পরিবর্তন করা হোক ভাষার সংজ্ঞা

16

সগীর হোসাইন খান

 

ভাষা। বিষয়টা চিন্তা করলেও আমার মানসপটে ভেসে উঠে এক বা একাধিক মানুষ মুখ দিয়ে অর্থবোধক শব্দ তৈরী করছে। ছোটবেলা থেকেই আমরা বিভিন্ন ভাবে ভাষার সংজ্ঞা পড়ে আসছি। খুব পরিচিত তিন ভাষাবিজ্ঞানীর তিনটি সংজ্ঞা দিচ্ছি।

ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে, মানব জাতি যে ধ্বনি বা ধ্বনি সকল দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করে তার নাম ভাষা।

ডঃ সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে ধ্বনির দ্বারা নিষ্পন্ন, কোন বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথা বাক্যের উপযুক্ত শব্দসমষ্টিকে ভাষা বলে।

ডঃ মুহম্মদ এনামুল হকের মতে, মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে অপরের বোধগম্য যে ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টি উচ্চারণ করে থাকে, সেই ধ্বনিসমষ্টিকে ভাষা বলা হয়।

একটু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে প্রতিটি সংজ্ঞাতেই ধ্বনি, বাগযন্ত্র ইত্যাদি বিষয়গুলোর উপর জোর দেয়া হয়েছে।

 

বাংলাদেশে বর্তমানে ২০টির উপরে বেসরকারি টিভি চ্যানেল রয়েছে। প্রতিটি চ্যানেলই বাংলাদেশ টেলিভিশনের দুপুর দুটার খবর পুনঃপ্রচার করে থাকে। নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন বিটিভির খবর পাঠক নিজের পরিচয় দেয়ার সাথে আরেকজনকে পরিচয় করিয়ে দেন, ইশারা ভাষায় আছেন ওমুক। দেখা যায়, টিভি মনিটরের ডান পাশে এক কোণে হাত নেড়ে ইশারায় খবর পাঠ করছেন একজন। এই ইশারা ভাষা নিয়েই আজকের মূল আলোচনা।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও নানা ভাবেই ইশারায় মনের ভাব প্রকাশ করি। যেমন আসা-যাওয়ার জন্য, চুপ থাকা, সালাম দেয়া, কিছু নির্দেশ করা ইত্যাদি। এই ইশারাগুলো পরিচিত বলে আমরা খুব সহজেই বুঝতে পারি। এমনিভাবে সম্পূর্ণ ইশারাতেই শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষ তাদের মনের ভাব প্রকাশ করে। এই ইশারাগুলো সুসংগঠিত এবং একটি ছন্দ নিয়ে গঠিত হয়। শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষদের মত আরও কিছু মানুষ আছে যারা না শুনতে পায় না দেখতে পায়। তাদেরও নিজস্ব একটি ভাষা আছে যা ¯পর্শ  নামে পরিচিত। ভারতীয় ছবি ব্ল্যাক এ অমিতাভ বচ্চন রানী মুখার্জির সাথে স্পর্শ ভাষাতেই মনের ভাব আদান প্রদান করতে দেখেছি আমরা।

এই ইশারা ও স্পর্শ ভাষা অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন দেশে মূল ভাষার সমান্তরালে প্রতিষ্ঠিত ভাষা হিসেবে প্রচলিত। রয়েছে বৃটিশ সাইন ল্যাক্সগুয়েজ, আরও আছে আমেরিকান সাইন ল্যাক্সগুয়েজ। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও রয়েছে হিন্দি সাইন ল্যাক্সগুয়েজ।

বাংলা ইশারা ভাষা নিয়ে আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই কাজ চলছে। বর্তমানে বিটিভিতে চারজন এবং দেশ টিভিতে তিনজন ইশারা ভাষায় খবর পাঠ করছেন। বাংলা ইশারা ভাষার রয়েছে নিজস্বতা, রয়েছে গঠন প্রক্রিয়া এবং এটি মুখের ভাষার মতই ব্যবহারকারীর ব্যবহারের সাথে সাথে নতুন শব্দ গঠন এবং পুরাতন শব্দ পরিত্যাগ করে থাকে।

 

আমরা শুরু করেছিলাম ভাষার সংজ্ঞা দিয়ে, যেখানে দেখিয়েছিলাম কিভাবে শুধু মুখে উচ্চারিত ধ্বনিকে ভাষা হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কিন্তু সময় পাল্টেছে। এসেছে ইশারা ভাষা। রয়েছে স্পর্শভাষা। এই ভাষাগুলোকে জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদ স্বীকৃতি দিয়েছে যাতে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষরকারী দেশ। আমাদের দেশে নতুন তৈরী হওয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ ও এই ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং ইশারা ভাষাকে শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের প্রথম ভাষা হিসবে নিশ্চয়তা দিয়েছে।

তাই সময়ের সাথে ভাষার সংজ্ঞায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। এই পরিবর্তন শুধু ভাষাকে সংজ্ঞায়িত করার উদ্দেশ্যে নয়, একদল মানুষের ভাষাকে এবং একদল মানুষকে স্বীকৃতি প্রদান করার উদ্দেশ্যে করা প্রয়োজন।

তাই জাতীয় ইশারা ভাষা দিবস ২০১৪ এ আমাদের দাবি থাকবে ইশারা ভাষা স্পর্শ ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়ে পরিবর্তন করা হোক ভাষার সংজ্ঞা যা প্রাথমিকের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করে সবার মাঝে ইশারা ও স্পর্শ ভাষার ধারনাকে ছড়িয়ে দিবে।