প্রতিবন্ধী বাচ্চাদের ক্ষেত্রে আরো বেশি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে

86

প্রতিবন্ধী সন্তানদের নিয়ে তাদের বাবা-মা, পরিবারের ভাবনা তথা সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের  প্রতি দায়িত্বশীলতার নানান পর্যালোচনা নিয়েই সাজানো হয়েছে অভিভাবকের সাথে কথোপকথন বিভাগটি। প্রতিবন্ধী সন্তানকে মানুষের মত মানুষ করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সমাজের সর্বস্তরে সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা বা তিক্ত অভিজ্ঞতা ও সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে অভিভাবকবৃন্দের সাথে অপরাজেয়’র এই বিশেষ আয়োজন নিয়মিতই ছাপা হবে।

 

এবারের প্রথম কথোপকথনে আছেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব, জনাব নাছিমা বেগম, এনডিসি

 

অপরাজেয়-সন্তানের প্রতিবন্ধিতার শুরুর দিকের সেই সময় সম্পর্কে কিছু বলুন ?

নাছিমা বেগম – আমার বড় ছেলেটি একজন অটিস্টিক। যেহেতু অটিজম নিয়ে আমাদের তখন তেমন ধারণা ছিল না, তাছাড়া অটিস্টিক বাচ্চাদের ছোটবেলায় শারীরিক ও আচরণগত বৈশিষ্ট্য একেবারে স্বাভাবিক থাকে, এ কারণে আমরা প্রথমে তার প্রতিবন্ধিতার ধরণটি বুঝতে পারিনি। ৫/৬ বছর বয়স হবার যখন বুঝতে পারি, তখন অনেকে তাকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বা মানসিক প্রতিবন্ধী বলে ধারণা করেছিল এবং সেই অনুযায়ী আমরা তাকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী স্কুলে ভর্তি করেছিলাম। এখন আমরা বুঝতে পারি, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিবন্ধিতার ধরণ চিহ্নিত করা গেলে এর মাত্রাটা অনেকাংশে কমানো যায়। যা আমার ছেলের ক্ষেত্রে করা সম্ভব হয়নি।

 

অপরাজেয়- পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আপনার সন্তানকে কিভাবে নিয়েছেন এবং আত্নীয় বা পাড়া প্রতিবেশী থেকে কটুকথা/কুসংস্কার কিভাবে মোকাবিলা করেছেন?

নাছিমা বেগম– এইদিক থেকে আমি বেশ ভাগ্যবান। চাকরি সূত্রে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুকূল পরিবেশ পেয়েছি। সুতরাং গ্রাম-গঞ্জের কুসংস্কারাচ্ছন্ন বিরূপ পরিবেশ বা কটু কথার সম্মুখীন হতে হয়নি আমাকে। বরঞ্চ সন্তান লালন-পালনে পরিবার, শশুর বাড়ী এবং আত্নীয়-স্বজনদের কাছ থেকে দারুণ সহযোগিতা পেয়েছি যা আমার সন্তানের বেড়ে উঠায় সহায়ক হয়েছে। তা না হলে হয়ত আমি আজ এই পর্যায়ে আসতে পারতাম না।

আসলে কুসংস্কার বলতে প্রধানত কোন বিষয় সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব। তাই প্রতিবন্ধিতা সংক্রান্ত বিষয়কে তারা নেতিবাচক ভাবে দেখে। অনেকে না বুঝে প্রতিবন্ধী সন্তানকে পাপ বা কোন অপরাধের ফসল এমনও মনে করে থাকে। তবে আমাকে এই ধরণের কোন মন্তব্য শুনতে হয়নি এখনও।

 

অপরাজেয়- সন্তানের প্রতিবন্ধিতাকে মেনে নিয়ে পরবর্তী কবে থেকে, কি পদক্ষেপ নিলেন ? 

নাছিমা বেগম– কোন মা-বাবাই চায় না তাদের সন্তানের বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হোক। সন্তানের প্রতিবন্ধিতা আছে যখন বুঝতে পেলাম তখন আমি কুমিল্লায় কর্মরত। তাকে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু মনে করে কুমিল্লাস্থ সুইড বাংলাদেশে নিয়ে গেলাম। পরে বুঝতে পারি তার অটিজম আছে। অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে একজন শিশুর জন্য একজন শিক্ষক দরকার হয় যা আমার ছেলের ক্ষেত্রে সে সময় ছিল না।

 

অপরাজেয়-  আপনার অন্য অ-প্রতিবন্ধী সন্তানের আচরণ কেমন তার প্রতিবন্ধী ভাই-এর প্রতি? 

নাছিমা বেগম– আল্লাহ্র রহমতে আমার ছোট ছেলেটি খুবই সচেতন ও কর্তব্যপরায়ণ। সে তার বড় ভাইয়ের প্রতি অত্যন্ত দায়িত্ববান ও যত্নশীল।

 

অপরাজেয়-  আপনার প্রতিবন্ধী সন্তানকে অন্যান্য অপ্রতিবন্ধী সন্তানের মত করে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে প্রত্যয়ী হলেন কিভাবে?

