শারীরিক প্রতিবন্ধিতা কোন বাধাই নয়

রাজশাহী জেলার সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম । সবার ছোট বলে আদরটাও বেশী। দু’বছর বয়সে আমার পোলিওতে আক্রান্ত হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবারে কিছুটা বিষাদের ছায়া নেমে আসে। তারা সামর্থ্য মতো আমার চিকিৎসার জন্য সবটুকু করেছিলেন। তবুও নিজের পায়ে ভর করে আর দাঁড়াতে পারি নি। আশাহীন-দিশাহীন এক মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে গৃহবন্দী হয়ে পড়লাম। জানালা দিয়ে অবাক হয়ে দেখতাম, আমার বয়সী ছেলে-মেয়েদের স্কুলে যাওয়া আসা। ওরা যখন দৃষ্টির বাইরে চলে যেত, তখন চোখ দু’টো জলে ভরে উঠতো। এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ও অভিমান ঘিরে থাকত সবসময়। এই মাঝেই মায়ের কাছে লেখাপড়ার হাতে-খড়ি হয়েছিলো। এভাবেই চেষ্টা করেছি উঠে দাঁড়ানোর ।

 

প্রায় ১২ বছর পর আমার মেঝ বোনের বিয়ে আমার জীবনের মোড় ঘুড়িয়ে দিলো নতুনভাবে। আমার দুলাভাই ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা এবং একজন সচেতন মানুষ। আমার প্রতিবন্ধিতার সম্পর্কে তিনিই প্রথম সচেতনতা আনলেন আমাদের পরিবারে। বোঝালেন, পরিবারের সবারই আমার জন্য আলাদা দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থাকতে হবে। আমাকে আত্ননির্ভরশীল করে তুলতে হবে। আমাকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। চিকিৎসা করালেন। পঙ্গু হাসপাতালে তৎকালীন আমেরিকান চিকিৎসক ডাঃ গার্ষ্ট দেখলেন আমাকে। প্রায় এক বছর হসপিটালে রেখে বেশ কয়েকদফা অপারেশনের পর ক্রাচে ভর করে কোনভাবে একটু দাঁড়ানোর উপযুক্ত করে তুললেন আমাকে। পুরোটা সময় সঙ্গে ছিলেন মা। ক্রাচে ভর করেই জীবনে প্রথম হাঁটতে শিখলাম। তবে তা ছিল আর দশজনের চাইতে সম্পূর্ণ আলাদা। অনেক বেশী কষ্টকর আর ঝুঁকিপূর্ণ্।

 

স্কুলে প্রথম ভর্তি হলাম ক্লাস সেভেনে। সরকারী পি.এন গার্লস হাই স্কুল। হেড মিস্ট্রেস রাহেলা খাতুন স্বচ্ছন্দেই ভর্তি করে নিলেন। উনার কাছে আমি আমার শিক্ষা জীবন, প্রকারান্তরে বর্তমান জীবনের জন্য ঋণী। স্কুলে আসতে পেরে জীবনে প্রথমবারের মতো বাইরের সুন্দর জগৎটাকে দেখলাম। হয়তো সে  আনন্দেই ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটার সব কষ্ট মুছে গেল। অল্পদিনেই স্কুলের সহপাঠীদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। ক্লাসের পড়াশোনায়ও ভাল করতে লাগলাম। টিচার আর বন্ধুদের সহযোগিতায় বেশ ভাল রেজাল্ট হলো। স্কুলের এই বন্ধুরাই ছিল আমার শিক্ষা জীবনের অপার আনন্দের উৎস। স্কুল শেষে রাজশাহী সরকারী কলেজে ভর্তি হলাম। ক্লাস হতো বিভিন্ন রুমে। ফলে আমার চলাচলে কষ্ট হতো বেশ। তবুও সব মেনে নিয়েই চলাফেরা করতাম। নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা ভাবতে চাইতাম না। দৃঢ় প্রত্যয় ছিল নিজের ভেতর, আমাকে পারতেই হবে। প্রতিষ্ঠিত হতেই হবে। নিজেকে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে; বাঁচতে হবে সম্মান নিয়ে। এভাবে কলেজ শেষে একদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পা রাখলাম। বিশাল এলাকা জুড়ে, বাস থেকে নেমেও অনেক পথ হেঁটেই ক্লাসে যেতে হতো। ক্লাসে যখন পৌঁছাতাম তখন খুব বেশি ক্লান্ত হয়ে পড়তাম। মাঝে মাঝে মনে হতো, আর বোধ হয় সম্ভব হলো না। এর পরেও প্রায় সবটুকু জীবনী শক্তি ব্যবহার করে, অমানুষিক কষ্ট করে সাফল্যের সাথে মনোবিজ্ঞানে অনার্স নিয়ে মাস্টার্স পাস করি।

