দৃষ্টিহীন কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র হাতেই তৈরি আজকের মান্না দে

40

 

শাহাবুদ্দিন আহমেদ দোলন

 

বিশ দশকের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ কৃষ্ণ চন্দ্র দে, যিনি দৃষ্টিহীন হয়েও নিজের মেধা ও দক্ষতার গুনে ভারতীয় সঙ্গীত জগতে নিজেকে দাঁড় করিয়েছিলেন এক অনন্য উচ্চতায়। সঙ্গীত পরিবারে জন্ম না হলেও ভালবাসা থেকেই সঙ্গীতের নিজস্ব ঘরানায় তৈরি করেছিলেন আপন ভুবন। শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি অগাধ ভালবাসা এবং নিষ্ঠা দেখে শশীভূষণ চট্টোপাধ্যায় তাঁকে গান শেখাবার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সেই থেকে শুরু সঙ্গীত শিক্ষার। ক্রমান্বয়ে তিনি উস্তাদ বাদল খানের কাছে খেয়াল, দানী বাবুর কাছে ধ্র“পদ, রাধা রমণের কাছে কীর্তন ও কণ্ঠে মহারাজের কাছে তবলা শেখেন।

গ্রামোফোন কোম্পানী তার প্রথম রেকর্ড বের করে ১৯১৭ সালে। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। সঙ্গীতের প্রতিটি ক্ষেত্রে অবাধ বিচরণ তাঁর। মূলত ক্লাসিক্যাল শিল্পী হলেও জনপ্রিয় কীর্তনিয়া ছিলেন তিনি। সেই সময় অসংখ্য কীর্তন বা কীর্তন অঙ্গের গান গেয়েছেন, লিখেছেন এবং সুরও করেছেন। “স্বপন যদি মধুর হয়”, “তোমার কাজল আঁখি”“তুমি গো বহ্নি শিখা,” “মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হল বলিদান” এমন বহু কালজয়ী গান আজো লোকমুখে শোনা যায়। অন্যান্য গানগুলোও লোকসঙ্গীত আশ্রিত হওয়ায়, সহজেই শ্রোতার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কীর্তন, বাউল ও ভাটিয়ালী গানগুলোর পাশাপাশি তাঁর গাওয়া হিন্দী, উর্দু, গজলও জনপ্রিয় হয়ে উঠে। তাঁর হাত ধরেই বাংলা গানে ঠুমরী, দাদরা ও গজলের প্রচলন হয়। গান বাছাইয়ের ক্ষেত্রে তিনি বেশ যত্নশীল ছিলেন। বেশীর ভাগই বিখ্যাত কবি হেমেন্দ্র কুমার রায়, শৈলেন রায়, অজয় ভট্টাচার্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখের লেখা গানকে নিজেই সুর দিতেন।

 

কি এক অপার প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিলেন কৃষ্ণ চন্দ্র দে! দৃষ্টিহীন হয়েও অসম্ভব দক্ষতায় সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় বিচরণ শুরু করেন। সঙ্গীত পরিচালনার পাশাপাশি সুনিপুনভাবে মঞ্চ ও সিনেমাতে সমান দাপটে অভিনয় করে গিয়েছিলেন। অভিনয়ের ক্ষেত্রে দৃষ্টিহীনতা বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি কখনোই। অপর প্রবাদপুরুষ শিশির ভাদুরির থিয়েটারে একের পর এক নাটক সফল হতে থাকে কৃষ্ণ চন্দ্রের সঙ্গীত ও অভিনয় গুণে। এরপরে বাংলা থিয়েটারের উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে ১৯৩১ সালে কৃষ্ণ চন্দ্র নিজেই থিয়েটার কোম্পানি খোলেন। শিশির ভাদুরিও অভিনয় করেছিলেন তাঁর নতুন থিয়েটারে। সেই সময়ে থিয়েটার নিয়ে দারুণ ব্যস্ত তিনি। এরি মাঝে প্রস্তাব আসে সিনেমা জগত থেকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও প্রথম ‘টকি সিনেমা’য় দুটি গানে কণ্ঠ দেন ১৯৩১ সালে। পরের বছর ১৯৩২ এ নির্মিত ‘চণ্ডীদাস’ সিনেমায় নাম ভুমিকায় অভিনয় ও কণ্ঠদান দুইই সাফল্যের সাথে করেন।

