শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে জয় করা শিল্পপতি নাসির-উর-রহমান সিন্হা।

23

তিনি শুধু একজন শিল্পপতিই নন, সমাজের কর্ণধারও বটে। অসাধারণ কৃতিত্বের সাথে সামাজিক এবং পারিপার্শ্বিক সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে যিনি আজ দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আলোচিত শিল্পপতি। দেশ ও সমাজের প্রতি তাঁর দেশাত্ববোধ, দায়িত্ববোধ, মমত্ববোধ, কর্তব্যনিষ্ঠা, দৃঢ় মনোবল ও ঐকান্তিক পরিশ্রম আজ তাকে এই সাফল্যের স্বর্ণশিখরে নিয়ে এসেছে। সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী করতে বাস্তবধর্মী প্রতিষ্ঠান এসএফডি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এছাড়াও সিন্হা প্রপারটিজ লিমিটেড, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিন্হা সিকিউরিটি লিমিটেড, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিজনেজ অটোমেশন এবং প্রোপ্রাইটার: বুস্ট ইনডাসট্রিয়াল এন্ড রেসিডেন্টিয়ার ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের শীর্ষপদে আসীন। বাংলাদেশের অসংখ্যা প্রতিবন্ধী মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে এমন অনন্য সাধারণ ব্যক্তির জীবনী অপরাজেয় এর পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এ অনুপ্রেরণা কেবল প্রতিবন্ধী মানুষের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবেনা, বরং সমাজের অসংখ্য বিত্তবানদের মধ্যে সমাজ, দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ জাগ্রত হবে।

 

সিন্হা পরিবার: ২৬মে ১৯৩৯ খ্রীস্টাব্দে এবং ১৩৪৬ সালের ১১ই জ্যৈষ্ঠ বিক্রমপুর (বর্তমানে মুন্সিগঞ্জ) জেলার কলমা ইউনিয়নের ডহুরি গ্রামে এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জš§গ্রহণ করেন জনাব নাসির-উর-রহমান সিন্হা। পিতা হামিদুর রহমান সিন্হা এবং মাতা নূরজাহান সিন্হা।

একদিনের ঘটনা, ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বেগম নূরজাহান অন্যান্য দিনের মত সিঁড়ি দিয়ে ধীরগতিতেই নামছিলেন। হঠাৎ পা পিছলে সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ফলে অকালেই জন্ম হয় নাসির-উর-রহমান সিন্হার। চমৎকার অবয়বে জন্মগ্রহণ করা শিশুটি দেখে কেউ ধারণাই করতে পারেন নি তিনি কোন সীমাবদ্ধতা নিয়ে সুন্দর এ পৃথিবীতে এসেছেন। শিশুরা সাধারণত ৬-৭ মাস বয়স থেকেই হামাগুড়ি দেয়, জোর করে উঠতে চায়, পড়ে যায় আবার উঠে কিন্তু সিন্হার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছে দেখে পরিবারের সবাই ঘাবড়ে যান। চলাফেরার ক্ষমতা ছিল না, ইচ্ছাশক্তি থাকলেও বহিঃপ্রকাশ ছিল না। ডাক্তার বদ্যি ছুটোছুটি করে জানা গেল, অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেয়াতে ‘সেরিব্রাল পালসি’ (সিপি) তে আক্রান্ত তিনি।

পরিবারের সবার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো যেন। শারীরিক এই সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই জীবন কাটাতে হবে এটি মেনে নেয়া কিছুটা কষ্টের ছিল বৈকি! যা হোক, মা এবং নানুর তত্বাবধানে এবং পরিবারের সকলের আদর আহা­দে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছেন সিন্হা। আধো আধো বুলিতে কথা ফুটলেও, ৫ বছর বয়সে মোটামুটি হাঁটতে শিখে ফেলেন। যদিও ঘন ঘন পড়ে যেতেন। স্নায়ু সমস্যার ফলে শরীর কাঁপতো। ডান অংশ অবশ। এ অবস্থায় দেখা দিল নানা জটিলতা। নিজের হাতে খাবার খেতে পারতেন না। মা, নানুই খাইয়ে দিতেন। কখনো ডান হাত দিয়ে খাওয়ার সময় অনেক ভাত তরকারি পড়ে যেত। ‘এত বড় ছেলে কিভাবে এখনো শিখলো না!’ প্রায়শ ইত্যাকার কটুক্তি শুনে নিজেকে অপরাধী মনে হত। আত্নসম্মানে বাধলো প্রবলভাবে। তাই শুরু করলেন বাম হাত দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা। আবারও বাধার সম্মুখীন হলেন। ‘বাম হাতে আবার মানুষ খায়!’ কিন্তু তিনি কারো কথায় দমলেন না। মনে প্রবল জেদ, আত্ননির্ভশীল হতেই হবে। বাম হাতে খাওয়া, নানান কাজ রপ্ত করার সুবাদে বর্তমানে তিনি উভয় হাতেই সমান দক্ষতায় কাজে পারদর্শী।

