যে স্বপ্নেরা ধরা দেয়

10

মানুষের স্বপ্ন দেখার পরিধি অনেক বিশাল। কেউ খুব ভাল স্বপ্ন দেখতে পারে, কেউ পারে স্বপ্নের সুন্দর বাস্তবায়ন ঘটাতে, আবার কেউ নিজে স্বপ্ন দেখে অন্যকেও স্বপ্ন দেখাতে পারে। তবে এ তিনটার সমন্বয় থাকাটা সত্যি দারুণ এক ব্যাপার। বি-স্ক্যানকে অনেক কাছে থেকে দেখেছি। সময়ের কাল¯্রােতে আজ প্রবাসে অবস্থান করায় অনেক কিছুই মিস করি এখন যা অনস্বীকার্য। তবে এখানে এসে প্রতিবন্ধী তথা ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের এত এত সুযোগ সুবিধা দেখতে পেয়ে অনেক ভাল লাগার মাঝেও কী যেন নেই নেই মনে হয়। যখন বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে সেসব ব্যাপার মনের চিত্রপটে উঁকি দেয়।

আপনারা হয়ত অনেকেই জেনে থাকবেন বি-স্ক্যানের চারটা মূল উদ্দেশ্য হল-
১ সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা
২ একীভূত শিক্ষা ব্যবস্থা
৩ সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থা
৪ চাকরির সুযোগ
বি-স্ক্যান এর সাথে কাজ করতে গিয়ে আমি পদে পদে অনুভব করেছি প্রথম এবং তৃতীয় বিষয়টি অর্থাৎ সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা এবং সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থা এ দু’টি না থাকলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কখনোই সক্ষম হয়ে উঠতে পারবেন না। চলন এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্যে এ দু’টি সহায়ক ব্যবস্থা অত্যন্ত আবশ্যকীয়। বিশেষত বাংলাদেশে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিগণ সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। এই বিংশ শতাব্দীর যুগে এসেও না জানি কত শত হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ চার দেয়ালের আবদ্ধ ঘরে কাটাচ্ছেন এক মানবেতর জীবন। বঞ্চিত হচ্ছেন শিক্ষা, বিনোদন ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ থেকে। সেই অনুভব এখানে এসেও তাড়া করে ফেরে আমাকে। যখন দেখতে পাই এখানে তারা স্বাধীনভাবে স্বাভাবিক জীবন যাপন করছেন! এখন পর্যন্ত প্রবাস জীবনের স্বল্প অভিজ্ঞতার আলোকে এ বিষয় দু’টির ব্যাপারে কিছুটা বলার চেষ্টা করছি।

সর্বজনীন প্রবেশগম্যতাঃ র‌্যাম্প কথাটা সম্ভবত এখন আর অজানা নেই। এ বিষয়ে বি-স্ক্যানের বহুল প্রচারণা যথেষ্ট প্রশংসার দাবি রাখে। মেরিল্যান্ডে থাকলেও বেশ কিছুবার ভার্জিনিয়ায় যাওয়া পড়েছে। থেকেছি নিউইয়র্কেও। ব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে অফিস, কলেজ, পার্কে র‌্যাম্পের সুব্যবস্থা রয়েছে সব জায়গায়। লিফট, ওয়াশরুমের দরজা যথেষ্ট পরিমানে চওড়া এবং ডিজেবিলিটি লোগোর উপযুক্ত ব্যবহার চোখে পড়বে। আমি যে দোকানে কাজ করি সেখানে হুইলচেয়ারে করে অনেকেই আসেন। এছাড়া একজন নিয়মিত কাস্টমারের হাত নেই। অথচ তার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি এবং এখানকার মানুষের সহযোগিতামূলক মন মানসিকতার কাছে সেটা যেন খুবই গৌণ। এখানে ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তিকে Handicapped people বলা হয়ে থাকে বেশি। যদিও people with disability কথাটারও প্রচলন রয়েছে। আর পার্কিং এর সুবিধা খুবই চমৎকার। বড় বড় শপিংমল বা অফিসগুলোতে প্রবেশপথের সবচেয়ে কাছের পার্কিংগুলোতে ডিজেবিলিটি লোগো তথা handicapped logo অঙ্কন করা থাকে। এমনকি ব্যক্তিগত গাড়ির ভেতরে সামনের দিকে সে লোগো ঝুলিয়ে রাখেন তারা।

সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থাঃ এক কথায় অসাধারণ। বাস এবং মেট্রোগুলোতে অনায়াসে ‘যে কোন মানুষ’ উঠতে পারবে। বাসের দরজার সাথে র‌্যাম্প ভেতরে ভাঁজ করা অবস্থায় থাকে। চালক সুইচের সাহায্যে দরজা খুলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে র‌্যাম্প বাইরে বের করে দেন যখন দরকার হয়। শুধু তাই না, কোন বয়স্ক লোক যদি বাসে উঠতে চান বা কোন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বা লাঠির সাহায্যে চলেন এমন কেউ সেক্ষেত্রে পুরো বাসটাই একটু নিচের দিকে নেমে যায়। যেন সহজেই বাসে উঠতে পারেন তারা। একটা বাসের সামনের দিকে দু’পাশে হ্যান্ডিক্যাপড মানুষের জন্য জায়গা নির্ধারিত আছে। দু’জন (কখনও বা তিনজন) হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি বসতে পারবেন। এবার আসি মেট্রো প্রসঙ্গে (ট্রেন)। মেট্রে াট্রেন যখন প্ল্যাটফর্মে থামে তখন ট্রেনের দরজার নিচ আর প্ল্যাটফর্ম সমান থাকে এবং সে দুটোর মাঝে ফাঁকা জায়গা থাকে না বললেই চলে। ছবি তোলা নিষেধ নতুবা তুলতাম। আশা করি পারমিশান পেলে একদিন ভিডিও করে রাখবো। ট্রেনের ভেতরে দরজাগুলোর একদম কাছে চমৎকার আসন ব্যবস্থা তাদের জন্য। মাত্র ৩০-৪০ ফিট পরপরই দরজা। আর ট্রাফিক সিগন্যালে এখানে ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে মোড়ে পথচারীদের পারাপারের জন্যও সিগন্যাল রয়েছে। ক্রসিং দিয়ে কেউ হুইলচেয়ারে বা কেউ ক্রাচ নিয়ে অনায়াসেই রাস্তা পার হয়। কোন গাড়ি এসে যে ধাক্কা মারবে না এ ব্যাপারে সবাই নিশ্চিত। ফুটপাথের দু’দিকটা ঢালু হয়ে যাবার ফলে খুব সহজে কারো সাহায্য ছাড়াই স্বাধীন চলাচলে সক্ষম তারা।

আমরা জানি আমাদের দেশে অনেক সমস্যা। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি আর বিপথগামী হবার অসংখ্য প্রলোভন ছড়ানো চারদিকে। এত কিছুর পরও আমি বলব, ভাল থাকা সম্ভব, যদিও একটু চ্যালেঞ্জের। তবুও ভাল থাকতে চাওয়াটা সত্যিই দোষের কিছু না। আমি বেশ জোর দিয়েই বলতে পারি, আমাদের দেশের ভিন্নভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের প্রতি এখন মানুষ আগের চেয়ে বেশি সজাগ। একটা সময় প্রচণ্ড উদাসীন ছিল যারা, তারা আজ কিছুটা হলেও বুঝতে শিখেছে, আমরা আলাদা নই, আমরা একই। যুক্তির বিচারে সমস্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব না। কিন্তু কমিয়ে ফেলা সম্ভব। তেমনি শুধু স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি সেগুলোর বেশ কিছু পূরণ করাও সম্ভব। র‌্যাম্পযুক্ত একটা ভাল মানের বাস আমাদের জন্য একদিন স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন যখন প্রয়োজনে পরিণত হয়, তখন সেটা হয়ে যায় অবশ্যপ্রাপ্য। আমি চোখ বন্ধ করেই অনুভব করতে পারছি, একজন চলন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির দীর্ঘশ্বাস এর বদলে স্বস্তির নিশ্বাস; আমি অনুভব করতে পারছি একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর অদেখা রঙ্গিন পৃথিবী; আমি অনুভব করতে পারছি একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধীর শুনতে না পাওয়া প্রেরণাদায়ক আত্মবিশ্বাসের অগণিত শব্দমালা।
বি-স্ক্যান স্বপ্ন দেখুক আরও। ঠিক যেভাবে এতদিন স্বপ্ন দেখে এসেছে। স্বপ্ন পূরণ করুক আরও । ঠিক যেভাবে এতদিন পূরণ করার চেষ্টা করেছে। আর মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করুক, পথ চলতে শিখুক নতুন করে জীবন গড়তে।

রাজিন রিয়াসাত
সাধারণ সদস্য (প্রাক্তন কর্মী পরিষদ সচিব), বি-স্ক্যান
মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র