নাছিমা বেগম – এটি আসলেই শুধুমাত্র আমার ক্ষেত্রে নয়, সকল মা-বাবা তার সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত দেখতে চায়। বিশেষত প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকরা চান তার সন্তানটিও মূল ধারার কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত হোক। কিন্তু অটিস্টিক শিশুদের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। এক্ষেত্রে একজন অটিস্টিক শিশুর সাথে অন্যজনের মিল পাওয়া যায় না। প্রত্যেকের ইউনিক পারসোনালিটি। তাই প্রত্যেকের জন্য আলাদা এ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে তার চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে বিভিন্ন ট্রেনিং ও চিকিৎসার মাধ্যমে যতটুকু সম্ভব পরিবার ও সমাজের মাঝে সুন্দর অবস্থান তৈরি করার ব্যবস্থা নিতে হবে।

একজন অভিভাবক হিসেবে আমাকেও এটা মাথায় রাখতে হবে যে, আমার সন্তানের মাঝে সীমাবদ্ধতা আছে। সন্তান কেন এস.এস.সি. পাশ করবে না বা অন্য দশটা ছেলেমেয়ের মত কেন বেড়ে উঠছে না, এমনটা আশা করা উচিৎ নয় কোন অভিভাবকের। বরঞ্চ মনে রাখতে হবে,সন্তানের কতটুকু উন্নতি সাধন হচ্ছে, প্রতিবন্ধিতার মাত্রার পরিমাণ কতটুকু কমছে কিংবা লক্ষ্য রাখতে হবে পূর্বাবস্থার সাথে তার বর্তমান কাজকর্মের ফলাফলের দিকটা।

 

অপরাজেয়- শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে ঘরে-বাইরে কতটা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন? সন্তানের স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ ও সহপাঠির আচরণ সহযোগিতামূলক ছিল কি ? 

নাছিমা বেগম– আমার ছেলে মূলধারার স্কুলে যায়নি, যেহেতু অটিস্টিক শিশুর শিক্ষা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে একীভূত শিক্ষা প্রযোজ্য নয়। তার জন্য দরকার বিশেষায়িত স্কুল। মোটামুটি সবার সহযোগিতাই পেয়েছে সে।

 

অপরাজেয়- অনেক বাবা-মা তার প্রতিবন্ধী সন্তান বিশেষ করে অটিস্টিক বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুর ক্ষেত্রে নিজের কাছে রাখতে চান না, পূনর্বাসন কেন্দ্র বা হোস্টেলের কথা বলেন, এই ব্যাপারে আপনার মতামত কি?

নাছিমা বেগম– বিষয়টি এইভাবে দেখা ঠিক হবে না। আমরা অনেকেই তো অ-প্রতিবন্ধী সন্তানকে হোস্টেলে রেখে পড়াশোনা করিয়ে থাকি। যেমন আমি নিজেও হোস্টেলে পড়াশোনা করেছি। হোস্টেলে বা পূর্ণবাসনে থাকাটা খুব বেশি দোষের নয়। তবে প্রতিবন্ধী শিশুর ক্ষেত্রে বিশেষ করে অটিস্টিক সন্তানদের পারিবারিক পরিবেশটা খুব বেশি দরকার। কিন্তু যেসব শিশুরা হাইপার একটিভ, যারা অনেক সময় অন্য শিশুদের আঘাত করে বা স্বাভাবিক আচরণ করে না, তাদের ক্ষেত্রে অনেক অভিভাবক মনে করেন হয়তো হোস্টেলে রাখলে ভাল সেবা পাবে।

এক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবে মাঝে মাঝে মনে হয় অভিভাবকের অবর্তমানে পূনর্বাসন কেন্দ্রটাই হয়তো প্রতিবন্ধী সন্তানের আসল ঠিকানা হতে পারে। যেমন- আমি মারা গেলে আমার সন্তানকে দেখে রাখার দায়িত্ব কে নেবে! আমার ছোট ছেলেরও তো ব্যক্তিগত জীবন আছে।

 

অপরাজেয়- এদেশের আর্থিক সঙ্কটাপন্ন প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকেরা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বা প্রতিকূলতা কিভাবে মোকাবিলা করছেন বলে আপনি মনে করেন?