 

স্কুল ও ছাত্র জীবন: শারীরিক প্রতিবন্ধিতার দরুণ স্থানীয় কোনো স্কুলই তাকে ভর্তি করতে চায়নি। তখনকার দিনে প্রতিবন্ধী মানুষদের আলাদা স্কুল ছিল না। ছয় বছর বয়সে কয়েক দফায় স্কুলে ভর্তির ব্যর্থতা বাবা মায়ের আশা ও ইচ্ছাশক্তি ভেঙ্গে পড়তো প্রায়ই। কিন্তু পুত্রের আকাক্সক্ষাকে বিনষ্ট করতে চান নি বাবা মা। তাই আবারও সর্বশক্তি নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেছেন। বহু কষ্টে নানান প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে দশম শ্রেণী থেকে নির্বাচনি পরীক্ষা পাশ করে ম্যাট্রিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেন। শ্রতিলেখক সহায়তায় ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি পেতেও বেশ ঝক্কি পোহাতে হয়েছিল। ইন্টারভিউ বোর্ড থেকে বলা হয়, ‘প্রতিবন্ধীদের আবার কিসের শিক্ষা, এরা করবে ভিক্ষা। এই ধরনের ছেলেরা সামাজিক পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে পারবে না।’ সবার বিরোধিতার মাঝে কেবলমাত্র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বি এ খান তাঁর পক্ষে এগিয়ে এলেন। তিনি সিন্হার অদম্য ইচ্ছা ও মনের জোর দেখে পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের অনুমতি দেন। অবশেষে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় হায়ার সেকেন্ড ডিভিশনে পাশ করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন জগন্নাথ কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হতে গিয়ে আবারও বাধার সম্মুখীন। সেই একি ঘটনা! একি কটুক্তি! বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রত্যাখ্যান করলেন এই বলে, ‘প্রতিবন্ধীরা সমাজের বোঝা।’ শ্রতিলেখক সাহায্যে পরীক্ষা দেয়ার অনুমতি দেওয়া হয় নি তাকে। পরে সিলেটের এমসি কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন। তবে সেখানেও কপিরাইটারের সাহায্য নিতে পারেন নি ফলে পরীক্ষা ভালো হয় নি। তৃতীয় বিভাগে পাশ করার পরে একই কলেজ থেকে বিএ পাসও করেন। স্নাতক ডিগ্রি লাভের আশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আগ্রহ ছিল তীব্র। কিন্তু আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে বাধার সম্মুখীন হন। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা যেন তার অযোগ্যতার মাপকাঠি। প্রতি পদে পদে কেবলই বাধা। যত বেশি বাধা ততই প্রবল হয় জেদের মাত্রা।

 

জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক ছিলেন তাঁদের পরিবারের আত্নীয়। তিনি যখন জানলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেন নি, নিজ উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এমএ তে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। এরপরে আশাতীতভাবেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সহযোগিতা পেয়েছেন তিনি। ১৯৬৫ সালে মাস্টার্স পরীক্ষার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে ডাক্তারের ভুল অপারেশনে স্নেহময়ী মা মারা যান। শোকার্ত পুত্র এরপরও পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করেন এবং কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

 

কর্মজীবন এবং এক্মির দায়িত্ব গ্রহণ:  সিন্হা যদিও উত্তরাধিকার হিসেবে শিল্পপতি হয়েছেন কিন্তু তখন বাবার প্রতিষ্ঠান এতটা বৃহদাকারে ছিল না। সাফল্যের এই শিখরে উঠে আসার জন্য তিনিসহ তার ভাইদের কর্মদক্ষতা ও আন্তরিকতাই মূল কারণ। বড় ভাই হিসেবে তিনি যথেষ্ট সম্মান ও সহযোগিতা পেয়েছেন ছোট ভাইদের কাছে। যখন যে কাজ ধরেছেন তা নিজের কাজ মনে করে সম্পন্ন করেছেন। কেউ তার কাজে বাধা দেননি বরং আরও উৎসাহ ও উদ্দীপনা পেয়েছেন পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে।

ধনাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও কোন কাজকেই কখনো ছোট মনে করেন নি। শ্রমের মর্যাদা বলতে তিনি বুঝেন তা নিখুঁত এবং সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়া। পেশা হিসেবে কোন কাজই ছোট নয়। সৎভাবে উপার্জিত অর্থের বরকত অনেক বেশি। নিজ হাতে শ্রমিকের মত তাদের সাথেই কাজ করেছেন। যার জন্য শ্রমিকেরাও কাজে প্রেরণা পেয়েছেন। ঔষধ শিল্পে অর্থাৎ যখন এক্মি শুরু করেন তখন বোতল ধোঁয়া থেকে শুরু করে ঔষধ ভরা, লেভেল লাগানো সবই করেছেন তিনি। এতে সম্মান নষ্ট হচ্ছে এমনটা কখনো মনে হয় নি; বরং শ্রমিক কর্মচারীদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস যিনি যে পেশায়ই নিয়োজিত থাকুন না কেন, তাকে ভাল না বাসলে এবং পরিশ্রম না করলে কখনোই সফলতা আসবে না।

 

নাসিউর রহমানের বাবার পরিকল্পনা ছিল ছেলেরা নিজেদের মতো করে তাদের তৈরি করবেন। তার যখন প্রয়োজন হবে তখন তিনি ছেলেদের ডাকবেন। ১৯৬৭ সালে একমি ল্যাবরেটরিতে ডিরেক্টর হিসেবে যোগদান করেন সিন্হা। সে সময় বাবা ছিলেন চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বর্তমানে একমি দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। কেবল ওষুধ নয়, অনেক বিস্তুৃত  হয়েছে ব্যবসা ক্ষেত্র। গার্মেন্টস শিল্প আছে, প্রিন্টিং প্রেস আছে। এগ্রো বেজড শিল্পকারখানা আছে। এভিয়েশন আছে। সব ভাইয়েরা মিলে সামলাচ্ছেন এসব। তার দায়িত্বে রয়েছে এগ্রো বেজড শিল্প প্রতিষ্ঠান, কল্যাণপুরে কর্পোরেট অফিস, এক্মিসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে দি এক্মি ল্যাবরেটরী লিমিটেড চেয়ারম্যান পদ ছাড়াও নিম্নে বর্ণিত সংস্থাসমূহের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন তিনি। চেয়ারম্যান, স্যালভেশন ফর দি ডিজারভিং। চেয়ারম্যান, সিন্হা প্রপারটিজ লিমিটেড। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিন্হা সিকিউরিটি লিমিটেড। ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিসনেজ অটোমেশন। এবং  প্রোপ্রাইটোরঃ বুস্ট ইনডাসট্রিয়াল এন্ড রেসিডেন্টিয়ার।

 

দাম্পত্য জীবন: এহেন শারীরিক অবস্থায় সিন্হা কিছুতেই দাম্পত্য জীবনের প্রতি আগ্রহী ছিলেন না। আত্নীয় স্বজনের পীড়াপিড়িতে তিনি জানালেন ভবিষ্যৎ বংশধর একি রোগে আক্রান্ত হোক তা তিনি চান না। মামা ডা. মির্জা আলম চৌধুরী তার সকল শারীরিক পরীক্ষা করে জানান ভয়ের কিছু নেই। তৎকালীন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ডা. এম এ খালেক তদানীন্তন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সুপারিনটেন্ডেন্ট ডাক্তারে কাছে পাঠালে তিনিও নানান পরীক্ষা নিরীক্ষা করেন। রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে পরবর্তী জেনারেশনে এই রোগের কোন প্রভাব পড়বে না। তারপরে তিনি আশ্বস্ত হয়ে বিয়েতে মত দেন। ১৯৬৯ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর মানিকগঞ্জ চারিগ্রামের বনেদি খান পরিবারের মরহুম আনিসুর রহমান খান ও মাতা  মরহুমা সাবাদা খানমের কন্যা পারভীন আক্তারের সাথে বাংলা মটরস্থ হোটেল ডাফোডিল- এ সিন্হার বিবাহ সম্পন্ন হয়। সুখী দাম্পত্য জীবনে তিনি চার ছেলে সন্তানের জনক।

 

বিদেশ ভ্রমণ: ব্যবসার সুবাদে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, সোভিয়েত রাশিয়া, ভারত, গ্রীস, সিঙ্গাপুর, হং কং, থাইল্যান্ড এবং নেপাল অনেক দেশ ঘুরেছেন তিনি। প্রত্যেকটি স্থানে সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি রাষ্ট্র তথা সমাজের সম্মানবোধ তাকে মুগ্ধ করে। ১৯৮০ সালে সর্ব প্রথম বিদেশ সফরের আগ পর্যন্ত তার কল্পনারও বাইরে ছিল বাংলাদেশের বাইরে প্রতিবন্ধী মানুষেরা এতটা কদর পান! সরকারি বেসরকারি নানা উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্ত সহায়ক ব্যবস্থার সাহায্য সেখানকার প্রতিবন্ধী মানুষকে অপ্রতিবন্ধী মানুষের মতই জীবন যাপন করতে দেখে তিনি বিস্মিত-অভিভ’ত। সেই থেকে কেবলই তার মনে হয় কবে, কোনদিন এরূপ ব্যবস্থা নিজ দেশেও বাস্তবায়ন হবে। এদেশের প্রতিবন্ধী মানুষেরাও নিজেদের সম্মানজনক স্থানে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন। সে আশায় বুক বেঁধে স্বপ্ন দেখতে থাকেন নাসির-উর।

