ক্লাবফুট বা মুগুর পা; পরিণাম ও প্রতিকার

23

সাজ্জাদ হোসেন: প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৫০০০ শিশু ক্লাবফুট বা মুগুর পা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। ক্লাবফুট বা মুগুর পা একটি জন্মগত সমস্যা যেখানে নবজাত শিশু জন্মের সময় এক অথবা উভয় পায়ের পাতা ভেতরের দিকে বাঁকা অবস্থায় নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কনজেনিটাল ট্যালিপ্স ইকুইনোভ্যারাস (সংক্ষেপে সিটিইভি)। অজ্ঞতার কারণে বাংলাদেশে বেশিরভাগ মানুষই একে চিকিৎসার অযোগ্য একটি ভাগ্যের পরিহাস বলে মনে করে। ফলে অনেক শিশুরই চিকিৎসা আর হয়ে উঠে না। চিকিৎসার অভাবে এ সমস্যা শিশুটির সারা জীবনের জন্য খারাপ পরিণাম বয়ে আনে। উন্নত বিশ্বের কোন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে মুগুর পা নিয়ে হাঁটতে দেখা যায় না। কারণ তারা শৈশবেই শিশুদের চিকিৎসা করিয়ে ফেলে।

 

আমাদের সমাজে মুগুর পা নিয়ে জন্মানো শিশু কিংবা বয়োপ্রাপ্ত যে কেউই পরিহাস ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হয়। শৈশব থেকেই সমাজে তাদের পৃথকীকরণ শুরু হয় বন্ধুদের সাথে ছুটোছুটি, খেলাধূলা বন্ধের মাধ্যমে। পায়ের ব্যাথার কারণে তারা বেশিক্ষণ হাঁটতে পারে না। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যালয়গুলো দূরে হওয়ায় তাদের আর সেখানে যাওয়া হয় না এবং এভাবে তারা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়। এই শিশুরাই যখন বড় হয়, তখন শিক্ষার অভাবের তারা চাকুরি কিংবা জীবিকা উপার্জনের কোন সম্মানজনক উপায় খুঁজে পায় না। ফলস্বরূপ, সারা জীবনের জন্য তারা পরিবারের বোঝা হয়ে থাকে। আজীবন বিকলাঙ্গতা ও পরনির্ভরশীলতার কারণে দারিদ্র্যতা বা আর্থিক অনটন অবধারিত হয়ে পড়ে। অন্য কোন পেশায় যোগ দিতে না পেরে তারা ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিতে বাধ্য হয় এবং এ কারণে বাংলাদেশের ভিক্ষুকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ক্লাবফুটধারী।

নারীদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর। একটি মেয়ের যত গুণই থাকুক, মুগুর পা তার বিয়ের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আর কোন অপ্রতিবন্ধী মা’ও যদি আমাদের এই কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে ক্লাবফুট শিশুর জন্ম দেন, তাহলে প্রতিনিয়ত তাকে ব্যভিচার কিংবা পরিবারে অভিশাপ নিয়ে আসার জন্য অপবাদ শুনতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে, স্বামী তাকে তালাকও দিয়ে দেয়।

 

মুগুর পা চিকিৎসার বিভিন্ন উপায় রয়েছে। বাংলাদেশে বেশিরভাগ ডাক্তারই সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই সার্জারি স্থায়ী কোন সমাধান আনে না। এতে কয়েক বছর পর পা আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়ার আশংকা থাকে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় “রিল্যাপ্স” বলা হয়। মুগুর পায়ের সবচেয়ে ভালো, নিশ্চিত, সর্বস্বীকৃত, সস্তা ও পুরোপুরি স্থায়ী চিকিৎসা পদ্ধতি হচ্ছে পন্সেটি মেথড। গত শতাব্দীর ৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থোপেডিক ফিজিশিয়ান ডাক্তার ইগ্নাসিও পন্সেটি এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। পরবর্তীতে ডাক্তার জন হের্জেনবার্গ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে এবং যুক্তরাজ্যের পন্সেটি সার্জন ডাক্তার স্টিভ ম্যানিয়ন আফ্রিকায় এই পদ্ধতি বিপুলভাবে প্রচলন করেন। ৯৫% ক্ষেত্রেই পন্সেটি পদ্ধতিতে মুগুর পা-এর চিকিৎসা করা যায় এবং এতে রিল্যাপ্সের কোন ঝুঁকি থাকে না। কিন্তু এ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা হলো এটি শুধুমাত্র ৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এর চেয়ে বেশি বয়সের যে কোন শিশু বা প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য সার্জারিই একমাত্র চিকিৎসা, যেটি কখনোই চিরস্থায়ী নিশ্চয়তা দিতে পারে না।

 

চিত্রঃ পন্সেটি পদ্ধতিতে শিশুর পায়ের পাতা সোজা করার বিভিন্ন ধাপ

 

আন্তর্জাতিক এনজিও “দ্যা গ্লেন্কো ফাউন্ডেশন” ২০০৯ সাল থেকে “ওয়াক ফর লাইফ” প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশে ক্লাবফুট বা মুগুর পা নিয়ে জন্মানো শিশুদের পন্সেটি পদ্ধতির মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে আসছে। অভিজ্ঞ ফিজিওথেরাপিষ্টরা প্রতি সপ্তাহে একবার প্লাস্টারিং-এর মাধ্যমে ৫-৬ সপ্তাহের মধ্যেই শিশুদের মুগুর পা সঠিক অবস্থানে নিয়ে আসেন। এরপর শিশুকে একটি বিশেষ জুতা বা ব্রেস পরতে দেয়া হয়। ব্রেস না পরলে শিশুর পা আবার রিল্যাপ্সের ঝুঁকিতে থেকে যায়। প্রথম মাসে এটি দিনে ২৩ ঘন্টা পরতে হয়। এরপর ব্রেসটি শুধুমাত্র রাতে ঘুমানোর সময় শিশুকে পরাতে হয়।

 

এই পুরো পদ্ধতিটি বাইরের দেশে অনেক ব্যয়বহুল। এর কারণ হচ্ছে বিশেষ জুতা বা ব্রেসগুলোর প্রত্যেকটির দাম ২৫০ থেকে ৪০০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণ শিশুর চাহিদার কথা বিবেচনা করে দ্যা গ্লেন্কো ফাউন্ডেশন দেশীয় কর্মী ও স্থানীয় কাঁচামাল দিয়ে ব্রেস তৈরির জন্য যশোরে একটি কারখানা চালু করেছে। এতে প্রতি ব্রেসে খরচ পড়ে মাত্র ৪-৫ মার্কিন ডলার এবং এই ব্রেসটি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক মানের।

ওয়াক ফর লাইফ প্রকল্প চালু হওয়ার আগে বাংলাদেশে পন্সেটি পদ্ধতিতে কোথাও মুগুর পা’এর চিকিৎসা হত না। কিন্তু বর্তমানে এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হচ্ছে। দ্যা গ্লেন্কো ফাউন্ডেশন সরকারী হাসপাতালের ডাক্তারদের জন্য প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাচ্ছে, যেন তারা সারা বাংলাদেশে এ পদ্ধতিতে চিকিৎসা করতে পারেন। এর ধারাবাহিকতায় গত বছর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে দ্যা গ্লেন্কো ফাউন্ডেশনের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এর মাধ্যমে সেখানে আরও অনেক ডাক্তারদের পন্সেটি পদ্ধতির উপর প্রশিক্ষণ নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও, সাধারণ মানুষের মধ্যে জনসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সারা দেশে নিয়মিত চলছে মুগুর পা-এর কারণ, পরিণাম ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কর্মশালা।

 

গত সোয়া চার বছরে ওয়াক ফর লাইফ সফলভাবে প্রায় সাড়ে দশ হাজার শিশুর ১৫,৭৫৯ টি মুগুর পা-এর চিকিৎসা করেছে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশে এখন ওয়াক ফর লাইফের ৪৯টি ক্লিনিক চালু আছে। ক্লিনিকগুলোর এই নেটওয়ার্ক সারা বাংলাদেশে এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যে কোন শিশুকেই চিকিৎসার জন্য ৬০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্ব অতিক্রম করতে হয় না। এবং এসব ক্লিনিকে সরকারী অভিজ্ঞ অর্থোপেডিক সার্জনেরা ওয়াক ফর লাইফের কার্যক্রম সরাসরি তত্ত্বাবধান করেন।

 

আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ব্যাপকভাবে সমাদৃত অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞগণ নিয়মিত ভিত্তিতে ওয়াক ফর লাইফের কার্যক্রম স্বেচ্ছায় পরিদর্শন করেন এবং মান নিয়ন্ত্রণে পরামর্শ দিয়ে আসছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ডাক্তার স্টিভ ম্যানিয়ন এবং ডাক্তার ইগ্নাসিও পন্সেটির এককালীন সহকর্মী ও বর্তমানের বিশ্বখ্যাত অর্থোপেডিক সার্জন ডাক্তার ফ্রেড ডিট্জ্।

 

মুগুর পা বা ক্লাবফুট কোন অভিশাপ নয়। চাইলেই এর চিকিৎসার মাধ্যমে একটি শিশুর সারা জীবনের গল্প বদলে দেয়া যায়। দরকার শুধু একটু সচেতনতা আর এই বিনামূল্যে চিকিৎসার খবর সারা দেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে দেয়া। ওয়াক ফর লাইফ সম্পর্কে আরও জানতে চাইলে ভিজিট করুন অফিসিয়াল ওয়েব সাইট

 

প্রাক্তন ম্যানেজার-ডোনার রিলেশেন,

ওয়াক ফর লাইফ