নাছিমা বেগম- সন্তান লালন পালনের কষ্টটা সকল সন্তানদের ক্ষেত্রে সমান। তবে প্রতিবন্ধী সন্তানদের ক্ষেত্রে অনেকটা বেশি, কারন তাদের চিকিৎসা খরচ ব্যয়বহুল, কিছু ক্ষেত্রে লেখাপড়াও বেশ ব্যয় সাপেক্ষ। তবে এটা ঠিক যে, আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী সন্তানদের জন্য হোস্টেলের সুবিধা, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা তেমন ভাবে বেড়ে উঠেনি। জাতীয় প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের পরিকল্পনা আছে এমন একটি কমপ্লেক্স নির্মাণের, যেখানে সব ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সকল সুযোগ সুবিধা থাকবে। এছাড়া অদূর ভবিষ্যতে প্রতিবন্ধী শিশুদের মূলধারায় আনার একটি পরিকল্পনাও রয়েছে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রানালয়ের। কিন্তু অভিভাবকেরা প্রতিবন্ধী সন্তানদের এইভাবে হোস্টেলে রেখে বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা আমি পুরোপুরি সমর্থন করি না। ওদের মা-বাবার আদর আরও বেশি দরকার। আমার সন্তানকে যদি আমি ভালবাসতে না পারি, আরেকজন তাকে ভালবাসবে এটা আমার আশা করা ঠিক না।

 

অপরাজেয়- আপনার/আপনাদের অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তান যেন অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে এমন কি কি উপায় ভেবে রেখেছেন?

নাছিমা বেগম– আপনি জানেন, সরকার ট্রাস্ট আইন পাশ করেছেন। যারা গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাদেরকে তাদের সম্পত্তি দেখ-ভাল করার জন্য আমরা গার্উিয়ানশীপ বা অভিভাবকত্ব চালু করার ব্যবস্থা করেছি। প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্য একজন অভিভাবক দরকার এবং থাকতে হবে। যেমন, আমি মারা গেলে আমার পেনশনের টাকায় দুই ছেলে হকদার। আমার বড় ছেলে আজীবন প্রতিবন্ধী পেনশেন পাবে সরকারের কাছ থেকে। কিন্তু তার টাকাগুলো সে নিজে দেখাশোনা কিংবা হিসেব রাখতে পারবে না। তাই হয়তো আমি আমার ছোট ছেলেকে তার বড় ভাইয়ের অভিভাবকত্ব দিয়ে যেতে পারি, যেন আমার অবর্তমানে সে তার ভাইয়ের দেখাশুনা করবে। অভিভাবক চাইলে যে কোন কাউকে অভিভাবকত্ব  দিতে পারবে।

 

অপরাজেয়- এবারের শনাক্তকরণ জরিপ নিয়ে অবহেলা ও বিশেষত দুর্বল প্রচারণার অভিযোগ দেখা যাচ্ছে দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত কিছু সংস্থার কাছ থেকে। প্রচারণা আরো বেশি হলে আরো অনেক বেশি মানুষ তালিকাভুক্ত হতে পারতেন, অনেক গুরুতর মাত্রার প্রতিবন্ধী মানুষ তাদের নিজ নিজ এলাকার ডিএসএস অফিসে ফোন করে, তাগাদা দিয়েও তালিকাভুক্ত হতে পারেন নি। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

নাছিমা বেগম– এ ব্যাপারে আমি আপনার সাথে একমত নই এবং আপনার দেয়া তথ্যও সঠিক নয়। জরিপের ব্যাপারে প্রচুর প্রচার-প্রচারণা করা হয়েছে এবং এটি একটি ধারাবাহিক চলমান প্রক্রিয়া। যদি কেউ বাদ পড়ে থাকে তাহলে পরবর্তীতে তিনি/তারা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক সংগঠন যারা কাজ করছে তাদেরকে এই ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। আপনাদের কাছে যদি কোন তথ্য থাকে যে, কেউ বাদ পড়েছে তাহলে আমাদের জানাবেন। আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

 

অপরাজেয়- আমরা জেনেছি মিনিস্ট্রি অব সোশাল ওয়েলফেয়ার এর ওয়েবসাইট দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সম্পূর্ণ প্রবেশগম্য নয়। পিডিএফ ফাইল, প্রেস রিলিজ ও অন্যান্য ডকুমেন্ট বিজয় দিয়ে লেখার ফলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ ওয়েবসাইটের বাংলা লেখাগুলো পড়তে পারেন না। এটি ডেভেলপের ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে ?

নাছিমা বেগম– আপনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের জন্য ধন্যবাদ। আমি এখনই আমাদের আইসিটি টিমকে নির্দেশ দিয়ে দিচ্ছি যেন অতি সত্ত্বর ওয়েবসাইটটি প্রবেশগম্য করার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন।

 

অপরাজেয়- আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্যে অপরাজেয়র পক্ষ থেকে আপনাকে অসংখ্য  ধন্যবাদ

নাছিমা বেগম– অপরাজেয়কেও ধন্যবাদ। অপরাজেয়’র মাধ্যমে দেশের অটিস্টিক এবং অন্যান্য প্রতিবন্ধী সন্তানদের অভিভাবকেরাও সচেতন হবে বলে আমার বিশ্বাস।