লাল মাফলার

 

আজিজুর রহমান নাবিল

 

মনিরের সাথে রাকিবের পরিচয় খুব বেশি দিনের নয় আবার নেহায়েত কম ও নয়। বছরখানেকের মত হল। মানুষে মানুষে সম্পর্ক ব্যাপারটা বিচিত্র। কিছু মানুষ সারাজীবনেও আপন হতে পারে না আবার কিছু মানুষ সপ্তাহ বা মাসের পরিচয়েই আপন হয়ে উঠে। মনির ও রাকিব এর ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অংশটি ঘটেছে। বয়সের বিস্তর পার্থক্য থাকলেও তাদের সম্পর্ক বন্ধুর চেয়েও ভাল অবস্থানে পৌছে গিয়েছে।

জানুয়ারির মাঝামাঝি। পুরো দেশে শীত জাঁকিয়ে বসেছে। এ সময়টায় রাস্তার পাশের চায়ের দোকানগুলোতে বেশ ভীড় দেখা যায়। সবারই লক্ষ্য থাকে এক কাপ গরম চা এর মাধ্যমে নিজেকে চাঙ্গা করে নেয়া।

রাস্তা দিয়ে যাবার সময় বেশ অনেক দিন পরই আজ চায়ের দোকানে মনিরের সাথে দেখা। মনির তখন চা খেতে খেতে পাশে বসা এক ভদ্রলোকের পেপার এর দিকে গলা বাড়িয়ে কি যেন পড়ছিল। রাকিবকে দেখা মাত্রই বলে উঠল,

– নাহ। দেখছ ভাই ব্যাপারটা। আজও সীমান্তে বিএসএফ দুই জনকে মেরে ফেলল। এভাবে হয় নাকি!! এমন অবিচার আল্লাহ ও সইবে না।

– না দেখি নি। দেখে কি হবে। নিজের চিন্তা করেই কূল পাই না। অন্য চিন্তা কখন করবো। বাদ দেন। চা শেষ করেন, কথা আছে।

– এইটা কি বললা!! আর এত তাড়া দেখাচ্ছ কেন। আজ তো শুক্রবার। কাজ তো নেই আর নামাজ শুরু হতেও তো অনেক দেরি।

– না এমনি। চা শেষ করুন।

 

অনেক জোরাজুরি করে চায়ের বিলটা রাকিবই দিল। কিছুক্ষণ হাঁটার পর হঠাৎ রাকিবকে কেমন যেন অদ্ভুত মনে হল। হয়ত রাকিবের গলায় কটকটে লাল রঙের মাফলারটার জন্যই। হাঁটতে হাঁটতেই মনির কথা বলা শুরু করল,

– তো বল, কি বলার জন্য এত তাড়া?

– আপনার কি এখন ও বেতন থেকে দুই হাজার টাকা কেটে নেয়?

-হ্যাঁ….ভাই। এখন ও।

– আপনাকে আমি তখনই বলেছিলাম। স্ট্যাম্পে সাইন করবেন না। দরকার হলে আমার থেকে কিছু টাকা ধার নেন। তাও শুনলেন না।

– আমাকে ভুল বুঝো না। বাচ্চাগুলা ও বুড়া বাপটার জন্য সাইন না করে পারি নি। তোমার থেকে ধার নিলে তাও তো ফেরত দিতেই হত। তাছাড়া আমার দু’মাসের বেতনও আটকে ছিল। সব মিলিয়ে কোন উপায়ও ছিল না।

– আপনি অমন শর্ত মানতেই বা গেলেন কেন, আপনার তো দোষ ছিল না।

– ভাই, আমার কিছু বলার নাই। আল্লাহ তো দেখছে। আল্লাহ এর বিচার করবো।

-আবেগের কথা রাখেন। আল্লাহ আপনাকে হাতে তুলে কিছু করে দিবে না। মালিকের অন্যায় শর্ত মেনে নিলেন এটা মানা যায় না!!

– বাদ দাও ভাই। তোমাকে যে একটা নাইট ডিউটির চাকুরীর কথা বলছিলাম। তার কোন খবর আছে?

– সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা দোকানে কাজ করে আবার রাতেও! মানুষের ঘুমও তো দরকার!!

– পাঁচ জনের সংসার। এই বাজারে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কিছু হয় না। আর ঘুমের একটা ব্যবস্থা করে নেয়া যাবে। বাড়তি কিছু টাকা না হলে যে সংসারটাই আর চলে না।

– হু….। একটা স্কুলে নাইট গার্ড এর চাকুরীর খোঁজ পেয়েছি। সেই জন্যেই আপনার বাসার দিকে যাচ্ছিলাম।

– আলহামদুলিল্লাহ্। বেতন টেতন কেমন দিবে জানো?

– না। তবে ধারনা খুব বেশি না, এই হাজার দুই বা তিন। চলুন কথা বলে আসি। ওই স্কুল এর হেডমাস্টার আবার আমার বোনের শ্বশুর বাড়ির লোক।

-ও তাহলে তো ভালই। কিন্তু আজ স্কুল বন্ধ না?

– ক্লাস নেই তবে স্কুল তো খোলা দেখে আসলাম। যা হোক, চলেন দেখি।

 

 

রাকিবের বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত ১০টা বেজে গেল। তালা খুলে ঘরে ঢুকে লাইট জ্বালানো মাত্রই দরজার সামনে চিঠির খামটি পেল। প্রথমে অবাকই হল। মোবাইলের যুগে কেই বা তাকে চিঠি দিবে। কিন্তু ভুল ভাঙল যখন চিঠিটা হাতে নিয়ে।

অনার্স ফাইনাল দেবার পরই সফটওয়্যার প্রোগ্রামিং এর কাজ শিখেছিল। শেখার পর পরই বেশ কয়েকটা সফটওয়্যার ফার্মে চাকুরীর আবেদন করে, কিন্তু কোথাও হচ্ছিল না। আজ হঠাৎই এই নামকরা ফার্মে যোগদানের পত্র! রাকিব আগেও লক্ষ্য করেছে মনিরকে যতবারই সে সাহায্য করেছে ততবারই কোন না কোন ভাবে উপকৃত হয়েছে সে। কদিন আগে তার বাবার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ, এই আছে এই নেই অবস্থা। তখন রাকিব জানতে পায় টাকার অভাবে মনির ছোট মেয়েটার পিএসসি পরীক্ষার ফিস দিতে পারছে না। রাকিব ভাল করেই জানে মনিরের হাতে টাকা দিলে কখনই নিবে না। তাই নিজে স্কুলে গিয়ে টাকাটা দিয়ে অনুরোধ করে আসে, টাকাটা হেডমাস্টার স্যার তার মেয়েকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন তাই যেন মনিরকে জানানো হয়। বাসায় এসে রাকিব আবিস্কার করল তার বাবা বারান্দায় দিব্যি সুস্থ মানুষের মত পায়চারী করছে। দেখে বোঝার উপায় নেই একটু আগেও সবাই তার জীবন নিয়ে সংশয়ে ছিল। আজকের ঘটনাটাও ঐ দিনের কাছাকাছিই বলা যায়। মনিরের চাকুরী নিশ্চিত করে বাসায় এসেই রাকিব নিজের চাকুরীর খবর হাতে পেয়ে গেল।

সুখবরটা রাতেই মনিরকে জানিয়ে ফোনটা রাখতে রাখতে হঠাৎ চোখ গেল ক্যালেন্ডারের পাতায়। আজ ১৩ তারিখ। চার মাস আগে এই ১৩ তারিখেই একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে মনিরের জীবনে, যার ফল হয়ত আরও বেশ কয়েক বছর সহজ সরল মনিরকে বহন করতে হবে। কথা গুলো মনে ঘোরাঘুরি করা অবস্থায়ই হঠাৎ রাকিবের মন বিদ্রোহী হয়ে উঠে। সেই রাতেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে মনিরের পরিবারের জন্য কিছু একটা করবেই সে।

 

চাকুরীর প্রথম মাস শেষ। ব্যস্ততা বাড়ছে। মনিরের সাথে আগের মত দেখা সাক্ষাৎ দূরে থাক, ফোনেও কথা হয় না ঠিক মত। কিন্তু তাদের এই অদেখা সময় গুলো দীর্ঘায়িত হতে দেয় না মনিরের একটি ফোন কল।

– কি ব্যাপার মনির ভাই? এত জরুরী তলব?

– চিঠিটা পড়।

– পড়লাম। কিন্তু কিছুই তো বুঝলাম না। খালি লেখা “টাকাটা আপনারই”

রাকিব ফ্যালফ্যাল করে মনিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনির এবার রাকিবকে পুরো ব্যাপারটা খুলে বলে।

– গত সপ্তাহের মঙ্গলবার নাইট ডিউটি শেষে বাসায় আসার পর ছোট মেয়েটা দুই হাজার টাকা ও এই চিঠিটা দিল। দরজার নিচ দিয়ে কে যেন দিয়ে গেছে। ওরা ঘুম থেকে উঠার পরই দেখেছে খামটা।

– বাহ বেশ ভালই তো। তারপর….

