ট্রেজেডির প্রতিদ্বন্ধী

-তারেক কালাম
শৈশবেই আমার স্পাইনাল ডেফোর্মিটি নামে একটি সমস্যা ধরা পড়ে। যার কারণে মেরুদণ্ড উপর দিকে বাঁকা হয়ে যায়। ১৯৭২ সালে সদ্য স্বাধীন দেশের আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করার জন্য প্রাক্তন ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আসেন আমেরিকান অস্থি বিশেষজ্ঞ, ডা. রোনাল্ড গর্স্ট। ১৯৭৩ সালে, আমার বয়স তখন ১৩, আমার মা আমাকে ঢাকা নিয়ে ডা. গর্স্টকে দেখান। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর ডা. গর্স্ট অপারেশন করার পরামর্শ দিলেন আমার মাকে। সে বছর আগস্ট মাসেই আমার অপারেশন হয়। অপারেশন প্রথম দিকে সফল হলেও পরবর্তীতে, আমি বাস্কেটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি খেলাধূলা করতে গেলেই পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করতাম। ব্যথাকে সঙ্গী করেই অতিবাহিত হতে থাকে আমার জীবন। ১৯৭৭ সালে সেন্ট প্লাসিড হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৯ চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। সে বছরই মে মাসে, বাংলাদেশ টাইমসে স্পাইনাল কার্ভেচার সংশোধন শীর্ষক ব্রিটিশ মেরুদণ্ড বিশেষজ্ঞের একটি নিবন্ধ দেখে আমার শারীরিক সমস্যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ জানিয়ে একটি চিঠি লিখি। কিছুদিন পর আমাকে অবাক করে ব্যাসিল্ডন হাসপাতালে নিয়োজিত মি. এলান গার্ডনারের কাছ থেকে চমৎকার একটি উত্তর পাই। আমার আব্বা এই চিঠি পড়ার সাথে সাথে আমাকে ইংল্যান্ডে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন যেহেতু আমার বড় ভাই ম্যানচেস্টারে পিএইচডি করছিলেন। ৭ জুলাই ১৯৭৯ সালে আমি ইংল্যান্ডে এলেও মি. এলান গার্ডনারের সাথে দেখা করতে তার প্রাইভেট ক্লিনিক এসেক্স নাফিল্ড হসপিটালে যাই সেপ্টেম্বরে। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে প্রায় সাতটি এক্স-রে রিপোর্ট আমাকে দেখানো হয়। মি. গার্ডনার আমাকে অপারেশন করার জন্য পরামর্শ দিলেন। অপারেশনের বেনিফিটগুলো ছিল নিম্নরূপ:
ক) মেরুদণ্ড বক্রতা ৭৫% পর্যন্ত সোজা হবে
খ) ভবিষ্যতে কোনো ব্যথা বা সমস্যা থাকবে না
গ) আমার উচ্চতা ৪-৫ ইঞ্চি বৃদ্ধি করবে
ঘ) এই ধরনের অপারেশন সাফল্যের হার ৯৫%
ঙ) এ ধরনের অপারেশন ঝুঁকি হার মাত্র ৫% (প্যারালাইসিসের সম্ভাবনা)
মি. গার্ডনারকে জানালাম অপারেশনে আপত্তি নেই আমার। অপারেশনে চার্জ ছিলো £৬০০০ (ইউকে পাউন্ড)। ১৯৮০ সালের £৬,০০০ মানে কমপক্ষে বর্তমানের পরিমাণ £৪০,০০০ মত। বাবার পক্ষে এত টাকা যোগাড় করা অসম্ভব হওয়ায় বড় বড় সামাজিক সংগঠনকে সাহায্যের জন্য চিঠি লিখতে শুরু করলাম। কিন্তু কোথাও তেমন সদুত্তর না পেয়ে মি. গার্ডনারকে রাজী করালাম NHS patient হিসাবে আমার চিকিৎসা শুরু করতে।

২১ জুলাই, ১৯৮০ ব্যাসিল্ডন হাসপাতালে ভর্তি হই। তিন ধাপে আমার অপারেশন হলো। কিন্তু আমার ২য় ও ৩য় অপারেশনের পর আমার দু’পা অবশ হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যক্রমে যে অপারেশন শুধুমাত্র ৫% ঝুঁকি বহন করে থাকে, আমি তাদের একজন হলাম। আমার চিকিৎসা এবং পরবর্তী পুনর্বাসনের জন্য ইউকে’র বিভিন্ন হাসপাতালে প্রায় ৮২২ দিন থাকতে হয়েছিল। অবশেষে, ১৯৮৪ সালে আগস্ট মাসে, আমি একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী হিসাবে হাসপাতালে থেকে ছাড়া পাই।

আমার এখনো দ্বিতীয় অপারেশনের কথা মনে পড়ে। দিনটি ছিল ১১ই আগস্ট ১৯৮০, ঈদ-উল-ফিতরের দিন। সকাল ৯টায় অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হলো আমাকে। সন্ধ্যা ৬-৭ টার দিকে একটু একটু জ্ঞান ফিরতে শুরু করল। রাত ৯টায় মি.গার্ডনারের সহকারী ডা. কার্ল আসলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন আছেন? বললাম, ভাল। আমার আঙুল নাড়াতে বললেন। অনেক চেষ্টা করেও পায়ের আঙুল নাড়তে পারলাম না। তিনি আমার পায়ের তালুতে সুড়সুড়ি দিয়ে বললেন, তুমি কি কিছু অনুভব করছো? না সূচক মাথা নেড়ে ডা.কার্লকে জিজ্ঞাসা করলাম, ঝুকির সম্ভাবনা আছে কিনা? তিনি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ার পর ধৈর্য্যের বাধ ভেঙ্গে গেল। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। ফোনে ভাইয়ার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া হলো। আমি ভাইয়াকে পেয়ে আবারো চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে জানালাম, আমার পা প্যারালাইজড হয়ে গেছে। ভাইয়া সান্তুনা দিলেন, আল্লাহ কাছে দোয়া করছি সব ঠিক হয়ে যাবে। পর দিন মি. গার্ডনার আমাকে ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ দিলেন যেহেতু এটা অনেক বড় অপারেশেন ছিল। উত্তরে আমি শুধু হাসলাম, তিনি আমাকে তখন বললেন, ÒDo you know what is the meaning of patience? Avwg ejjvg ÒYes I know, you meant NOT patient but patience”। Mr Gardner ভেবেছিলেন আমি patience অর্থ বুঝি নি। অনেক ইন্টেন্সিভ ফিজিওথেরাপি দেয়া হলো। প্রথম দিকে কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। পায়ের অনুভূতি ফিরে আসতে শুরু করলো এবং আমি ফ্রেম ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করলাম। কিন্তু পরবর্তীতে আরো ২টা অপারেশনে আমি সম্পূর্ণ প্যারালাইজড হয়ে যাই।

এই অপারেশনের আমার জীবনকে সম্পূর্ণভাবেই পরিবর্তিত করে ফেলে। আমি খুব তিক্ত এবং ডিপ্রেসড অনুভব করতাম। কিন্তু Southport SIU  পুনর্বাসনে গিয়ে আমার দেখার সুযোগ হলো, মেরুদন্ডে আঘাতপ্রাপ্ত অন্যান্য রোগীরা কিভাবে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করছে। এই স্পাইনাল ইউনিটে চল্লিশ জন রোগীর মধ্যে আমার অবস্থা ছিল সবার চেয়ে ভাল। আমার মনে হলো সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা আমাকে অনেক ভাল অবস্থায় রেখেছেন। আমাকে এখানে কীভাবে একটি হুইলচেয়ার নিয়ে স্বাধীনভাবে জীবন যাপন করতে পারব তার ট্রেনিং দেয়া হলো। সাউথপোর্ট স্পাইনাল কনসালটেন্ট মি. ক্রিশনান স্বাধীন এবং সহজ জীবনযাপন এর বক্তব্য আমাকে প্রচুর অনুপ্রাণিত করল নতুনভাবে জীবন শুরু করতে।

সাউথপোর্ট স্পাইনাল কনসালটেন্ট আমার চোখ ও মন খুলে দিয়েছে। আমি বিশ্বাস করি যদি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সবধরণের সুবিধাদি দেয়া হয় এবং কোন সামাজিক বাধা বিপত্তি না থাকে, তাহলে তিনি সহজেই এ সমাজের অন্য দশজন সাধারণ মানুষের মতই সামজিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে। ১৯৮৪ সালের সেপ্টেম্বের মাসে একটি স্থানীয় কলেজে পার্টটাইম করে করে সপ্তাহে ১২ ঘন্টা কম্পিউটার স্টাডিজ কোর্সে ভর্তি হই। দু’বছর পরে ফুলটাইম কোর্স করতে সাহস পাই এবং ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় (ইউ এম আই এস টি) থেকে ১৯৯০ সালে কম্পিউটেশন এ বিএসসি (অনার্স) ডিগ্রী অর্জন করি। স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করার পর আমি ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে ব্যবসা প্রশিক্ষণ একটি কোর্স সম্পন্ন করে আমার নিজের বাড়িভিত্তিক সেলফ এমপ্লয়েড হিসাবে কালামটেক ব্যবসা শুরু করি। কম্পিউটার কনসাল্টেন্সি ডিটিপি, বাংলাতে টাইপ সেটিং (setting) কাজ শুরু করি। ১৯৯০ থেকে আমার নিজের কম্পিউটার কনসাাল্টেন্সি ছাড়াও আমি ম্যানচেস্টার এবং স্যালফোর্ড বিভিন্ন সরকারী এবং বেসরকরী প্রতিষ্ঠানের কাজ করেছি। বর্তমানে, আমি ম্যানচেস্টার সিটি কাউন্সিলের ডাটা গভর্নেন্স টিম এর সাথে ডাটা গভর্নেন্স অফিসার হিসেবে কাজ করছি।

