প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যাতায়াত সুবিধা নিয়ে আমরা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট তিনটি প্রশ্নের মারফত তাদের মতামত নিয়েছি।

74

*প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরীতে সরকারের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিৎ?

*সরকারের পাশাপাশি কোন কোন ক্ষেত্র থেকে ভূমিকা রাখা গেলে খুব শিঘ্রই এদেশের রাস্তাতেও হুইলচেয়ার প্রবেশগম্য যানবাহন দেখা যাবে বলে মনে করেন?

* হুইলচেয়ার প্রবেশগম্য যানবাহন ব্যবস্থা সচেতনতা তৈরিতে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের কি কি কর্তব্য ও ভূমিকা রাখা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

আশফাক আহমেদ

পরিচালক,উর্মি গ্রুপ।

* প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থার মূল পরিকল্পনা সরকারকেই নিতে হবে। সরকারী এজেন্সীর সমর্থনে বাস এবং ট্রেন এর মত পাবলিক যানবাহনে সুবিধা পাওয়া সহজ হবে। তবে বেসরকারী কোম্পানি যদি এই কাজে এগিয়ে আসে তাদেরকে ব্যবসায় ট্যাক্স ইনসেনটিভ দেয়ার কথা চিন্তা করা যায় যাতে তারা উৎসাহী হোন। সকল বিল্ডিং, শপিং মল এবং কাঁচা বাজারে একই রকম র‌্যাম্পের সুবিধা থাকা প্রয়োজন।

* রাস্তার ফুটপাথ ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি বাস স্টপেজগুলো হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের সহায়ক করে তৈরি করা প্রয়োজন। এছাড়াও বাস ড্রাইভার ও ট্রাফিক পুলিশকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সচেতন করে তুলতে হবে যাতে তারা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের প্রতি বিশেষ নজর দেন।

 

* মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জরুরী। সকলের সমৃদ্ধ ও উন্নত মানের জীবন লাভের অধিকার রয়েছে এই বিশ্বাস থেকে নিজের সচেতনতা  অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। এই ব্যাপারে অধিক মাত্রায় মিডিয়া  প্রচারণা চালানোর ব্যবস্থা করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এলাকার শিক্ষা  প্রতিষ্ঠানে যদি কর্তৃপক্ষ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সহায়ক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন তাহলে হয়তো অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর অবদান থেকে জাতি বঞ্চিত হবে।

হাসিন জাহান,

ডিরেক্টর প্রোগ্রামস,ওয়াটারএইড।

*প্রতিবন্ধীবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থার জন্যে সরকারকেই উদ্যোগী হয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একে মূলধারায় আনার জন্যে বিভিন্ন সরকারী অঙ্গসংস্থার সাথে সমন্বয় প্রয়োজন। একই সাথে প্রকৌশলী, স্থপতি, পরিকল্পনাকারি এবং নীতিনির্ধারকদের তাদের অবস্থান থেকে কাজ করা এবং সাহায্য করা জরুরি। প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্যে সরকারকেই আর্থিক নিশ্চয়তার বন্দোবস্ত করতে হবে। যেকোন অবকাঠামো অনুমোদনের ক্ষেত্রে তা প্রতিবন্ধীবান্ধব কি না সরকার তা দেখবে। সর্বাগ্রে জাতীয় পর্যায়ে গণপ্রচারাভিযান চালিয়ে গণসচেতনতা গড়ে তোলার দায়িত্ব সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

*বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্প সময়ের মধ্যে এই কাজটি করা সহজ নয়। এই কারণে তরুণ প্রজন্মকে এর সাথে নিবিড়ভাবে স¤পৃক্ত করে প্রচারাভিযান করা খুবই জরুরী। একইসাথে নীতি সংশোধনের জন্যেও আমাদের চাপ প্রয়োগ করে যেতে হবে।

*এক্ষেত্রে আমার উত্তরটি একটু ভিন্ন হবে। আমি বিশ্বাস করি পারিবারিক শিক্ষা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিবন্ধকতা কেবলমাত্র প্রতিবন্ধী মানুষেরই সমস্যা নয়, বরং যে কেউ তার জীবনে অসুস্থতা, গর্ভাবস্থা কিংবা বার্ধ্যকের জন্যে এই অবস্থার ভেতর দিয়ে যেতে পারে। সুতরাং আমরা যদি আমাদের শিশুদের এই ব্যাপারে সংবেদনশীল হবার শিক্ষা দেই তবে অবশ্যই তারা সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং পরবর্তীতে সামাজিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারবে। এদের সাথে সাথে যদি আমরা আমাদের গন্ডি এবং কর্মক্ষেত্রে নিজেদের সামর্থ্যের ভেতরে আমাদের ভূমিকা পালন করি তবে তাও প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক ধারণা বদলাতে সাহায্য করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আমরা যখন এপার্টমেন্ট বিল্ডিং বানাই তখন সেটা প্রতিবন্ধীবান্ধব কিনা তা কি আমরা ভাবি? আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই সবার আগে দরকার। পরিবর্তনের সূচনা যদি আমরা আমাদের দিয়েই শুরু করি এবং তা ধীরে ধীরে আশেপাশে ছড়িয়ে দেই তবে সবকিছুই নতুন রূপ পাবে আমরা আশা করতেই পারি!

ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ

অধ্যাপক কম্পিউটার সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ

বুয়েট

*প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থা তৈরি করে আমাদের সরকার তার মানবিক গুনাবলির পরিচয় দিতে পারে। উন্নত বিশ্বে ভাগ্য বিড়ম্বিত প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য নানা সুযোগ সুবিধা রয়েছে যার মাধ্যমে প্রতিবন্ধী হওয়া সত্ত্বেও তারা সাধারণ মানুষের মতই সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারে।

*আমরা যারা সৌভাগ্যজনকভাবে প্রতিবন্ধী নই তারা প্রতিবন্ধী হলে যাতায়াতের জন্য যে সকল সুযোগ সুবিধা সাধারণ মানুষের থেকে আশা করতাম সেই সুযোগ সুবিধাগুলো স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করলে আমাদে দেশের রাস্তাতেও প্রবেশগম্য যানবাহন দেখা যাবে।

 

*আমরা জানি আমরা যেমন নিজেদের কোন গুণের জন্য প্রতিবন্ধীত্বহীনভাবে জন্মগ্রহণ করি নাই ঠিক তেমনি যারা প্রতিবন্ধী তারাও নিজেদের কোন দোষের জন্য প্রতিবন্ধিতা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে না। এ সকল ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত সহানুভূতিসম্পন্ন হয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য আমাদের গণসংযোগ করা উচিত।

মোহম্মদ খায়রুল আলম,

কনসালটেন্ট, আইএলও।

*আমাদের দেশের পাবলিক পরিবহনে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে পরিবহন খাতে সরকারি পলিসি দরকার যা বাস্তবায়নে প্রশাসন এবং অর্থায়ন নীতিমালা এবং তহবিল দ্বারা কার্যকরী করতে অনুসৃত হতে হবে।

*এক্ষেত্রে বিআরটিসি উল্লেযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। বাসে প্রবেশের জন্য ফুটপাথগুলো প্রবেশগম্য নকশার উপর ভিত্তি করে তৈরি করা প্রয়োজন যেখানে বাসগুলো এসে থামবে। বিশেষ করে বি আর টি সি বাস স্টপেজের ফুটপাথগুলো এইভাবে পরিবর্তন করা প্রয়োজন।

*যাতায়াত ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে একীভূত করা কোন সামাজিক অনুদান নয়, বরং জাতিসংঘ সনদ স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে এটা সরকারের দায়িত্ব। যা এডভোকেসি এবং জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় তুলে ধরা প্রয়োজন। একমাত্র গণমাধ্যমই সচেতনতা তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

মোহম্মদ আলী খান

অতিরিক্ত সচিব,

পল্লী উন্নয়ন বোর্ড।

*ক) সরকারের ভূমিকা ইতিবাচক হতে হবে।

খ) এজন্য মাইন্ডসেট পরিবর্তন দরকার, সরকার এ ব্যাপারে যথাযথ awareness কর্মসূচী নিতে পারে।

গ) আইনগত ও বিধিগত সমর্থন এবং একইসাথে আর্থিক ও logistic support দেয়া একান্ত অপরিহার্য ।

 

*ক) সহজ ও স্বল্পমূল্যে প্রযুক্তি ব্যাবহার করতে পারলে।

খ) সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলে।

গ) আইনগত বাধ্যবধকতা করতে পারলে।

 

*ক) প্রথমে মাইন্ডসেট চেঞ্জ  করতে হবে ।

খ) বিভিন্ন গনমাধ্যমে নিয়মিত প্রচার করা ।

গ) উন্নত দেশসমূহের অনুশীলন চিত্র,বাস্তবচিত্র বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারের ব্যবস্থা করা।

ঘ) যে আইন ও বিধি আছে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

ঙ) প্রতিবন্ধী কার্ড দিয়ে এমনভাবে সামাজিক ও সরকারি পর্যায়ে সুযোগ সৃষ্টি করা যাতে সকলে আবশ্যিকভাব গ্রহনযোগ্য বলে মনে করতে পারে।

চ) সর্বোপরি স্কুলপর্যায়ে শিশুদের সচেতন করে তুলতে হবে। এ ব্যাপারে জিও এবং এনজিও পর্যায়ে সমন্বয় একান্ত দরকার।