 

তারপর শুরু হলো জীবনের সত্যিকারের সংগ্রাম। কোন মানুষের জীবন যে এত কষ্টকর, এত বিড়ম্বনা আর গ্লানিময় হতে পারে, নিজেকে দিয়ে জানতে না পারলে কোনদিনও তা বিশ্বাস করতাম না। একটি কর্মসংস্থানের জন্য ধর্ণা দিতে হয়েছে দ্বারে দ্বারে। কিন্তু কোন সফলতা পাই নি। কারণ ছিল আমার প্রতিবন্ধিতা। প্রতিবন্ধিতার কাছে আমার সব উপযুক্ততা, শিক্ষা, যোগ্যতা যেন একেবারেই মূল্যহীন হয়ে পড়ছিল। একের পর এক এমনই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে চাকরির জন্য পরীক্ষা দিলাম আরব বাংলাদেশ ব্যাংকে। ভাল ফলাফলও করলাম। কিন্তু ইন্টারভিউ বোর্ডের কয়েকজন আমাকে নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। তারা যুক্তি দেখাচ্ছিলেন, আমার মতো একজন প্রতিবন্ধী মেয়ে যে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে না তাকে দিয়ে কিভাবে প্রাইভেট ব্যাংকে কাজ করানো সম্ভব? সেই সময়টি ছিল আমার জীবনের সবচাইতে কঠিন সময়। তাদের নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করলাম, আমার কষ্টার্জিত শিক্ষা জীবনের উপলব্ধি। বোঝাতে চাইলাম, যদি আমি প্রতিবন্ধিতার কঠিন কষ্ট সহ্য করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রী লাভ করতে পারি, তবে কেন চেয়ার টেবিলে বসে কাজ করতে পারবো না? আমার হাত এবং চিন্তা শক্তিতে তো কোন প্রতিবন্ধিতা নেই। আমাকে পরীক্ষামূলকভাবে হলেও সুযোগ দেওয়া হোক।

 

শেষ অবধি কর্তৃপক্ষ রাজী হলেন, আমার চাকরি হলো। এজন্য আমি আরব বাংলাদেশ ব্যাংক কতৃপক্ষের কাছে কৃতজ্ঞ, চিরঋণী। জীবনে পূর্ণতা পেয়েছি এই এবি ব্যাংকের জন্যই। সার্থক হয়েছে জীবন, দেশ ও সমাজে পেয়েছি প্রতিষ্ঠা। শুরু হলো চাকরি জীবন। এবার সত্যিই মনে হলো আমিও মানুষ।

 

এসময় কিছু কঠিন বাস্তব অভিজ্ঞতারও মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমার চাকরি হয়েছিল ঢাকায়। কিন্তু এখানে থাকার জন্য আমার কোন আশ্রয় ছিল না। আত্মীয়-স্বজন, আপনজনদের কেউ কেউ ঢাকায় থাকলেও আমার মতো একজন প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিজ বাড়িতে জায়গা দেয়ার মতো সাহস কেউ করতে চান নি। যাই হোক, চাকরি জীবনের শুরুতেই বেইলী রোডের কর্মজীবি মহিলা হোস্টেলে নিজের থাকার জায়গা করে নিলাম। পরিবার থেকে বের হয়ে এলাম। পরিবারকে বোঝাতে পারলাম, আমি তোমাদের বোঝা নই। আমিও করতে পারি নিজের জন্য। দিতে পারি তোমাদেরকে, সমাজকে, দেশকেও।