১৯৯০ সালের আগে ইউ.কে. তে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকারের উপর তেমন কড়াকড়ি আইন ছিল না। কিন্তু তারপরও কলেজ এবং ইউনিভার্সিটি পড়ার সময় আমি কর্তৃপক্ষ, শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে যথেষ্ট সাপোর্ট পেয়েছি। কলেজ এবং ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশদ্বারে চমৎকার একটি র‌্যাম্প ও এক্সিসেবল টয়লেট তৈরী করেন এবং কর্তৃপক্ষ আমার জন্য একবার ক্লাসরুম পরিবর্তনও করেছেন। কারণ ঐ বিল্ডিং এত অল্পসময়ে লিফট লাগানো সম্ভব ছিল না। ইউ.কে. তে ১৯৯৫ সালে প্রথম ডিজেবল্ড এ্যাক্ট পাশ হওয়ার পর এই আইনটি দিনে দিনে আরো উন্নত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিটি অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, শপিংমলে ভিন্নভাবে সক্ষম মানুষের উপযোগী সব রকমের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক। আইন অমান্যকারীর জন্যে রয়েছে কঠিন শাস্তি। আমি যেখানেই কাজ করেছি, সব অফিসের কর্তৃপক্ষদের কাছে থেকেই যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছি। স্যালফোর্ড কাউন্সিল এর কাজ আমি টেলি-ওয়ার্কিং হিসাবে কাজ (অর্থাৎ বাড়ি থেকে কাজ) করতাম কারণ তাদের অফিস ভবনটি লিস্টেড বিল্ডিংয়ের আওতায় ছিল অর্থাৎ আইন অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ সেখানে কোনো পরিবর্তন যেমন র‌্যাম্প লিফট ইত্যাদি নতুন করে তৈরি নিষিদ্ধ ছিল। তাই আমাকে বাড়িতে বসেই কাজ করার জন্য সকল প্রকার সুযোগ তারা করে দেন এবং ল্যাপটপ ইত্যাদি সরবরাহ করেন। লাইন ম্যানেজার প্রতিসপ্তাহে একবার করে আমার বাসায় এলে আমি রিপোর্ট পেশ করতাম। ম্যানচেষ্টার সিটি কাউন্সিলের কর্তৃপক্ষও অনেক সাপোর্ট দিয়েছে। প্রতিদিন হুইলচেয়ার এক্সেসিবল ব্ল্যাক ক্যাব এ করে আমি অফিসে যাই এবং এ দেশের সরকার এক্সেস টু ওয়ার্ক স্কীম এর আওতায় আমার যাতায়াত ভাড়া অনেকটাই বহন করেন। এতসব সরকারী এবং সামাজিক সহযোগীতার কারণেই আজ আমি এই পর্যায়ে পৌঁছুতে পেরেছি। এই সহানুভূতিময় পরিবেশ আমাদের বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষ পেলে তারাও দেশের জন্য ঠিক ততটাই অবদান রাখতে পারেন যেভাবে আমি পারছি।

পরিশেষে শুধু বলতে চাই, আমার ক্ষেত্রে যে অপারেশন ৯৫% সাফল্যের হার ছিলো আর শুধু ৫% রিস্ক ফ্যাক্টর ছিলো। আমি সেই ৫% এর একজন হয়েছি এটা আমার দুর্ভাগ্য। মি.গার্ডনার আমাকে সুস্থ্্য করার অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। এটাও আমার দুর্ভাগ্য। আল্লাহ পরাক্রমশালী যদি কখনো কোনো একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটান, হয়তো বা আমার এ অবস্থাকে বদলাতে পারেন। – কিন্তু এ অবস্থায় আমি শুধু আমার দুর্ভাগ্যকে সৌভাগ্যে পরিণত করার প্রানপণ চেষ্টায় থাকতে চাই। তাই একটি ‘নতুন এবং স্বাভাবিক জীবন’ শুরু করেছি একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি হিসাবে!!