শারীরিক বাধা ডিঙিয়ে সেরা সংগঠক হলেন ফয়সাল

12

 

মানসুরা হোসাইন

শারীরিক প্রতিবন্ধী তিনি। এই সীমাবদ্ধতা আটকাতে পারেনি তাঁর উন্নয়নের স্বপ্ন ও তা বাস্তবায়নের দুরন্ত ইচ্ছাকে। হুইলচেয়ারে বসেই তিনি শারীরিক বাধা ডিঙিয়ে পৌঁছে গেছেন সাফল্যের শিখরে। স্বীকৃতিস্বরূপ শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে। তিনি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা ঝালকাঠির নির্বাহী পরিচালক ফয়সাল রহমান।

 

গত ১ নভেম্বর ২০১৩, শুক্রবার জাতীয় যুব দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ফয়সাল রহমানের হাতে শ্রেষ্ঠ সংগঠক হিসেবে একটি ক্রেস্ট, ৫০ হাজার টাকার চেক ও সনদ তুলে দেন। প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে তিনিই প্রথম এ পুরস্কার পেলেন।

২০০২ সাল থেকে সংস্থাটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি যুব সমাজের উন্নয়নের দিকে খেয়াল রেখে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, মত্স্য, হাঁস-মুরগি, পশুপালন প্রশিক্ষণ, সেলাই প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ পরিচালনার পাশাপাশি যুবদের মধ্যে ক্ষুদ্রঋণ, আত্মকর্মসংস্থান, আয়বর্ধক কর্মসূচি পরিচালনা করেছে।

এসব কাজের জন্য সংস্থাটি ২০১১ সালে জেলায় শ্রেষ্ঠ সমাজসেবা সংগঠন হিসেবে মনোনীত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় সংস্থাটি এবার জাতীয় যুব পুরস্কারের জন্য প্রথম স্থান অধিকার করেছে। দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থার অর্থায়নে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি।

ফয়সাল রহমান প্রথম আলো ডটকমকে বলেন, এ পুরস্কার পাওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। তবে পুরস্কার পাওয়ার পর থেমে গেলে চলবে না। নতুন উদ্যমে কাজ করে বহুদূর যেতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশাপাশি দেশের নারী, শিশু ও যুবদের উন্নয়নে কাজ করতে হবে।

ফয়সাল সংগঠনের (অবৈতনিক) নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ঝালকাঠি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতাও করছেন।  চাকরি পেতেও অনেক ধকল পোহাতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০০৪ সালের ৩ জুন নিয়োগপত্র হাতে পান ফয়সাল। কিন্তু যোগ দিতে দেওয়া হয়নি। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে স্কুলে যোগ দেওয়ার অনুমতি পান। ২০০৬ সালে তিনি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। এরপর বদলি হয়ে ঝালকাঠি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে যান।

 

ঝালকাঠি সদর উপজেলার আগলপাশা গ্রামের আবদুল লতিফ বাকলাইয়ের ছেলে ফয়সাল। বাবা- মা বেঁচে নেই। ১৯৮৭ সালের ২৩ এপ্রিল এক দুর্ঘটনায় তিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। খুলনার পিপলস মাধ্যমিক স্কুল থেকে সাইকেল নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন ফয়সাল। রেললাইন পার হওয়ার সময় ঘটে এ দুর্ঘটনা। চিকিৎসা নিলেও তাঁর শরীরের নিচের অংশ অবশ হয়ে যায়।

এ ঘটনার পর ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকা, কারও সঙ্গে কথা না বলা, এমনকি মৃত্যুচিন্তাও ছিল ফয়সালের নিত্যসঙ্গী। তবে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কাজী এমদাদুল হক নামের একজন শিক্ষকের কাছে কৃতজ্ঞ ফয়সাল। এই শিক্ষক তাঁর জীবনে নতুন করে আশার আলো জ্বালেন। পড়াশোনায় নতুন করে মনোনিবেশ করেন।

খুলনার পিপলস মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করেন ফয়সাল। শারীরিক সমস্যার কারণে খুলনা বিএল কলেজে ভর্তি হতে না পেরে হাজী মুহম্মদ মুহসীন কলেজে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি ও দ্বিতীয় বিভাগে স্নাতক পাস করেন। ১৯৯৮ সালে দ্বিতীয় শ্রেণীতে স্নাতকোত্তর পাস করেন। পড়াশোনার খরচ জোগাতে ১৯৯১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত খুলনার খালিশপুরে বই ও পত্রিকা বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে।

 

শিক্ষাজীবন শেষ করে ফয়সাল যখন জীবনের হাল ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন মা চলে যান না-ফেরার দেশে। ফের অন্ধকার হয়ে গেল জীবনটা। এ সময় তাঁকে নতুন পথ দেখাতে এগিয়ে আসেন দি হাঙ্গার প্রজেক্টের উজ্জীবক কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের সাবেক মুখ্য বার্তা সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সরকার। ২০০৩ সালে ফয়সাল অংশ নেন হাঙ্গার প্রজেক্টের চার দিনের উজ্জীবক প্রশিক্ষণে। একজন ‘উজ্জীবক’ হিসেবে সমাজ গড়ার কাজে লেগে যান। গড়ে তোলেন নিজের সংগঠন ‘প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা’।

১২০ শতাংশ জমিতে নেওয়া হয় মৎস্য, পোলট্রি ও নার্সারি প্রকল্প। প্রকল্পভুক্ত করা হয় আরও ৬০ শতাংশ জমি। তাঁকে দেখে এলাকার অনেক মানুষ মৎস্য চাষ, গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন শুরু করে লাভবান হয়। এলাকার বাল্যবিয়ে ও যৌতুকবিরোধী আন্দোলন, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা উন্নীতকরণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সার্বিক উন্নয়ন, শিশুশ্রম নিরসন প্রভৃতি কাজে নেতৃত্ব দেন ফয়সাল। ফয়সাল ফেডারেশন অব এনজিও, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম ও চাইল্ড সাইট নেটওয়ার্কের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য।

ছবি ও সংবাদ কৃতজ্ঞতাঃ দৈনিক প্রথম আলো।

প্রকাশকাল – ১ নভেম্বর, ২০১৩।