সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে অ-প্রতিবন্ধী সন্তানের মত প্রতিবন্ধী সন্তানকেও প্রতিষ্ঠিত করতে হবে

8

ফাহমিদ নাজিফ হক। ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। মাত্র পাঁচ বৎসর বয়স থেকেই ডিউশন মাস্কুলার ডিস্ট্রফির সম্মুখীন হয়েও শারীরিক প্রতিবন্ধিতা দমিয়ে রাখতে পারেনি যাকে। অসাধারণ ছবি আঁকে, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে, নাট্যাভিনয়েও অগাধ আগ্রহ তার। সেই সাথে স্বপ্ন দেখে সমাজের অযাচিত শৃঙ্খল ভাঙ্গার আর রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায় পোষা পাখিগুলোর মত যেখানে সেখানে উড়ে বেড়ানোর।

 

এবার অপরাজেয়র সাথে কথোপকথনে আছেন ফাহমিদের বাবা মোঃ আনোয়ারুল হক এবং মা মিসেস ফাতেমা চৌধুরী। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাজিয়া আফরিন ও নাভিদ নওরোজ শাহ্।

 

অপরাজেয়ঃ  প্রথম যখন সন্তানের প্রতিবন্ধিতা বুঝতে পারলেন সেই সময়কার কথা বলুন।

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  সাড়ে তিন বছর বয়স থেকে ফাহমিদ বিদ্যালয়ে যাওয়া শুরু করে। ২০০৫ সালে ডিউশন মাস্কুলার ডিস্ট্রফি, সংক্ষেপে যাকে ডিএমডি বলে। এটি যখন ধরা পড়ে তখন ওর বয়স পাঁচ। হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ পড়ে যেত যদিও হাঁটা-চলা পুরোপুরি বন্ধ হয় নি তখনও। মাস্কুলার ডিস্ট্রফির সম্মুখীন হলে ধীরে ধীরে শরীরের শক্তি কমে যেতে থাকে। কাফ মাসল থেকে ড্যামেজ শুরু হয় বলে হাঁটতে হাঁটতে পড়ে যেত। দেশের বিভিন্ন ডাক্তার দেখাই। জানতাম এটা নিরাময়যোগ্য নয় কিন্তু নিজের সন্তুষ্টির জন্যেই চেষ্টা করে গিয়েছি, এখনও করছি।

 

অপরাজেয়ঃ  প্রতিবন্ধিতা ধরা পরার পর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আপনার সন্তানকে কিভাবে নিয়েছেন এবং আত্নীয় বা পাড়া প্রতিবেশী থেকে কটুকথা/কুসংস্কার কিভাবে মোকাবিলা করেছেন?   আশেপাশের মানুষজন মানে প্রতিবেশীর আচরণ কতটা সহনীয় ছিল?  

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  আমার পরিবার/আত্মীয়স্বজন সকলেই সচেতন ছিলেন। তারা বলতেন, এই ব্যাপারে ওর সামনে কথাবার্তা বললে ও কষ্ট পেতে পারে। সবার কাছ থেকেই সবসময় সহযোগিতা পেয়েছি। কটুকথা আমার সামনে তেমন শুনি নি। আড়ালে হয়ত কেউ বলেছে, হয়ত বলে নি। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমরা ধরে নেই, নিশ্চয়ই কোন কর্মফল, বড় পাপ, অন্যায়, ঘুষ খাওয়ার কারণে কিংবা দুর্নীতি করেছে বলেই তার সন্তানের এমন দশা। অস্বীকার করব না আমার মনেও হয়ত এ ধারণা ছিল কিছুটা। তবে ফাহমিদের প্রতিবন্ধিতার পর এ প্রশ্নের উত্তর আমি পাই নি। পরিশ্রম করে উপার্জন করি। কাউকে ঠকানোর সুযোগ আমার নেই। তাহলে আমার কেন এমন হল? আমি ভুক্তভোগী বলে আমার ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। তবে যারা ভুক্তভোগী নয় তারা হয়ত এখনও এ ধারণা পোষণ করেন। সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে ধীরে ধীরে এটা কমতে থাকবে।

 

অপরাজেয়ঃ  সন্তানের প্রতিবন্ধিতাকে মেনে নিয়ে পরবর্তীতে কি পদক্ষেপ নিলেন ?

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  আল্লাহ যা দিয়েছেন, মেনে নিয়েছি। চূড়ান্ত কষ্টের সময়ও সন্তানের সামনে হেসেছি। তাকে ভালো রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে শুরু থেকেই মনে হয়েছে ওকে শিক্ষিত এবং সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি।

 

অপরাজেয়ঃ  আপনার প্রতিবন্ধী সন্তানকে অন্যান্য অপ্রতিবন্ধী সন্তানের মত সমাজে প্রতিষ্ঠিত গড়ে তোলার ব্যাপারে প্রত্যয়ী হলেন কিভাবে? কিভাবে সচেতনতা এলো?

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  আমি মনে করি, প্রতিবন্ধী- অপ্রতিবন্ধী সকল সন্তানকেই প্রতিষ্ঠিত করা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প নেই। তাছাড়া প্রতিবন্ধী বলে তাদের আলাদা ভাবে দেখারও কোন অবকাশ নেই। যেসব বাবা-মা সন্তানকে হুইলচেয়ারে রেখে চারদেয়ালে আবদ্ধ করে ফেলেন তাদের আসলে সচেতনতাবোধ বা চিন্তা-ভাবনার অভাব। শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলে বরং অভিভাবককে আরও বেশি ভাবতে হবে। অপ্রতিবন্ধী সন্তান বড় হয়ে যে কোন শ্রমের মাধ্যমেই জীবিকা নির্বাহ করতে পারবে। কিন্তু প্রতিবন্ধী সন্তানকে যদি সেভাবে গড়ে তুলতে না পারা যায় তারা তাদের জীবিকা নির্বাহ করবে কিভাবে?

