নির্মূল হলেও তালিকায় নেই পোলিও সম্মুখীন ব্যক্তিরা

মুয়ায বিন জাকারিয়াঃ পোলিও মুক্ত ঘোষিত হয়েছে বাংলাদেশ, কিন্তু সত্তরের দশক থেকে পোলিওর সাথে লড়াইরত এ মানুষগুলোর পুনর্বাসন তথা অধিকার বাস্তবায়নে নেয়া হয় নি সরকারি বেসরকারি কোন উদ্যোগ। সরকারের কাছে নেই পোলিও সম্মুখীন ব্যক্তিদের সঠিক পরিসংখ্যান। এদিকে তাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা পূনর্বাসনের বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ সরকারি কর্মকর্তাগণ।

 

তথ্যানুসন্ধানে প্রকাশ, ১৯৯৭ সনে মাত্র আড়াই বছর বয়সে পোলিও সম্মুখীন হওয়া ঢাকা জুরাইনের সালমা আক্তার যুঁথি চার দেয়ালের নিভৃতে কাটাচ্ছেন বন্দী জীবন। বড় ভাইয়েরা হাত খরচ দিলে কোনমতে দিনযাপন করেন। পান নি শিক্ষার সুযোগও। সরকারি বেসরকারি সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়া অনেক দূরের কথা। এমনকি প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণের কোন জরিপকারীও আজ অবধি যান নি তার দুয়ারে। নিজেকে পরিবারের বোঝা ও অসহায় দাবি করে সরকারের কাছে সহযোগিতার আবেদন জানান তিনি।

অন্যদিকে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষদের চাহিদা মাথায় রেখে বর্তমান সরকার যথেষ্ট আন্তরিক হলেও পোলিও সম্মুখীন ব্যক্তিদের ব্যাপারে সরকার উদাসীন এমন অভিযোগ করেন পটুয়াখালী নিবাসী প্রায় চল্লিশোর্ধ্ব পোলিও সম্মুখীন স্নিগ্ধা আক্তার। তিনি বলেন, “পোলিও মুক্ত হয়েছে এ ঘোষণায় আনন্দিত হবার সময় এখনও আসে নি। এই মানুষগুলোর তালিকা করে বয়স ভিত্তিক চাহিদা নিশ্চিতের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। যেমন – তাদের জন্য শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা এবং পূনর্বাসন বা ভাতার প্রচলন শুরু করতে হবে।” সরকারের পাশাপাশি পোলিও নিয়ে কর্মরত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জোর তাগিদ দেন তিনি।

 

তালিকা অন্তর্ভুক্তি এবং অধিকার নিশ্চিতের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি সরকারি আদেশ বিষয়ক প্রশ্নের জবাবে ইপিআই এন্ড সার্ভিল্যান্স এর উপপরিচালক ও প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডাঃ সফিকুর রহমান বলেন, পোলিও সম্মুখীনদের প্রতিবন্ধী মানুষের তালিকায় রাখা হচ্ছে এবং তাদের শনাক্ত করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তাররা আছেন। তবে তাদের অধিকারের বিষয় নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।

সরকারি সমাজসেবা অধিদফতরের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাদের কেউ কোন রকম তথ্য দিতে কিংবা মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, উপরের নির্দেশ ছাড়া সাংবাদিকদের তথ্য দেয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি আছে। তবে তিনি জানান সরকার এই মুহূর্তে শুধু প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ নিয়ে ব্যস্ত। জরিপ শেষে হয়ত পোলিও সম্মুখীন ব্যক্তিদের জন্য প্রকল্প নেয়া হতেও পারে। জুরাইনের সালমা আক্তার যুঁথির জরিপে অন্তর্ভুক্তি প্রসঙ্গেও সুস্পষ্ট বক্তব্য দেন নি তিনি।

 

এদিকে রোটারি ক্লাব অব ঢাকা সেন্ট্রালের সাবেক সভাপতি এবং বাংলা কেমিকেলের সিইও এম এস সিদ্দিকী এ ঘোষণায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সরকার সহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্মীদের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশ পোলিও মুক্ত হয়েছে স্বরণ করিয়ে তিনি বলেন, রোটারী ইন্টারন্যাশনালের পোলিও বিষয়ক যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হবে। বিশেষ করে পোলিও টিকাদান কর্মসূচী। উল্লেখ্য, রোটারি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিসেফ এর মাধ্যমে সরকারকে পোলিও টিকাসহ অন্যান্য ওষুধ সরবরাহ করে থাকে।

পোলিও সম্মুখীন বা শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের পুনর্বাসন, শিক্ষা এবং যাতায়াত ব্যবস্থায় সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাব বিষয়ক অপর এক প্রশ্নে জনাব সিদ্দিকী বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে সরকারি কিছু উদ্যোগ আছে তবে পোলিও নিয়ে টিকাদান কর্মসূচী ব্যতীত শিক্ষা, পুনর্বাসন বিষয়ক উদ্যোগের কথা জানা নেই আমার।

 

গত ২৭ মার্চ ২০১৪ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এগারোটি দেশকে পোলিও মুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করেছে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য অপরাজেয় এর পক্ষ থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ডাঃ মোঃ হাসানুজ্জামানের সাথে কয়েকবার কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি ব্যস্ততার কারণে সময় দিতে পারেন নি। এছাড়া ইউনিসেফ এর সাথেও বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করে ব্যার্থ হয়েছে এ প্রতিবেদক।

ভারতীয় এক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সহায়তায় বাংলাদেশ ক্রিকেট এ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা ফিজিক্যালী চ্যালেঞ্জড (বিসিএএফসি) নামের প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন পোলিও সম্মুখীন মহসিন। শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে তৈরি এই ক্রিকেট দল চলতি মাসে ভারতের ফিজিক্যালী চ্যালেঞ্জড ক্রিকেট দলের সাথে টি-টোয়েন্ট টুর্নামেন্ট খেলতে ভারত সফরে গিয়েছেন। আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে সরকার এবং দেশের কোন বেসরকারি সংস্থার সাহায্য পান নি এমন অভিযোগ করে মহসিন বলেন, পরিবার এবং ভিনদেশি নাগরিকের সাহায্যে যদি এত দূর আসতে পারি, সরকারি সাহায্যে আমরা এগিয়ে যেতে পারি আরও বহু দূর। সঠিক সহযোগিতা পেলে পোলিও সম্মুখীন মানুষেরাও সমাজে প্রতিষ্ঠিত হবার সামর্থ্য রাখে তা মহসিন প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।

 

উল্লেখ্য, ২০০৬ সালের ২২ নভেম্বর বাংলাদেশে সর্বশেষ পোলিও শনাক্ত হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী পরপর ৩ বছর আশপাশের দেশগুলো পোলিও শনাক্ত না হবার ফলে চলতি বছরে বাংলাদেশ পোলিও নির্মূলের সনদ পেল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের অন্য দেশগুলো হচ্ছে: ভারত, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, নেপাল, উত্তর কোরিয়া, থাইল্যান্ড, তিমুর ও মিয়ানমার। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা আশা করছে ২০১৮ সালের মাঝে বিশ্বকে পোলিওমুক্ত করা হবে। পোলিও একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এই ভাইরাস মানবদেহের স্নায়ুতন্ত্রে প্রবেশ করে মাংসপেশী নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুকোষকে আক্রান্ত করার কয়েক ঘন্টার মধ্যে শিশুটি চলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।