স্টেম সেল গবেষণা: মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের জন্য আশার আলো

16

কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে একটি যুগান্তকারী গবেষণা যাতে মেরুদণ্ড ও ডিস্কে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সুফল বয়ে আনবে। কানাডিয়ান চিরোপ্রাকটিক রিসার্চ ফাউন্ডেশেন (সিসিআরএফ)-এর ডিস্ক জীববিদ্যার অধ্যাপক ড. মার্ক এরউইন এই গবেষক দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

মানুষের আন্তঃমেরুদণ্ডে ডিস্কের স্টেম সেল পুনরায় উৎপাদিত হওয়ার বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটিত করার মিশন নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। তাতে ডিস্ক ক্ষয় রোগ এবং মেরুদণ্ডে আঘাতের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে চিকিৎসার জন্য বিশেষ আশাবাদের লক্ষণ ইতোমধ্যে প্রমাণিত। শরীরের এইসব কর্মক্ষমতা বিনাশকারী এবং যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা ভালভাবে বুঝতে ড. এরউইন একটি প্রচেষ্টা চালান। তিনি একটি মাল্টি ডিসপ্লিনারি ডিস্ক জীববিদ্যা রিসার্চ গ্র“প প্রতিষ্ঠা করেছেন; এতে একই সঙ্গে নিউরো সার্জারি, বাতরোগ সংক্রান্ত বিজ্ঞান এবং সেলুলার ও আণবিক জীববিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করা হয়। ড. এরউইন ও তার দল আন্তঃমেরুদণ্ডের ডিস্কের মধ্য থেকে নটোকর্ডাল ও পরিণত স্টেম সেল বিচ্ছিন্ন করেন। তারপর অল্প অক্সিজেন বিশিষ্ট অবস্থায় সেগুলোর উন্নয়ন ও বিকাশ ঘটান। এতে দেখা যায় স্টেম সেলগুলোর পুনরায় উৎপাদিত হওয়ার ক্ষমতা আছে ও সেগুলো বিভিন্ন ধরনের কারটিলেজ, হাড়, টিস্যু এবং অন্যান্য বিশেষ ধরনের কোষ হিসেবে পৃথক হয়ে বিকশিত হতে পারে। দলের প্রাথমিক গবেষণার মাধ্যমে তারা জানতে পারেন যে, আন্তমেরুদণ্ডের ডিস্ক থেকে প্রাপ্ত স্টেম সেলগুলো পরবর্তীতে স্নায়ু কোষ হিসাবে ডিফারেন্সিয়েট করতে সক্ষম। সম্প্রতি তারা গবেষণা করার পর জানিয়েছেন, পরীক্ষাগারে তারা ডিস্ক কোষের মৃত্যু স্থগিত করতে ও তাদের ফাংশন সংরক্ষণ করতে পারেন। পাশাপাশি এমন কিছু আশার কথাও বলেন যেগুলো অসম্ভব বলে মনে করা হত।

এখনও পর্যন্ত মূলত গবেষণাগারে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র প্রাণীর ওপর পরীক্ষণ চালানো হচ্ছে। অবশ্য যদি মেরুদন্ড আঘাত ও ডিস্ক অধঃপতনের জন্য সফল একটি চিকিৎসার উদ্ভব ঘটে তাহলে রোগীর নিজের স্টেম সেল তাদের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হতে পারবে যা সত্যিকার অর্থেই নিজের উদ্ভাবিত ওষুধের মতই। চিন্তা করা হচ্ছে যে প্রথমে রোগীর ডিস্কের আঘাতপ্রাপ্ত অংশ থেকে তার স্টেম সেল নিষ্কাশন করা হবে ও তারপর সেটাকে এক ধরনের স্নায়ুু বা ডিস্ক কোষে পুনর্জন্ম করাতে হবে এবং তারপর শরীরের যেখানে মেরামতের প্রয়োজন বোধ করা হবে সেখানে সেই কোষকে আবার পুনরায় স্থাপন করা হবে। একটা মানুষ যতটা চিন্তা করতে পারে তার চেয়েও অনেক দ্রুত গতিতে বিজ্ঞান মানুষের সঙ্গে আরও বেশী ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে সহজলভ্য থেরাপির সম্ভাবনাকে সাথে নিয়ে।

কোষের টিকে থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেলুলার পরিবেশ উদ্ধারের ক্ষেত্রে যেসব প্রধান অন্তর্নিহিত সমস্যা রয়েছে সেগুলোর জন্য প্রধান সেলুলার বা আণবিক চিকিৎসার উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই গবেষণা একটি বিরাট দিগন্ত উন্মোচন করেছে। রোগীদের জন্য জীবন যাপনের মানের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। তাদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি ও ব্যাথা কমিয়ে দিয়ে, এমনকি আঘাতপ্রাপ্ত বা অসুস্থ্য টিস্যুর পুনর্জন্মের মাধ্যমে এই সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে।

চিরোপ্রাকটর (chiropractor), ড. এরউইন ১৯৮৪ সাল থেকে এই অবস্থার প্রভাব সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছেন। তিনি সাপ্তাহিক ভিত্তিতে একটি টরেন্টো ওয়েস্টার্ন হসপিটালে স্পাইন ক্লিনিকে তার রোগীদের ওপর তার ব্যক্তিগত অনুশীলন করে যাচ্ছেন। তিনি টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয় এবং টরেন্টো ওয়েস্টার্ন হসপিটালের সার্জারি বিভাগের অর্থোপেডিক এবং নিউরোলজিকাল সার্জারি ডিভিশনের অধ্যাপক। ২০০৪ সালে তিনি টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁর পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন এবং তখন থেকে তার বিভিন্ন ধরনের অগ্রদূতমূলক পর্যালোচনা ও গবেষণাপত্র প্রকাশ হতে থাকে; যেগুলো কানাডিয়ান ইন্সটিটিউট অব হেলথ রিসার্চ (সিআইএইচআর), কানাডিয়ান আর্থরাইটিস নেটওয়ার্ক এবং এও-পাইন নর্থ আমেরিকা এবং এও- স্পাইন ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক পুরুস্কৃত  হয়েছে।

ড. এরউইন তার এই গবেষণার মাধ্যমে মেরুদণ্ডে আঘাত বা অধঃপতনমূলক পরিবর্তনের ফলে যেসব রোগীরা কষ্টে ভুগছেন সেইসব আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য নতুন আশার উদয় ঘটিয়েছেন।

বিদেশী লেখা থেকে অনুবাদ – শারমিন আক্তার