 

প্রতিবন্ধী মানুষদের উন্নয়নে এস.এফ.ডি প্রতিষ্ঠা: প্রতিবন্ধী মানুষ এবং দুঃস্থ ও অসহায়দের জন্য এমন একটা প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন দেখতে থাকেন যেন প্রতিবন্ধী মানুষ অন্যের করুণা ব্যতীত, স্বাবলম্বী হয়ে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পায়। প্রতিবন্ধী মানুষকে আত্ননির্ভরশীল করে তুলতে এবং সমাজের দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে, নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে জনাব নাসির-উর-রহমান সিন্হা সিংগাইর উপজেলাধীন ভূমদক্ষিণ গ্রামে ‘স্যালভেশন ফর দি ডিজার্ভিং’ প্রতিষ্ঠা করেন ২০০৩ সালে। মূল উদ্দেশ্য, দারিদ্র্য বিমোচন ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও পূণর্বাসন।

ঐকান্তিক মানসিক দৃঢ়তাই তাকে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়তে সহযোগিতা করেছে। স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে পারছেন বলে সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, যেহেতু দেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক গ্রামে বসবাস করে সুতরাং দেশের যে কোন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত গ্রাম। তিনি এস.এফ.ডি কে সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন। সরেজমিন পরিদর্শন করে এখানকার বর্তমান কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত হতে পারেন যে কেউ।

সিন্হার সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় ৫ একর জমির উপর গড়ে উঠা এস.এফ.ডি পল্লীতে বর্তমানে ২০ জন প্রতিবন্ধী শিশু সহ মোট ১০০ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন। যাদের শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, আবাসন, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সবকিছুই সংগঠন থেকে বিনামূল্যে প্রদান করা হয়। এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে একক আর্থিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানটিতে নিজস্ব আয় দ্বারা পরিচালিত হবার লক্ষ্যে বিভিন্ন আয় ভিত্তিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। মাসিক পত্রিকা “প্রতিবন্ধী”, কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠান- যেখানে বাঁশ/বেতের কাজ করা হয় এবং এ্যামব্রয়ডারি সেকশন যেখানে তৈরি পোষাক প্রস্তুত করা হয় এবং ৫০০০ বর্গফুটের একটি বেকারী তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা শিক্ষা ও কারিগরী জ্ঞান অর্জনের পর এখানেই তাদের কর্মজীবন শুরু করতে পারে এমন উদ্দেশ্যেই পরিচালিত হচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে যেহেতু একজন কোন কোন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি একা কাজ করতে পারেন না। সেহেতু এইসব প্রতিষ্ঠানে ৫% প্রতিবন্ধী এবং ৯৫% স্থানীয় অপ্রতিবন্ধী দরিদ্র লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

 

বর্তমানে ৭টি টিনের ঘরে হাসপাতাল, স্কুল,কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার এবং কুটির ও হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ এবং একটি বেকারী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এস.এফ.ডি এগ্রো-ফুডস এন্ড কমোডিটিস এরই অংশ এই বেকারীতে বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট, ড্রাই কেক, কেক, রুটি, বনরুটি ইত্যাদি খাদ্যসামগ্রী উৎপন্ন হচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের জন্য এই বেকারী থেকেই নাস্তা এবং অন্যান্য খাওয়ার সামগ্রী ক্রয় করা হয়।

অপর পরিকল্পিত বেকারী ভবনটি হবে ৫ তলা বিশিষ্ট এবং এর প্রতি তলার আয়তন ৫৩৭০ বর্গফুট। এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে এবং উন্নত যন্ত্রপাতি বসানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়াও ৭টি টিনের ঘরে হাসপাতাল, স্কুল, কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার এবং কুটির ও হস্তশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কাজ চলছে। বর্তমানে ৫টি ভবনের নির্মাণ কাজের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন হয়েছে। যা নিম্নরূপঃ

১. হাসপাতাল ভবন ৪ তলা বিশিষ্ট ৫৫০০ বর্গফুট।

২. প্রশাসনিক ভবন-৫ তলা বিশিষ্ট ৫৩৭০ বর্গফুট।

৩. স্কুল ভবন- ৫ তলা বিশিষ্ট ২৫০০ বর্গফুট।

৪. মসজিদ ২ তলা বিশিষ্ট ২০০০ বর্গফুট।

৫. বেকারী ৫ তলা বিশিষ্ট ৫০০০ বর্গফুট।