 

আমার পরিবারের সবাই খুশী হয়েছিল আমার এই  অবস্থানে। শুধু মা ছাড়া। কেননা, শুধু মা’ই তো জানতো, কতটা কষ্ট হয় আমার। আমার মতো শারীরিক অবস্থা নিয়ে হোস্টেলে জীবন-যাপন করা ছিল নিদারুণ কষ্টের। সমস্ত কাজ করতে হতো নিজেকে। অফিস থেকে ফিরে বিছানা ঝাড়া, নিজের বাসন পত্র ধোয়া, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে অনেক কাজ, নিজেকেই করতে হতো। ডাইনিং রুম ছিলো গ্রাউন্ড ফ্লোরে। দোতলা থেকে নিজের থালা, বাটি, গ্লাস নিয়ে নিচে নামতে হতো। এগুলো একটা ব্যাগে ভরে নিজের গলায় ঝুলিয়ে নামতাম। হোষ্টেলে বসবাস আর খাবারের কষ্টে মাঝে মাঝেই মনে হতো, কেবল মাত্র প্রতিবন্ধিতার কারণে আজ আমি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন – বিচ্যুত। যদি আমার প্রতিবন্ধিতা না থাকত তবে কি আমাকে এতটা অসহায় জীবন কাটাতে হতো?

 

১৫ বছরের বেশি সময় এই ব্যাংকে, কাজ দিয়েই নিজের জায়গা করে নিয়েছি। প্রতিবন্ধিতাকে সাথে নিয়েই চাকরি জীবন তথা সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছি। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ অসহযোগিতাও করেছে। তাদেরকেও বোঝাতে পেরেছি, আমি অন্যান্য অনেকের চেয়ে অনেক বেশি কাজ করতে পারি। এখন আমি দু’দিন ছুটিতে গেলেই, আমার ইনচার্জ হাঁপিয়ে উঠেন। আমার অনুপস্থিতি তীব্রভাবে উপলব্ধি করেন এবং তা অকপটে স্বীকারও করেন। শারীরিক সমস্যা কিছুটা বেড়ে যাওয়ায় একসময় আমাকে হুইলচেয়ার ব্যবহার শুরু করতে হয়। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমার নিয়মিত অফিস করার সুবিধার্থে ব্যাংকের প্রবেশমুখে হুইলচেয়ার সহায়ক র‍্যাম্প তৈরি করেছেন যা আমার সহজ চলাচলের পাশাপাশি এবি ব্যাংককে করেছে সকল হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের জন্য উন্মুক্ত। তারা নানাভাবে এগিয়ে এসেছে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে। প্রতিবন্ধীদের স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করছে। এবি ব্যাংকের এইসব মহান উদ্যোগ ব্যাংকিং জগতেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এটাই আমার স্বার্থকতা। এটাই আমার পাওয়া। প্রতিবন্ধিতা এখানে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নি। এই জীবনে এটাই আমার স্বার্থকতা।

 

সবশেষে আমি আবারো আমার শ্রদ্ধেয় দুলাভাই ড. এনামুল হক (অবসরপ্রাপ্ত, পুলিশ মহা-পরিদর্শক) এর প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানাই। কারণ তিনি আমাদের পরিবারে না এলে হয়ত আমার জীবনের গতি প্রকৃতিই হতো অন্যরকম।

 

অন্তরা আহমেদ

এসিস্টেন্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট,

বৈদেশিক বিনিময় বিভাগ,

আরব বাংলাদেশ ব্যাংক লিমিটেড, ঢাকা।