– কি বল ভাই। কার না কার টাকা আমি নেই কি করে। তাই রেখে দিলাম। কার সাথে কি বলব ভেবে পাচ্ছিলাম না। এরই মাঝে আজ সকালে বাসায় এসে আবারও পেলাম একই চিঠি ও টাকা। এবার চার হাজার টাকা। তাই দোকান থেকে কিছুক্ষনের জন্য ছুটি চেয়ে তোমার কাছে ছুটে এলাম।

– বেশ বেশ। আপনার তো কপাল খুলে গেল। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ছয় হাজার টাকা পেয়ে গেলেন। আর এত চিন্তার কি আছে, বলছে যখন টাকাটা হয়ত আপনারই।

– আরে আমার টাকা হয় কিভাবে!!! আমি তো কাউকে ধারও দেই নি। আর অন্য কিছু হলেও এভাবে কেন!!!

– দেখেন আপনি হয়ত ভুলে গেছেন বা যে দিচ্ছে সে কোন কারণে আপনার সামনে আসতে চাচ্ছে না। যা হোক, আমি আসি আজকে।

– আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু কিছু একটা তো বল, টাকা গুলো কি করব??

– আমার মত জানতে চাইলে বলছি, টাকা গুলো খরচ করুন।

 

পরের সপ্তাহেও একই ঘটনা। মনিরের ছোট মেয়েটা রাতে ঘুমানোর আগে জানালার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিক তখনই দেখতে পায় লাল মাফলারে মুখ ঢেকে একটা লোক তাদের বাসার দরজার সামনে এসে খাম ঢুকিয়ে দিয়ে খুব তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছে। মনির সকালে এসে দেখে ওই একই চিঠি ও দুই হাজার টাকা। মনিরের সন্দেহ হয় রাকিবই হয়তো কাজটা করছে। কিন্তু কাউকে কিছু না বলে হাতেনাতে ধরার জন্য অপেক্ষা করবে ঠিক করে।

পরের সপ্তাহের প্রথম দিনেই গ্রামের বাড়ি যাবার নাম করে স্কুল থেকে এক সপ্তাহের ছুটির আবেদন করে মনির। মনির সর্বদাই তার কাজে ছিল নিষ্ঠাবান হেডমাস্টার ছুটি দিয়ে দেন। এখন তার একমাত্র কাজ, প্রতিরাতে না ঘুমিয়ে দরজার কাছে ওত পেতে থাকা। প্রথম দুই রাত পুরো বিফলেই যায়। কেউই আসে নি। তৃতীয় রাতে একজনকে দেখা গেল। বাসাটি গলির শেষ মাথায় ও আশেপাশে আর কোন বাড়ি না থাকায় জানালা দিয়ে তাকিয়ে সহজেই বোঝা যায় কেউ তাদের বাসার দিকে আসছে। অন্ধকারের ভিতর দেখা সেই কালো অবয়বটি ক্রমেই পরিস্কার হচ্ছে। কিন্তু বাসার কাছাকাছি এসেই মনিরকে হতাশ করে লোকটি নর্দমায় প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনের লক্ষ্যে দাঁড়িয়ে যায়। সে রাতও জেগে থাকা বিফলেই যায়। দেখতে দেখতে পঞ্চম রাত এসে গেল। অনেকটা হতাশা নিয়েই আজ নির্ঘুম রাত কাটানোর প্রস্তুতি নিল মনির। হাতে ছুটি আছে আর দুই দিন এই ভেবে ক্রমশই অধৈর্য্য হয়ে পড়ছে সে। বাসার সবাই ঘুমিয়ে গেলে দরজার কাছে এসে বসে সে। তবে আবারও সেই বসে থাকাই। কারো আসার নাম গন্ধ নেই। রাত একটার পর হটাৎ লক্ষ্য করলো ধীর পায়ে একজন এগিয়ে আসছে। বাসার কাছাকাছি আসা মাত্র রাস্তার আলোয় লোকটির মুখে বাঁধা লাল মাফলারটি দেখেই বুঝতে পারলো তার অপেক্ষার পালা ফুরিয়েছে। উত্তেজিত মনির প্রস্তুত হয়ে নেয়। দরজার নিচ দিয়ে খামটি ঢুকতেই চট করে দরজা খুলে লোকটির মুখের মাফলার টান দিয়ে খুলে ফেলে সে। লোকটিও এই আকস্মিকতায় বেশ হকচকিয়ে যায়। মাফলার হাতে হতভম্ব মনির দেখতে পায় আবছা আলো আঁধারীতে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে লোকটি।

বেশ কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকার পর ছোট মেয়ের ডাকে সম্বিৎ ফিরে পায় মনির। খামটা আর লাল মাফলার হাতে ধীর পায়ে ঘরে এসে বসে। খামের ভিতর এবারও দু’হাজার টাকা সাথে সেই চিঠি। তবে এবার চিঠিতে লেখা,

“আপনারই টাকা। এখন থেকে প্রতি মাসে পাবেন”

একে একে জট খুলতে থাকে। স্বর্নের গহনার দোকানের ছোটখাট এক কর্মচারী সে। দোকানের মালিক ও তার এক ভাগিনা বসে। চলছিল সব ভালই। কিন্তু মাস পাঁচেক আগের ১৩ তারিখে সব উলোট-পালোট হয়ে গেল। সেদিন দুপুরে দোকান মালিক তার ভাগিনাকে বসিয়ে পারিবারিক অনুষ্ঠানে বাসায় চলে যায়। দোকানে অন্য কর্মচারীও ছিল না। বিকালে তিনজন মহিলা ও একজন পুরুষ একত্রে আসে দোকানে কিছু গহনা কেনার উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষন পর আরও এক দল কাস্টমার আসাতে এটা ওটা ডিজাইন দেখাতে তারা দুজনই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একজন কাস্টমার একটি আংটি কিনে। বাকিরা বলতে গেলে কিছু না কিনেই চলে যায়। কাজ শেষে গোছগোছের সময় মনিরের নজরে পরে চেইনের বাক্সটি খালি। মালিকের ভাগিনা জানাল চেইন গুলো দেখানোর উদ্দেশ্যে বের করা হয়েছিল। চেইনগুলো চুরি হয়েছে বুঝতে পেরে সাথে সাথেই দোকান থেকে বেড়িয়ে মার্কেটের নিচে ছুটে যায় কিন্তু ততক্ষণে তারা কেটে পড়েছে। পুরো মার্কেটে বেশ হইচই শুরু হয়ে গেল। কিন্তু দুর্ঘটনা যা ঘটার তা হয়েই গিয়েছে। প্রথম থেকেই কাস্টমার গুলোকে তেমন সুবিধার মনে হয় নি। সন্দেহ হওয়াতে মালিকের ভাগিনাকে বেশি গহনা বের করতে নিষেধও করেছিল। কিন্তু তিনি শোনেন নি। পরবর্তীতে পুরো দায় এসে পরে মনিরের একার কাঁধে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে তাকে স্ট্যাম্প পেপারে সাইন করিয়ে নেয় মালিক। চুক্তির মূল বিষয়, একত্রে ক্ষতিপূরণ দিতে পারবে না তাই প্রতিমাসে তার বেতন থেকে দু’হাজার টাকা কেটে নেয়া হবে। এবং স্বেচ্ছায় কখনও চাকুরী ছাড়তে পারবে না সে। এভাবেই চলছিল। মাসখানেল আগে মালিকের ভাগিনার পরিবর্তে দোকানে বসা শুরু করে তার বড় ছেলে। আর এ ক’দিন চুপি চুপি যে টাকা দিয়ে যেত সে আর অন্য কেউই নয়, মালিকের সেই ছেলেটিই। সে রাতে মনিরের চোখে ঘুম আসে নি। শুধু একটা কথাই মনে ঘুরপাক খেয়েছে, আল্লাহর দুনিয়ায় সবাই খারাপ নয়। সব মানুষই তার মহত্ত্বকে প্রচার করে বেড়াতে চায় না। কিছু ভাল মানুষ রয়েছে। অবশ্যই আছে, সবাই এখনও পঁচে যায় নি।

 

 

তবে মনিরের জীবনের গল্পটি এখানেই থেমে যায় নি। পরদিন সকালেই আরেক চমক! একটি ল্যাপটপ হাতে রাকিব হাজির। মনিরের বড় ছেলের জন্যে এই ল্যাপটপটা কিনেছে সে। আর সে নিজেই এখন থেকে প্রতি শুক্রবার ছেলেটাকে সফটওয়্যার প্রোগ্রামিং এর পাঠ দেবে।