একজন জয়িতার গল্প

22

 

সমাজের নারীগোষ্ঠীকে আত্মশক্তিতে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার মাধ্যমে দেশ গঠনে নারীদের অংশগ্রহণকে আরও জোরদার করার নিমিত্তে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের “জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ” শীর্ষক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ এবং বেগম রোকেয়া দিবস-২০১৩ পালন উপলক্ষে ৫টি ক্যাটাগরির মধ্যে “শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে” জয়িতা নির্বাচিত হন মেহেরপুরের আকলিমা খাতুন। “সম্মাননা পত্র ও ক্রেস্ট” বিজয়ীদের মধ্যে যিনি ছিলেন একমাত্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ের প্রতিটি ধাপেই তিনি পুরস্কৃত হন।

 

আকলিমা খাতুনের আজকের জয়িতা হয়ে উঠার পেছনের গল্পটি মোটেই এতটা চমৎকার নয়। ১৯৮৬ সালের ১২ জুলাই আকলিমার জন্ম। মধ্যবিত্ত পরিবারে ছয় ভাই আর তিন বোনের মধ্যে সে ৫ম। কৃষক ও ব্যবসায়ী বাবা ছেলেদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার সব ব্যবস্থাই করেছিলেন, কিন্তু মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার বিষয়ে ছিলেন উদাসীন। কিন্তু গৃহিণী মা তিন বোনকেই উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে উৎসাহী ছিলেন। মায়ের কঠোর পরিশ্রমের ফলে আকলিমা ২০০২ সালে এসএসসি এবং ২০০৪ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। অতঃপর ২০০৪-২০০৫ শিক্ষাবর্ষে অনার্স কোর্সে ভর্তি এবং নিয়মিত লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া। ভালোই কাটছিল দিনগুলো।

 

৫ই মার্চ ২০০৬, রোববার। দিনের শুরুটা প্রতিদিনের মত সুন্দর হলেও শেষ হয়েছিল একেবারে ভিন্নতায়, যার প্রচণ্ড আকস্মিকতায় বদলে গেল আকলিমার পুরো জীবনটাই। প্রতিদিনের মত সেদিনও কলেজে গিয়েছে। ক্লাস করেছে, ঘুরেছে ফিরেছে। এরপর বাসে করে বাড়ি ফিরছিল। পথিমধ্যে চালকের ভুলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়ি দূর্ঘটনায় পতিত হয়। ঘটনাস্থলেই তিন জন নিহত এবং অনেকেই আহত হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে গাংনীর নুরুজ্জামান ক্লিনিকে এবং সেখান থেকে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয় আকলিমাকে। এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা নিটোল হাসপাতালে। তিন মাস চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরে চার দেয়ালের মাঝে বিছানায় শুয়ে শুয়ে চোখের জল ফেলা আর ভাবতে থাকা, জীবনের সব স্বপ্নের বোধ হয় ইতি টানা হয়ে গেছে। আশা-আকাংক্ষা, সুন্দর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কবর রচনার মত দুঃস্বপ্নের উপর ভর করে তার প্রতিটি রাত কাটতে থাকে। বছর পেরিয়ে গেলেও যখন সুস্থ হয় না আকলিমা, তখন ফের ঢাকায় নিয়ে আসা এবং ডাক্তার মনিরুজ্জামানের পরামর্শে সিআরপিতে ভর্তি হওয়া। ২০০৭ সালের ২৮ই ফেব্রুয়ারী, সিআরপিতে গিয়ে পরিণতির আরেক রূপ দেখে আকলিমা অজস্রধারায় কেঁদেছিল, যেদিন প্রথম বুঝতে পারে জীবনে আর কোনদিনই হাঁটতে পারবে না, স্পর্শ করতে পারবে না নরম দূর্বা ঘাস, শিশির ভেজা সবুজ মাঠ, মায়ের মমতা মেশানো মাটি। দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন যেন এক নিমিষে অন্ধকারে ম্লান হয়ে যায় তার।

 

কিন্তু সিআরপির চিকিৎসা শেষে এক বছর পর বাড়ি ফিরে নতুন এক সংগ্রামী জীবন শুরুর দীপ্ত প্রত্যয় আকলিমার চোখে মুখে। কিন্তু লেখাপড়া পুনরায় শুরু করতে গিয়ে বাবা আর বড় ভাইয়েরা বেঁকে বসলেন। তাদের বক্তব্য, “লেখাপড়া শিখে কি করবে সে?” এ এক মহাসংকট, বাবা আরও একধাপ এগিয়ে বললেন “নিজের যে জমিজমা আছে তা দিয়ে মেয়ের চলে যাবে। বৌমারা রান্না করে দিবে আর সে বসে বসে খাবে!”

 

একটু জেদি আর অপ্রাসঙ্গিক কোন কিছু না মেনে নিতে পারা স্বভাবের আকলিমার ভেতর জেদ চেপে বসে। যে কোন মূল্যে লেখাপড়া শেষ করতেই হবে। বাড়ির বিরোধী তিনজন বাদে অন্য ভাইবোন আর মাকে নিয়ে আলোচনা, লেখাপড়ার প্রতি প্রবল ইচ্ছা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা শুনে সবাই খুশি। বহুদিন পর সবার হাস্যোজ্জ্বল মুখ দেখে আকলিমার বুকটা ভরে গিয়েছিল। সেদিন থেকেই শুরু হল ভিন্ন এক সংগ্রামী জীবন।

 

আর পিছনে ফিরে তাকানো নয়, শুধুই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। যদিও সামনের দিনগুলো পাড়ি দেওয়া ছিল আকলিমার জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। তারপরও কিছু করতে হবে নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, দেশের জন্য, প্রতিবন্ধী ভাইবোনদের জন্য এই অনুপ্রেরণায় কঠোর পরিশ্রমে এগিয়ে যাওয়া। সুদীর্ঘ এই পথ চলায় শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব, পরিবার পরিজনের অনেকেই সাহস ও সহযোগিতা হাত সম্প্রসারিত করেছেন। আবার অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এভাবেই সফলতার এক একটা সিঁড়ি পার হতে লাগল আকলিমা। ২০০৮ সালে সিআরপি থেকে কম্পিউটার কোর্স শেষ করে মেজ ভাইয়ের অনুরোধে কম্পিউটার ও স্টুডিও এর ব্যবসা শুরু। ব্যবসার পাশাপাশি টিউশনি ও হাতে ডিজাইনের কাজ করতে থাকে আকলিমা। একই সাথে পড়াশুনাও চলতে থাকে। ২০১০ সালে প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। বর্তমানে গাংনী উপজেলার বানিয়াপুকুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত আছেন তিনি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধীন খুলনা সরকারী কলেজ থেকে ২০১৩ সালে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ বাংলায় মার্স্টাস করা এই জয়িতা আগামীতে বিসিএস ক্যাডার পরীক্ষা দিয়ে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠা পেতে সকলের দোয়াপ্রার্থী। লক্ষ্য এখানেই স্থির নয় তার। দৃঢ়তা, কর্মদক্ষতা, সৃজনশীলতা ও আন্তরিকতার সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে প্রতিবন্ধী ও সুবিধাবঞ্চিতদের পাশে দাঁড়াতে চান এই কীর্তিমান জয়িতা।