প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদরাও হতে পারেন দেশের সম্পদ

17

বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম জনবহুল উন্নয়নশীল দেশ। যদিও এদেশের অধিকাংশ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থা দারিদ্রসীমার নীচে। বিশেষ করে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ অধিকার বঞ্চিত হয়ে অনেকটা সমাজ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বসবাস করছে।

 

প্রতিবন্ধিতা জ্ঞান ও সচেতনতার অভাবে সমাজ ও পরিবারে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবস্থা ইতিবাচক নয়। ফলে উন্নয়ন কর্মকান্ডের মূলধারায় সম্পৃক্ত হয়ে তাদের সমঅধিকার, সমসুযোগ প্রতিষ্ঠিত করতে পারছে না। রাখতে পারছে না প্রতিভা, দক্ষতা, সক্ষমতারও প্রমাণ। শিশুসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা গ্রহণের সহায়ক পরিবেশ তো নেইই, উপরন্তু খেলাধুলা ও বিনোদোনমূলক কিংবা উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডেও তাদের অংশগ্রহণের খুব বেশি উদ্যোগ নেয়া হয় না। যদিও বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৯৫ সালের জাতীয় প্রতিবন্ধী বিষয়ক নীতিমালা, ১৯৯৮ সালের জাতীয় ক্রীড়ানীতি, ২০০১ সালের প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন এবং বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের ৭, ১৫, ১৭, ১৯, ২৩ ও ২৭ অনুচ্ছেদ- এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকান্ডসহ তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের আইনি অধিকারের কথা সুস্পষ্টভাবে লিখিত আছে কিন্তু তার সুষ্ঠ বাস্তবায়ন নেই।

ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক ও বিনোদনমূলক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে বিভিন্ন সংগঠনে। যেখানে বিপুলসংখ্যক শিশু সহ সব ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু অনুক’ল পরিবেশ, অনুপ্রেরণা, সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে তারা ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শন করতে পারছে না। যদিও সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, মূলধারার ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার মধ্য দিয়ে তাদের প্রতিভার বিকাশ সাধন সম্ভব। পাশাপাশি সক্রিয়ভাবে খেলাধূলোর ফলে মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতির মাধ্যমে নিজেদের আস্থা ও সাহস সুদৃঢ় হবে এবং সমঅধিকার আদায়ে সাহসী ভূমিকা পালন করতে পারবে। এমন উদ্যোগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও তাদের পরিবারে এমনকি সমাজে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

ক্রমাগত প্রাকৃতিক দূর্যোগ, দারিদ্রের কারণে ক্ষমতায়নে ধীরগতি, বেকারত্ব, লিঙ্গবৈষম্য ইত্যাদি বিষয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মৌলিক অধিকার ভোগ করার ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে দেখা দেয়, পরে সহিংসতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এখন সময় এসেছে এসব বাধা দূর করে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে তাদের অধিকার সংরক্ষণের।

 

মূলত প্রধান সমস্যা ও বাধাগুলো: সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এবং সমাজের বিত্তবান, সৃজনশীল ব্যক্তিদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করা উচিৎ যা তেমন দেখা যায় না। মূলত আর্থিক সহযোগিতা ও সংশ্লিষ্টদের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন প্রায় অসম্ভব। ফলে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়ানীতিমালাও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না।

 

তাদের উপযোগী খেলার মাঠ ও ক্রীড়া সামগ্রী পর্যাপ্ত নয়। সুষ্ঠভাবে প্রশিক্ষণের জন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা একাডেমী তো নেইই, রয়েছে বিশেষজ্ঞ বা সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষকের অভাবও।

আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে অধিকাংশ শিশু শিক্ষা সুযোগ বঞ্চিত। সত্য বিবেচনা করে বলতে হয়, প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলস্রোতধারায় শিক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টি এখনো কল্পণাপ্রসূত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবন্ধী শিশুদের ভর্তির ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়। মাত্র কিছু সংখ্যক বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের জন্য কোন ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নেই যেখানে নিজেদের ক্যারিয়ার শুরু করতে পারে।

 

সমস্যা সমাধানে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে:

 

সচেতনতা সৃষ্টি: পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে শিশু ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মৌলিক অধিকার অর্জন সম্ভব। একমাত্র তখনই তারা তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারবে। বিশেষ করে খেলাধূলো ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমঅধিকার ও সমসুযোগ নিশ্চিত হবে। এ বিষয়ে প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এভাবেই ধীরে ধীরে সামাজিক, শারীরিক, মানসিক প্রতিবন্ধকতা সমূহ দূর করে তাদের দক্ষতা ও সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে সমাজে এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবারের মধ্যেই সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব।

 

শিক্ষা: প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষকের মাধ্যমে একীভ’ত শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে হবে। এবং তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে, যাতে অ-প্রতিবন্ধী শিশুদের মতো নিজেদের আÍবিশ্বাস অর্জন করতে পারে তারা। উপযুক্ত পরিবেশ পেলেই তাদের প্রতিভার বিকাশ সম্ভব।

 

প্রশিক্ষণ: ক্রীড়ানীতির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং ব্যাপক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মূলধারার ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে একীভূত হয়ে তৃণমূল পর্যায় থেকে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্পোর্টস ক্যারিয়ার গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এবং সঠিকভাবে ক্রীড়া কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক ও কোচ নিয়োগ একান্ত অপরিহার্য।

 

অর্থ সংগ্রহ: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের উন্নয়নের জন্য আর্থিক সহযোগিতায় সরকারি, বেসরকারি, এনজিও এবং সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিসহ করপোরেট সেক্টরগুলোকে স্বপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

 

সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া একাডেমী নির্মাণ: দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী ক্রীড়া একাডেমী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং তাদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এতে ব্যাপকভাবে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশগ্রহণের সুযোগও সৃষ্টি হবে।

ক্রীড়া সামগ্রী সরবরাহ নিশ্চিতকরণ: সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে শিশু সহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সামগ্রী ও পর্যাপ্ত উপকরণগুলো সরবরাহ করতে হবে।

 

কর্মসংস্থান: শিক্ষা শেষে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা বেশ কঠিন বিষয়। তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের উপযোগী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা বাঞ্ছনীয়। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগ নেয়া উচিৎ তাদের কর্মসংস্থান ও পূণর্বাসনে এগিয়ে আসার জন্য। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পূণর্বাসন কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

 

উপরোল্লিখিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা জানি, এ সমস্যার সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে যৌথ প্রচেষ্টা বিশেষ করে সরকারি, করপোরেট সেক্টর ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ এবং সবার জন্য শিক্ষা বাস্তবায়ন ও সবার জন্য সমান সুযোগ অর্জনে সহায়ক হতে পারে। যে কোন লক্ষ্য অর্জনে বয়স ও প্রতিবন্ধিতা কোন বাধা নয়, চাই অনুপ্রেরণা, চাই সহযোগিতা যা পেলে সমাজের পিছিয়ে পড়া, অবহেলিত অধিকারবঞ্চিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অংশগ্রহণের মাধ্যমে উন্নয়নের মূলধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করে দেশের আর্থ-সামাজিক কর্মকান্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

 

লেখকঃ মোঃ হাফিজুর রহমান (বুলেট)

অধিনায়ক

বাংলাদেশ জাতীয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ক্রিকেট দল।