বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে; প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সহায়ক ব্যবস্থা নেই

17

 দিশা ফারজানা

স্বপ্ন নিয়ে আমাদের বসবাস। প্রত্যেকটা মানুষ নিজ নিজ স্বপ্ন নিয়ে নিজের মত করে বেঁচে থাকতে চায়। কিন্তু এই স্বপ্ন পথের বাঁধা যখন শারীরিক প্রতিবন্ধিতা তখন অনেকগুলো প্রশ্ন দাঁড়িয়ে যায়। কথা হচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া স্বপ্নার সাথে। বাবা-মা, দুই ভাই এক বোন মিলে সুন্দর পরিবার। কিন্তু ঝড় এসে ধরা দিল যখন বাড়ির একমাত্র ছোট মেয়েটা হাঁটতে পারছেনা। দেড় বছর বয়সে পরিবারের সদস্যরা বুঝতে পারেন স্বপ্নার একটি পায়ে পোলিও আক্রান্ত হয়েছে।

গ্রামের বাড়ি থাকার কারণে অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। মেলেনি সঠিক চিকিৎসাও। তারপরেও ক্রাচে ভর করে সব বাধাকে অতিক্রম করে যখন এস.এস.সি ও এইচ.এস.সিতে জিপিএ ৫ পেল তখন সব কিছু যেন নতুন উদ্যোমে ফিরে এল। এরপর আরো এক ধাপ এগিয়ে যেতে সুযোগ হল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু কোথায় যেন আবার ঝড়ের শুরু। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার কিছুদিন পর স্বপ্না হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লো। ধরা পরলো ব্রেন টিউমার।

 

শিক্ষক ও বন্ধুদের সহযোগিতায় চিকিৎসার জন্য যখন ভারতে নিয়ে যাওয়া হল তখন শুধু একটা কথা বার বার মনে হচ্ছিল আর কত?? অনেক হয়েছে, স্রষ্ঠা এবার ক্ষান্ত দাও। এবার সবার দোয়া কবুল না হয়ে পারলো না। সুস্থ হয়ে দেশে ফিরলো। সবার মত ক্লাসে যাচ্ছে, পরীক্ষা দিচ্ছে, হলে থাকছে। বন্ধুদের সাথে আড্ডাবাজি আর ঘোরাঘুরিও চলছে সমানতালে। কিন্তু তারপরেও পথ চলতে গিয়ে ছন্দপতন ঘটে নানান প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হলে। তাকে হুইলচেয়ার ব্যবহার করতে হয় না। তবে সিড়ি দিয়ে উপরে উঠতে তার কষ্ট। সে ও চায় তার মত যারা নানান শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন, তারাও যেন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে আর সবার মত পড়ালেখা শেষে চাকরী করে, স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে আর দশজনেরই মত।

 

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার শতকরা ১৫ ভাগ প্রতিবন্ধী মানুষ। অথাৎ প্রায় ২.৫ কোটি (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান মতে) এই মানুষগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোটা পদ্ধতি চালু আছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। তাদের উপযোগী টয়লেট, প্রবেশগম্যতা, ইশারা ভাষা ও ব্রেইল পদ্ধতির প্রচলন বেশীরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই নেই। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরাও এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তাদের উপযোগী টয়লেট, প্রবেশগম্যতা, ইশারা ভাষা ও ব্রেইল পদ্ধতির প্রচলন নেই। হলগুলোতেও থাকার উপযোগী কোন ব্যবস্থা নেই। প্রত্যেক বছর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের আসনে ভর্তি করা হলেও প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থার অপ্রতুলতা তাদের পিছিয়ে পড়তেই যেন বাধ্য করছে। বিশেষ করে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও যারা হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন তাদের জন্য কৃষি ক্ষেত্রে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে চাওয়াটা যেন অপরাধেরই সামিল। বিশেষ করে যেসব ব্যবহারিক ক্লাসে মাঠে গিয়ে কাজ করতে হয়। প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার অভাবে তাদের পড়ালেখার পরিবেশ ব্যহত হচ্ছে। এর ফলে অনেককেই শারীরিক ও মানসিক হয়রানির শিকার হতে পারে। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন ও পরিকল্পনা শাখার দায়িত্বরত কর্মকর্তাগণের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়ক ব্যবস্থাগুলো স¤পর্কে তাদের প্রতি নির্দেশনা আসে নি বলে এমন ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ ব্যবস্থাগুলো অবশ্যই থাকা দরকার বলে মনে করেন তারা এবং ভবিষ্যতে নির্মিত ভবনগুলো সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা আইন মেনে সম্পূর্ণ করতে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন।