শনাক্তকরণ কর্মসূচীতে বাদ পড়ছে শতকরা ৪০ ভাগ প্রতিবন্ধী মানুষ

48

ডাঃ কবির হোসেন শিকদার (খুলনা প্রতিনিধি)ঃ দেশব্যাপী পরিচালিত ”প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ-২০১৩” পূর্নাঙ্গভাবে শনাক্তকরণ হচ্ছে না। প্রতিবন্ধী মানুষের ৬০% শনাক্তকরণ হচ্ছে, বাদ পড়ে যাচ্ছে প্রায় ৪০% মতামত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের। অনভিজ্ঞ শনাক্তকরণ তথ্য সংগ্রহকারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনভিজ্ঞ পরীক্ষাকারী ডাক্তার এবং অভিভাবকদের অসচেতনতা তথা সংশ্লিষ্টদের প্রচার প্রচারনার অভাবকেই মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন তারা।

বাড়ী বাড়ী গিয়ে যে সকল মাঠকর্মীগণ তথ্য সংগ্রহ করেছেন তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ধরন সম্পর্কে একেবারেই অনভিজ্ঞ। প্রশিক্ষণ প্রদানের সময় প্রতিবন্ধী কাকে বলে বা প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক ব্যাখ্যা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তারা পায় নি বা তারা গুরুত্বের সাথে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন নি।

 

মাঠকর্মীদের ধারণা যারা হাঁটতে পারে না, চোখে দেখে না শুধুমাত্র তারা প্রতিবন্ধী। কিন্তু বহুমাত্রিক প্রতিবন্ধিতা- যেমন যে সম্পূর্ন চোখে দেখে না, এক চোখে দেখে না বা স্বল্পমাত্রার দৃষ্টিহীন এমন বিভিন্ন ধরণের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ আছেন। একিভাবে মাত্রা অনুযায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধিতাও বহু ধরনের। আরো আছে মানসিক প্রতিবন্ধী, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, অটিজম, কানে না শোনা বা কম শোনা, কথা বলতে না পারা, কথা বলতে মুখে বাধে ইত্যাদি বহু ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষ আছেন। কিন্তু শনাক্তকরন জরিপের মাঠকর্মীরা, যারা চোখে কম দেখেন, কিছু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী, কানে কম শোনা, মুখে স্পষ্ট কথা বলতে না পারা এবং হাত পায়ের পেশীর কার্যকরী ক্ষমতা কম এই ধরনের শত শত হাজার হাজার প্রতিবন্ধী মানুষকে জরিপ কার্যক্রম থেকে বাদ দিয়েছেন এরা প্রতিবন্ধী নয় এই অজুহাতে। যা স¤পূর্ণই তাদের অজ্ঞতা।

অনেক ক্ষেত্রে স্বল্প বা পূর্ণ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ বয়সে বৃদ্ধ হলে তাদের অপ্রতিবন্ধী চিহ্নিত করে বাদ দেয়া হচ্ছে এই বলে, বার্ধক্যজনিত কারণে অনেক মানুষ চোখে দেখেন না। আবার অনেক ব্যক্তিকে বাদ দেয়া হয়েছে সামান্য অসুস্থতা চিকিৎসা পেলে তারা ভালো হয়ে উঠবেন এই ধারনায়।

এই কার্যক্রমে যে সকল ডাক্তার পরীক্ষা করছেন বেশীরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে তিনিও প্রতিবন্ধিতার ধরন সম্পর্কে অভিজ্ঞ নন। ফলে ডাক্তারি পরীক্ষাতেও স্বল্প মাত্রার প্রতিবন্ধী মানুষ জরিপ তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। কার্যক্রমটি আংশিক বা পরিপূর্ন না হবার অন্যতম কারণটি হল প্রচার/প্রচারনার অভাব। দেশের শতকরা ৭৫ ভাগ লোকই এ জরিপ কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন না। ডাক্তারি পরীক্ষা ও ছবি তোলার সময়ও নেই তেমন প্রচার প্রচারনা। জরিপ তালিকাভ’ক্তকে ফোন করে ডেকে এনে তাদের ছবি তোলা ও ডাক্তারী পরীক্ষা হচ্ছে। ফলে নতুন অনেকে জানতে পারছে না জরিপের কথা।

প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কর্মরত সংস্থাগুলোর মতে ওয়ার্ডে, গ্রামে, ইউনিয়নে জরিপের পূর্বে এবং ছবি তোলা ও ডাক্তারী পরীক্ষার পূর্বেও যথাযথ গুরুত্বের সাথে মাইকিং করা হলে আরো বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ জরিপের অন্তর্ভূক্ত হতেন।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অনেক আকাঙ্খার ফসল ”প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ কর্মসূচী-২০১৩” পরিপূর্ণ সফলতা না পেলে তাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে যাবে। অথচ ভবিষ্যতে প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়ক ব্যবস্থা সম্বোলিত বাংলাদেশ গঠনে এবং তাদের শিক্ষা, চাকরি, সহায়ক যাতায়াত ব্যবস্থা, স্পেশাল স্কুল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, পূনর্বাসন কেন্দ্র, রিসার্চ সেন্টার ইত্যাদি সুপরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে এই জরিপ সরকারের সহায়ক হবে।

 

ত্রুটিপূর্ন জরিপের ফলে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার সুরক্ষা অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। গত ৩রা অক্টোবর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ভিত্তিক যে আইন পাশ হয়েছে তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হলে এই জরিপ অবশ্যই পরিপূর্ন সফল হওয়া দরকার নতুবা এই আইন পাশের কোনই মূল্য থাকবে না। এবং আইনের সুষ্ঠ বাস্তবায়নও দরকার। এদিকে বর্তমানে যেভাবে জরিপ কার্যক্রম এগুচ্ছে তার ফলাফল দাঁড়াবে ৬/৭ শতাংশ প্রতিবন্ধী মানুষ। যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিশ্বব্যংকের পরিসংখ্যানের সাথে সামঞ্জস্যতা পাবে না। ২০১১ সালে তাদের পরিসংখ্যান মতে দেশে ১৫ শতাংশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন।

একারণেই নিজস্ব জরিপ সফল হওয়া অত্যন্ত জরুরী কারণ প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ সম্ভব হলে দেখা যাবে এই সংখ্যা ভয়ংকর পরিমাণে বেড়ে গেছে। তখন সরকার বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় কিছু করার তাগিদ অনুভব করবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যাগত, প্রকারগত এবং পূর্ণাঙ্গ বিবরণ জানা গেলে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার প্রতিবন্ধিতার ধরণ অনুযায়ী তাদের জন্যে রাষ্ট্রের কি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত সেটাও নিরুপণ সহজভাবেই সম্ভব হবে।

 

বর্তমানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দেশের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ড থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোন কাজ করলে তাকে কাজের ভারটা বেশি দেয়া হচ্ছে। তার ভ’ল ত্রুটিগুলো অন্যদের তুলনায় বেশি ধরা হচ্ছে। তার উপর মানসিকভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তার পরেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি একজন অপ্রতিবন্ধী মানুষের চেয়ে কাজে বেশি সফলতা দেখাচ্ছে। তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূল স্রোতধারায় নিয়ে এলে তারা সামাজিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহন করে দেশের মূল জনশক্তিতেও অবদান রাখার সুযোগ পাবে।