বেসিস পুরস্কার জয়ী সফল ফ্রিল্যান্সার জাহিদের পথ চলা

তারুণ্যদীপ্ত জাহিদুল ইসলাম যার মায়াবী চেহারাজুরে হাসির ছটা দেখে বোঝার উপায় নেই নিজের পায়ে ভর করে দাড়াতে পারেন না তিনি। কম্পিউটারের সামনে হুইল চেয়ারে বসেই যিনি হয়ে উঠেন বিশ্বকর্মী। তথ্যপ্রযুক্তিতে খুব বেশি দক্ষ না হয়েও মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘরে বসেই আয় করছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধিতাকে পাশে নিয়েই পড়াশুনাও চালিয়ে যাচ্ছেন অদম্য মনের জোরে। তবে পেছনে ফেলে আসা দুঃসহ দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে নিমিষেই আঁধার নামে চোখেমুখে। ধীরে ধীরে বলতে থাকেন ব্যক্তি ও পারিবারিক সংগ্রামের কথা। দুই বছর বয়সে হটাৎই পোলিও আক্রান্ত হয়ে জীবন যেনো থেমেই পড়েছিলো। কিন্তু ছেলে পরনির্ভশীল জীবন যাপন করবে এটি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না মা বাবা। একমাত্র ছেলে জাহিদ কে আত্ননির্ভশীল হিসেবে গড়ে তোলার এক অসম্ভব যুদ্ধে নেমে পড়েন। যে কোনো মুল্যে পড়াশুনা অব্যাহত রাখতে ঢাকার মিরপুরের বাসা থেকে প্রতিদিন মা তাকে কোলে করে স্কুলে নিয়েছেন। তিনতলায় ক্লাশ শেষে আবার কোলে করে নামিয়ে বাসায় ফিরেছেন। ২০০০ সালে মায়ের কোলে চড়েই শহীদ স্মৃতি স্কুল এ্যান্ড কলেজে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন জাহিদ। তবে এক বছর পর মা অসুস্থ হয়ে পড়লে আবার স্কুল যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় জাহিদের। এসময় একজন রিক্সাওয়ালাকে তার আনা নেওয়ার জন্য রাখা হয়। ২০০৫ সালে বানিজ্য বিভাগে মাধ্যমিক এবং ২০০৭ সালে আদমজি ক্যান্ট. পাবলিক কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর টিউশন ফি তে বিশেষ ছাড়ে সাউথ ইষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ শেষ করে বর্তমানে নিজের আয়ে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমবিএ করছেন। জাহিদের স্বপ্ন উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বিদেশে পড়তে যাওয়ার। আর এমন স্বপ্ন বা সাহসটি সঞ্চয় করিয়ে দিয়েছে ফ্রিল্যান্সিং। তার ভাষায় চলাচলে অক্ষম একজন মানুষকে ভিন্নভাবে সক্ষম হিসেবে গড়ে তুলতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের চেয়ে ভালো বিকল্প আর হয় না। বানিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কর্মযজ্ঞকে পাশ কাটিয়ে অপেক্ষাকৃত সহজ ই-মেইল মার্কেটিংয়ের মতো কাজ বেছে নিয়েছেন তিনি। ওডেস্ক, ইল্যান্স ও ফিভারে কাজ করেছেন। শুধু ওডেস্কেই কাজ করেছেন চার হাজার ঘন্টা। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রথম দিকে ডাটা-এন্ট্রি ও ওয়েব রিসার্চের কাজ দিয়ে এ জগতে পা রাখেন জাহিদ। পরে ফেসবুকেই জানতে পারেন ক্রিয়েটিভ আইটি লিঃ সম্পর্কে। তাদের সাহায্যে আউটসোর্সিং এ এসইও ট্রেনিং নেন এবং কাজ শুরু করেন।

 

গত কয়েক বছর ধরে পেশাজীবী ফ্রিল্যান্সারদের উৎসাহী করতে বাংলাদেশ অ্যাসিসোয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড সার্ভিসেস (বেসিস) বিভিন্ন বিভাগে পুরুস্কৃত করছে তাদের। চলতি বছর ৯৯ জন ফ্রিল্যান্সার ও প্রতিষ্ঠানকে পুরুষ্কৃত করা হয়েছে তাদের কয়েকজনের মধ্যে আমাদের জাহিদ একজন। আনন্দে আবেগাপ্লুত জাহিদ বলেন, এই ভালো লাগার অনুভূতি প্রকাশে আমি অক্ষম। আমার এতো সীমাবদ্ধতা নিয়েও নিজের জন্য কিছু করতে পারছি, পরিবারের জন্য কিছু করতে পারছি এটাই আমার সবচেয়ে বড় পাওয়া। আমার এই শারীরিক প্রতিবন্ধিতা নিয়ে পদে পদে নানা বাঁধার ফলে মা বাবার চোখে হতাশা দেখেছি। কিন্তু প্রথম যেদিন আউটসোর্সিং থেকে উপার্জিত টাকা মায়ের হাতে তুলে দিলাম তাদের হাসিমুখ আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে, এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। ভবিষতে নিজেকে সফল মানুষ হিসেবে দেখতে চান জাহিদ। আর চান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সফল জীবনের রুপকার হতে।

তার মতে বাংলাদেশে যেহেতু প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং অবকাঠামো তেমন নেই অনেকে চাইলেও এগিয়ে আসতে পারছেন না এ স্বপ্ন পূরণে। ঘরে বসেই ফ্রিল্যান্সিং এ ভাল করার জন্য কমিউনিকেশন স্কিল সবচেয়ে বেশি জরুরী। সাধারণত গ্রাফিক্স, এসইও, ওয়েব ডিজাইনের কাজের বেশি চাহিদা। সুতরাং এগুলোর যেকোনটি শিখে ফ্রিল্যান্সিং কাজ শুরু করা যায়। তিনি মনে করেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরও মূল জনস্রোতে সামিল করতে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তারা ভূমিকা রাখতে পারেন।