তথ্য প্রযুক্তিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা ও বাধাসমূহ

এ এস এম আশিকুর রহমান অমিত

 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বলতে আমরা বুঝি, যে প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা তথ্য পাই কিংবা যার দ্বারা আমরা যোগাযোগ করতে পারি। আর এই কাজগুলো আমরা করি কম্পিউটার, মোবাইল/টেলিফোন, ইন্টারনেট, ফ্যাক্স, টেলিভিশন, রেডিও  প্রভৃতি যন্ত্রের সাহায্যে। এসব ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা যেমন আমাদের প্রিয় মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে পারি তেমনি আবার পারি তথ্য সংগ্রহ করতেও।

আর এই কাজগুলো সঠিকভাবে করতে চাওয়ার পরেও যখন আমরা পারি না, বলা যায় তখনই আমরা প্রবেশগম্যতায় বাধার সম্মুখীন হই। অর্থাৎ সহজে সেই কাজটি স¤পন্ন করার প্রবেশাধিকার আমরা পাইনি।

 

প্রথমেই জানার চেষ্টা করি,এক্সেসিবিলিটি বা প্রবেশগম্যতা ব্যাপারটা আসলে কি? প্রবেশগম্যতা হল কোনও একটি পণ্য অথবা সেবার সকল মানুষের ভিন্ন ভিন্ন সামর্থ্যের কথা মাথায় রেখে ব্যবহার উপযোগী করে তৈরী করা। একজন ব্যক্তির সাময়িক বা দীর্ঘ মেয়াদী কিংবা পরিবেশগত প্রতিবন্ধিতা  থাকা স্বত্বেও তার যতটুকু সক্ষমতা আছে তা দিয়ে সে যেন ঐ পণ্য কিংবা ঐ সেবা থেকে প্রয়োজনীয় সুবিধা নিতে পারে। আর প্রযুক্তি যদি মানুষের এই ভিন্ন ভিন্ন সামর্থ্যের কথা মাথায় না রেখে প্রবেশাধিকার নিশ্চিতে ব্যর্থ হয় তখনই আমরা বাধার সম্মুখীন হই। যেমন- কোন ওয়েবসাইট এর রঙ ধূসর আর লেখার রঙ কালো হয়, তবে লেখা দেখতে স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির খুব কষ্ট হবে। আবার যদি বাটন গুলোর অবস্থান খুব কাছাকাছি হয় তবে বাটন গুলোকে চিহ্নিত করতে স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মুশকিলে পড়তে হয়। অথচ খুব সহজেই এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়।

এই ধরণের প্রবেশগম্যতা  নিশ্চিত না করার ফলে একদিকে যেমন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্য দিকে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু তাই নয় যারা শিখন প্রতিবন্ধী অথবা দুর্ঘটনার দরুন সাময়িক ভাবে হাত নাড়তে পারে না কিংবা দেখতে পায় না। এমন কি যারা প্রযুক্তিগত ভাবে দক্ষ নয় অথবা বয়স্ক ব্যক্তি তারাও বিভিন্ন সময় বাধার সম্মুখীন হন। অথচ বিশ্বব্যাপী প্রবেশগম্যতার যে কয়েকটি গাইড লাইন আছে তাতে সুনির্দিষ্ট ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রযুক্তি সহজ ব্যবহারের মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী যেন তার কাঙ্খিত ফলাফল পেতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। এবং বাটনগুলো সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। এছাড়াও ভিন্নমাত্রার সামর্থ্যবান মানুষেরা যেন খুব সহজে এই প্রযুক্তি চালনার নির্দেশনা বুঝে সেটি ব্যবহারের মাধ্যমে ফলাফল পেতে পারেন তাও নিশ্চিত করতে হবে। কোন ব্যক্তি যদি প্রযুক্তির বর্তমান সেবাগুলো পেতে ব্যর্থ হন, তার জন্য যেন বিকল্প সেবার ব্যবস্থা থাকে।

 

