে সিঁড়ি বেয়ে উঠা নামার সমস্যার কারনে সপ্তাহখানেক শেখার পর তিন মাসের কোর্সটি স¤পন্ন করা আর সম্ভব হয় নি। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল বলে ততদিনে একটি ওয়েব রিসার্চের কাজ পেয়ে যাই।
এটাই ছিল আমার জীবনের প্রথম কোন কাজ করা।
আমার পিতামাতার চোখে সারাজীবন শুধু দুঃখের অশ্র“ দেখেছি। কিন্তু ফ্রিল্যান্সিং থেকে প্রাপ্ত টাকা যখন বাবা মার হাতে তুলে দিয়েছি, তখন তাদের চোখে যে আনন্দের অশ্র“ ঝরে পড়তে দেখেছি, সেটাই আমার কাছে বিশ্বজয়ের মত একটি বিশেষ কিছু ছিল। যে আমার পক্ষে ঘরের বাইরে গিয়ে কাজ করা অনেক কষ্টকর ছিল, সেই আমি এখন ঘরে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন কোম্পানির কাজ করি। আমার জন্য এর চাইতে বড় সাফল্য মনে হয় আর কিছু হতে পারে না। ৬ জুন, ২০১০ এ প্রথম ওডেস্ক – এ কাজ পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত চলছে আমার ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে পথচলা। এরই মাঝে অস্ট্রেলিয়ার “Chiball World” নামের একটি কোম্পানিতে স্থায়ীভাবে দেড় বছর ইমেইল মার্কেটিং -এর কাজ করি। নিজের কাজের ক্ষেত্রটাকে আরো বড় করার লক্ষ্যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। চেষ্টা করছি আরো কিছু কাজ শেখার। একদিন ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারলাম, ক্রিয়েটিভ আইটি লিঃ নামে একটি প্রতিষ্ঠান শারীরিক প্রতিবন্ধিদের অনলাইনে আউটসোর্সিং এর ট্রেনিং দিচ্ছে। আমার কথা জানতে পেরে ক্রিয়েটিভ আইটির একজন অত্যন্ত দক্ষ ট্রেইনার মোঃ ইকরাম ভাই, বাসায় এসে আমাকে এস.ই.ও এবং আরো অনেক নতুন নতুন কাজ শিখিয়েছেন। বর্তমানে ইকরাম ভাইয়ের দিক নির্দেশনায় ওডেস্ক ছাড়াও অন্যান্য মার্কেট প্লেসে কাজ করছি। ফ্রিল্যান্সিং এ আমি যে অপার সম্ভাবনা দেখেছি, সেটাকে আমার ভবিষ্যৎ জীবনে কাজে লাগাতে চাই। ইচ্ছা আছে নিজের একটি অনলাইনভিত্তিক আউটসোর্সিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করা। আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আমি অনেক শারিরীক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে দেখেছি, যারা মেধা থাকা সত্ত্বেও শুধু শারিরীক প্রতিবন্ধিতার জন্য অসহায় জীবন যাপন করছে। আমার খুব ইচ্ছা এই সকল মানুষগুলোকে নিয়ে কাজ করার। কারণ আমি তো তাদেরই একজন। আমাদের এই দরিদ্র দেশের শতকরা ১৫ ভাগ মানুষই প্রতিবন্ধী। কিন্তু সুযোগ পেলে আমরাও যে পরিবার বা সমাজের বোঝা না হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারি, তা হয়তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি বিশ্বাস করি মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। তাই আমিও আমার স্বপ্নের সমান বড় হওয়ার চেষ্টা করে চলেছি ফ্রিল্যান্সিং কাজের মধ্য দিয়ে। আমাদের দেশে বিপুল জনগোষ্ঠির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক চাকরি খুব দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে একজন শারিরীক প্রতিবন্ধি ব্যক্তির পক্ষে চাকরির সংস্থান করা খুবই কষ্টসাধ্য। আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এখন ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং এর কাজ করে আত্মনির্ভরশীল হওয়া যায়।
সরকারি ও বেসরকারি ভাবে যখন যেখানেই ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে আলোচনা হবে, আমি আশা করবো তারা যেন সমাজের অবহেলিত এই মানুষগুলোকেও ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিং কাজে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে একত্রে কাজ করে এবং একটি সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলে। এই বিশ্বজগতে অসংখ্য মানুষ তাদের কর্ম দিয়ে প্রমান করেছে, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার ক্ষেত্রে মূল প্রতিবন্ধকতা নয়। আর তাই আমার এই লেখাটি যদি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে তার অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব দূর করার জন্য ফ্রিল্যান্সিং এর প্রতি আনুপ্রাণিত করে তবেই আমি নিজেকে স্বার্থক ভাববো।

 

মোঃ জাহিদুল ইসলাম
বি-স্ক্যান সদস্য এবং
শিক্ষার্থী – নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।