কলকাতার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকাকালীন কৃষ্ণ চন্দ্র দে ১৯৪২ সালে মুম্বাই পাড়ি জমান। দৃষ্টিহীন ছিলেন তাই সহযোগী হিসাবে সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিল তার ভ্রাতুপুত্র, পরবর্তীকালের আরেক কিংবদন্তী হয়ে উঠা সঙ্গীত শিল্পী মান্না দে। যিনি ছিলেন কাকার যোগ্য সহযোগি শিষ্য। কাকাই তার সঙ্গীত গুরু ও প্রেরণার উৎস। এ কারণেই সঙ্গীত জীবনের শুরু থেকেই উপমহাদেশের খ্যাতিমান সঙ্গীতজ্ঞদের সান্নিধ্য এবং তাদের কাছে তালিম নেয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল মান্না দে’র। কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সম্মান জানাতেই নিজের পৌত্রিক নাম বাদ দিয়ে কাকার দেয়া ডাক নাম মান্নাতেই পরিচিত হন তিনি। যে মান্না দে আজ ভারতের সঙ্গিতাঙ্গনের কিংবদন্তী শিল্পী, তিনি এই দৃষ্টিহীন কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে’র হাতেই তৈরী। কাকার হাত ধরেই প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অপর কিংবদন্তী শচীন দেব বর্মন এর সঙ্গীতে হাতে খড়িও কৃষ্ণচন্দ্র দে’র হাতেই।

মুম্বাইতে অভিনয়ের পাশাপাশি তৎকালীন সময়ের হিন্দি ছবির অসংখ্য জনপ্রিয় গানের সুরারোপ, সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন তিনি। জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী মোঃ রফি, মুকেশ এবং কিশোর কুমার সহ অনেকেই গেয়েছেন সেসব গান। তবে সবচেয়ে বেশি গেয়েছেন মোঃ রফি। মুম্বাইয়ের সিনেমা জগতে তিনি পরিচিত কে. সি. দে নামে।

১৯৪৭ এ বাংলা সিনেমা জগতে ফিরে এসে শুরু করেন সিনেমা প্রযোজনা। পরপর বেশ কয়েকটি সফল সিনেমার পর, ১৯৫৭ সালে ‘একতারা’ সিনেমায় অতিথি শিল্পী হিসাবে জীবনে শেষবারের মতো পর্দায় আবির্ভূত হন তিনি। ১৯৬২ সনের নভেম্বরে ৬৯ বছর বয়সে কলকাতায় বসবাসকালীন অবস্থায় পরলোকগমন এর মধ্য দিয়েই বাংলা সঙ্গীতের এক আদি পর্বের অবসান ঘটে।

অমর এই কিংবদন্তী শিল্পীর জন্ম ১৮৯৩ সনের আগস্ট মাসের জন্মাষ্টমীর দিনে। তাই বাবা শিব চন্দ্র দে ও মা রতœমালা দেবী ছেলের নাম রাখেন শ্রীকৃষ্ণের নামে, তথা কৃষ্ণচন্দ্র দে। কৈশোর বয়সে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অন্ধত্ব বরণ করেন তিনি। তাকে আমরা প্রতিবন্ধী বলতে চাই না। কারণ সাধারণ অর্থে প্রতিবন্ধী তাদেকেই বলে যাদের চলাফেরায় নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন “কৃষ্ণ চন্দ্র দে দৃষ্টিহীন ছিলেন কিন্তু তাঁর চলাফেরা, কাজকর্ম স্বাভাবিক ছিল। পঞ্চ ইন্দ্রিয় যেমন সজাগ ও সচেতন ছিল তেমনি স্মৃতি শক্তিও ছিল প্রখর। যিনি তাঁর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতাকে পরাজিত করেছিলেন অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের ক্ষমতা দিয়ে। তাই আমরা যে প্রচলিত অর্থে প্রতিবন্ধী বলি তা তিনি ছিলেন না। বাংলাদেশের নজরুল সঙ্গীতের আর এক অন্যতম কণ্ঠশিল্পী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, “কৃষ্ণ চন্দ্র দে যেমন মুম্বাইতে কে.সি.দে নামে পরিচিত ছিলেন তেমনি কলকাতায় পরিচিত ছিলেন কানা কেষ্ট নামে। কিন্তু এ বিষয়টি আমাকে বেশ মর্মাহত করে।” কানা কেষ্ট কথাটির মধ্যে এক ধরনের অবহেলা জড়িয়ে আছে বলে তিনি মনে করেন। তবে দৃষ্টিহীন হলেও তিনি যে নিগৃহীত ছিলেন তা বলা যাবে না। কারণ ভাতিজা মান্না দে জীবনের বেশিরভাগ সময় তার কাকা কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র সহযোগি হয়ে তাকে অনুসরণ করে গেছেন।

 

দৃষ্টিহীন বা প্রতিবন্ধী বলে অবহেলা নয় তাদের প্রয়োজন সহযোগিতা ও ভালবাসা। একটু সহযোগিতা ও ভালবাসা পেলে তারা সমাজের মূলধারায় মিশে গিয়ে দেশ ও জাতিকে সম্মানের সাথে তুলে ধরতে পারে বিশ্বের বুকে। তার অনন্য উদাহরণ হয়ে থেকে যাবে সঙ্গীতজ্ঞ কৃষ্ণ চন্দ্র দে’র নাম।