যেমন ধরা যাক, একটি ওয়েবসাইটে কৃষি বিষয়ক কিছু তথ্য আছে। একজন লেখাপড়া না জানা  মানুষ চাচ্ছেন তা থেকে তথ্য পেতে। যদি ঐ ওয়েবসাইট এ অডিওর কোন ব্যবস্থা না থাকে তাহলে তবে ঐ মানুষটি কি সেই তথ্য পেতে পারবে? আবার যদি ওয়েবসাইটটি ভিন্ন ভাষায় হয় তবে কি তার পক্ষে সেই তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হবে? সেই ওয়েবসাইটটিতে টেক্সট এর পাশাপাশি অডিও থাকে তাহলে সেই ব্যক্তিটি খুব সহজেই সেই তথ্যটি পেতে পারবেন। শুধু সেই ব্যক্তিই নয় একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও সেই তথ্যটি পেতে পারবে। অর্থাৎ আমরা বুঝতে পারবো এই ওয়েবসাইটটি তৈরী হয়েছে প্রবেশগম্যতা অর্থাৎ প্রতিবন্ধী মানুষের সহায়ক ব্যবহার নিশ্চিতের বিষয়টি মাথায় রেখে।

 

একটি প্রযুক্তির প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন ব্যবহারকারী উপকৃত হবেন। অন্য দিকে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান, যারা এই সেবাটিকে জনগণের কাছে পৌছে দেন তারাও ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হবেন। সর্বোপরি সমাজ উপকৃত হবে। যেমন- একজন ব্যবহারকারী যদি খুব সহজে ও স্বাধীনভাবে প্রযুক্তিটি ব্যবহার করতে পারে তবে তিনি কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারবেন। এতে দেশের মানুষের কাছে চাহিদা বাড়বে এবং বিদেশে রপ্তানির সুযোগও তৈরী হবে। ফলে প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান একদিকে যেমন আর্থিক ভাবে লাভবান হবে, অন্যদিকে সেই সঙ্গে লাভবান হবে যারা সেই সেবাটি জনগণের কাছে পৌছে দিবে। দেশে কর্মদক্ষ লোকের পরিমান বাড়বে, তেমনি বেকারত্বের সংখ্যাও কমবে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা সুসংহত হবে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে যেসব জায়গায় প্রবেশগম্যতা খুব বেশি দরকার তা নিুরূপ-

  •   সরকারী ও বেসরকারী ওয়েবসাইট গুলোকে প্রবেশগম্য করা। যেন এই ওয়েবসাইট গুলোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ তথ্য পায়।
  •   যেখানে মানুষের চলাচল বেশি, যেমন এটিএম বুথ। এগুলোতে টকিং সিস্টেম না থাকার কারণে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধী      জনগোষ্ঠীর পক্ষে টাকা উত্তোলন খুবই কষ্টকর।
  •   সরকারী এবং বেসরকারী ভাবে তৈরী হওয়া বিভিন্ন  এ্যাপ্লিকেশেন সফটওয়্যার।
  •   মোবাইল অপারেটরদের বিভিন্ন সেবা।
  •   আর এসব কিছুই সম্ভব হবে যখন আমাদের দেশে একটি আইসিটি ইউনিভার্সাল ডিজাইন গাইড লাইন থাকবে এবং সরকারের সকল আইন ও পলিসিতে তার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকবে।

উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত হলেই আমাদের দেশের তথ্য ও প্রযুক্তি সব ধরণের মানুষের ভিন্নতার কথা মাথায় রেখে গড়ে উঠবে এবং সকলের প্রবেশগম্যতা  নিশ্চিত হবে।

 

 

লেখক পরিচিতঃ উপদেষ্টা -এক্সেসেবল সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট (রিসার্চ এ্যন্ড ডেভেলপমেন্ট), টিম ইঞ্জিন লিমিটেড, ট্রেজারার, বাংলাদেশ ভিজ্যুয়েলি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি – ভিপস।