দুর্যোগে প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে থাকা জরুরি

 

সফিউল আযম

প্রতিবন্ধীদের সাথে রাখবো, দুর্যোগ সহনশীল দেশ গড়বো এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গত ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী পালিত হলো আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস। দুর্যোগ সহনশীল সমাজ প্রতিষ্ঠা ও প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা পূরণ ও দুর্যোগে ঝুঁকি কমাতে সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশেও সরকারি ও বেসরকারিভাবে দিবসটি পালিত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরকে দুর্যোগের হাত থেকে রেহাই দেয়া দিবসটির মূল উদ্দেশ্য। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর অনুসারে প্রতিবন্ধিতার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে – যেকোন কারণে ঘটিত দীর্ঘমেয়াদী বা স্থায়ীভাবে কোন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ততা বা প্রতিকূলতা এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারস্পরিক প্রভাব, যার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হন। বিশ্বের প্রায় ১ বিলিয়ন লোক বিভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বাস করছে। জাতিসংঘের এক গবেষণায় দেখা গেছে সাইক্লোন, ভ’মিকম্প ও সুনামির মতো দুর্যোগ ঝুঁকির তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ এবং এশিয়ার মধ্যে দ্বিতীয়।

 

সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, নিবির্শেষে সমসুযোগ ও সমঅধিকার রয়েছে এবং জাতীয় উন্নয়নে দেশের সকল নাগরিকের সমঅংশীদারিত্বের সুযোগ সৃষ্টি একটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী নাগরিকদেরও রয়েছে উন্নয়ন ও অংশগ্রহণের পূর্ণ অধিকার। কিন্তু আমাদের দেশের সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, এদের আমরা নাগরিকের মর্যাদা দিতে চাই না বরঞ্চ আমাদের অজ্ঞতা, ভয় ও কুসংস্কারচ্ছন্ন্ মনোভাবের কারণে পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড তথা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে তাদের অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্বের অধিকার খুবই নগন্য।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণের অর্ন্তভূক্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। তাদের সমঅধিকার রক্ষায় অগ্রগতি অনেক, কিন্তু এখনো তা কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌছেনি বলে সমাজের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত রয়ে গিয়েছে তারা। একথা ঠিক যে, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এজন্য জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সৃষ্ট সিডর ও আইলার মত প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

মানসিক, শারীরিক ও অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভিন্ন ধরণের চলার গতি ও চাহিদার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও দুর্যোগের প্রভাব এদের সবার ওপর প্রায় সমান ভাবেই পড়ে। আমরা জানি জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের কাছের কেউ এসবে সাহায্য করেন। যখন এসবের ব্যাত্যয় ঘটে তখন তারা ভীষণ মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। সাধারণ আর দশজন মানুষের মতো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে এদের কম থাকে। তাদের সমস্যাগুলোকে অনেক সময় অবজ্ঞা করা হয়। খাওয়া দাওয়া থেকে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সব কিছুতেই তারা পিছিয়ে যায়।

একথা ঠিক যে, যেকোন দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয় দরিদ্র জনগোষ্ঠী। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে যারা প্রতিবন্ধী তারা আরো বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এ বিষয়কে বিবেচনায় রেখে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে। দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব হলে যেকোন প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকিহ্রাস পাবে। এজন্য দুর্যোগ মোকাবিলায় দারিদ্র্য দূরীকরণ কর্মসূচিকে আরো গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা দরকার। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিহ্রাস কর্মসূচিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়কে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আশার কথা দুর্যোগ বিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলীর পরিমার্জিত সংস্করণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়কে সংযুক্ত করা হয়েছে। ভিজিএফ কর্মসূচির নীতিমালায়ও তাদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে এবং এটাকে আরো জোরদার করা প্রয়োজন। দুর্যোগের সময়ে তাদের যে করুণ অবস্থা হয় তা মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে  এবং  তাদের সমাজের উন্নয়ন কর্মকান্ডে অন্তর্ভূক্ত করতে না পারলে সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়। এজন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রতিবন্ধিবান্ধব প্রকল্প গ্রহণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন।

 

দুর্যোগকালীন আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানবেতর ঝুঁকি এবং অবহেলার শিকার হয় নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধী মানুষ। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে নানা ধরণের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবন্ধী দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য ক্ষুদ্র স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্প চালু করা সময়ের দাবি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় তাদের নিরাপত্তা বিধান করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এই বিষয়টি ভুলে যাই। সবসময় তাদের বিষয়টিকে চিন্তা করে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে অধিক ও নিরাপদ আশ্রয় করা যেমন জরুরি তেমনি দুর্যোগ পরবর্তী তাদের পূনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

২০১০ সালের কানকুন সম্মেলনের প্রাক্কালে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তাদের দাবি তুলে ধরেন। বাংলাদেশেও ১০০ জন প্রতিবন্ধী মানুষ জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক মানববন্ধনে, আমরা প্রতিবন্ধী নই, জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলায় ব্যর্থ বিশ্ব নেতারাই প্রতিবন্ধী স্লোগানে মুখরিত করে। মানববন্ধন থেকে জলবায়ূ ন্যায়বিচার পাওয়া তাদের ন্যায্য অধিকার এবং জলবায়ূ অর্থের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও তথ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বিশ্ব নেতাদের আহবান জানানো হয়। আমরাও চাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করা হোক এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রকল্পে সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেয়া হোক।

জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডে প্রতিবন্ধিতা বিষয়টি অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন। অন্যসব নাগরিকের মত সমাজে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমান অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। নিজের পরিবারের মতো, সন্তানের মতো দুর্যোগে তাদের পাশে থেকে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে।

সফিউল আযম: মানবাধিকারকর্মী।