ফাহমিদের বেলায় আমি আসলে ভেবে কিছু করি নি। আমাকে তো আমার সন্তানকে মানুষ করতেই হবে। সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে। তাই তাকে মানুষের মত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে যতটুকু করণীয় তার সবটুকুই আমি করে যাচ্ছি।

 

অপরাজেয়ঃ  সন্তানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে ঘরে-বাইরে কতটা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন? স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ ও সহপাঠীদের আচরণ সহযোগিতামূলক ছিল কি? 

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  আসলে একেক মানুষের একেক রকমের ভাবনা। কারো ধারণা, “প্রতিবন্ধী সন্তানকে পড়ালেখা করিয়ে লাভ কি!” আবার এমনও ঘটে স্কুলে পাঁচজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক মিলে একটি প্রতিবন্ধী শিশুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে ঐ পাঁচজন শিক্ষার্থীকে ধরে রাখার জন্য হয়ত প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয় থেকে বাদ দেয়া হয়। আমি এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভাবতে পারি না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হবে সর্বজনীন, যেখানে সবার সমান অধিকার থাকবে। তবে ফাহমিদ এক্ষেত্রে কিছুটা ভাগ্যবান। পরিবার, শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ, সহপাঠীদের অনেকের সহযোগিতাই পেয়েছে সে।

 

অপরাজেয়ঃ  চাকুরিজীবি বাবা হিসেবে প্রতিবন্ধী সন্তান লালন পালনের ক্ষেত্রে কি ধরনের সমস্যার সম্মুখীন বোধ করেন বা করছেন? 

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  প্রতিকুলতা আসে নি তা নয় বরং সেটা ভুলে থাকার চেষ্টা করি। আমি আমার পুরনো চাকুরী ছেড়েছি তবুও ছেলেকে বিদ্যালয় ছাড়তে দেই নি। আমার বিশ্বাস এটা আমার জন্য একটা চ্যালেঞ্জ এবং আমি কোনভাবেই ছাড় দিতে রাজি নই।

 

অপরাজেয়ঃ  সন্তানকে কোথাও নিয়ে যেতে কি ধরনের বাধার সম্মূখীন হতে হয়? কোথাও ঘুরতে গেলে পারিপার্শ্বিক পরিবেশে ঠিক কতটুকু সুবিধা পান??

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  আমাদের দেশে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের নিয়ে ঘর থেকে বেরুলে প্রথমেই যে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তা হল প্রবেশগম্যতার অভাব। ফলে আমরা কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে নিজেদের সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। নির্দিষ্ট কিছু জায়গা ছাড়া ওকে নিয়ে কোথাও যাই না। আমাদের দেশেই এমন কিছু বিনোদন কেন্দ্র রয়েছে যেখানে ফাহমিদের ইচ্ছা এবং আমার  সামর্থ্য থাকা সত্বেও ওকে নিয়ে যেতে পারি না শুধুমাত্র ওর মত হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষের  প্রবেশের সুব্যবস্থা নেই বলে। আর কোথাও বের হতে হলে পুরোপুরি পরিকল্পনা করে নিতে হয়। যেমন- সেখানে ফাহমিদের হুইলচেয়ার প্রবেশ সুবিধা, সহায়ক টয়লেট ব্যবস্থা ইত্যাদি সব ভেবে/জেনে নিশ্চিত হয়ে তবেই বেরুতে পারি। এদেশে তেমন হুইলচেয়ার সহায়ক পরিবেশ খুব কমই আছে।

 

অপরাজেয়ঃ  আপনার/আপনাদের অনুপস্থিতিতে আপনার সন্তান যেন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারে এমন কি কি উপায় ভেবে রেখেছেন?

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  আমি আল্লাহর কাছে সন্তানের জন্য নিজের আয়ু চেয়েছি। স্বপ্নেও ভাবতে পারি না ছেলে আমাদের ছাড়া একাকী জীবন কাটাচ্ছে। তাকে চিকিৎসা দিয়ে কিছুটা উন্নত জীবন দেয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠিত করার চিন্তা তো আছেই। তার পড়ালেখাটা এজন্যই চালিয়ে যাচ্ছি কারণ ভবিষ্যতে ওকে কিছু করে তার জীবিকা নির্বাহ করতে হবে। ফাহমিদ নিজেও অন্যান্য সবার মত সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। সেজন্য সে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকুলতা সত্বেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

অপরাজেয়ঃ  এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়, অনেক অভিভাবক তার প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে চান না কিংবা পূনর্বাসন কেন্দ্র বা হোস্টেলের কথা ভাবেন, এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কি?

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  আমি একে শিক্ষার অভাব বলব না। এটা হীনমন্যতা। আমার চেয়েও অনেক শিক্ষিত লোককে দেখেছি নিজেদের সন্তানকে অবহেলা করতে। হয়ত এসব শিশুদের ভবিষ্যৎ কিংবা ভাগ্যের ব্যবস্থা আল্লাহ করেছেন। তবে আমাদের করণীয়টুকু সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

 

অপরাজেয়ঃ  এদেশের আর্থিক সঙ্কটাপন্ন প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকেরা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা বা প্রতিকূলতা কিভাবে মোকাবিলা করবে বলে আপনি মনে করেন?

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  এটা অনেক কঠিন একটা প্রশ্ন। এক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি উদ্যোগ ছাড়া সাধারণ জনগণের সমস্যা দূর করা সম্ভব নয়। সরকার অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। তবে সরকারের সেবাটা প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

অপরাজেয়ঃ  সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের কাজটি সহজ নয়, এই জায়গাগুলোতে পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আপনি কতটা আশাবাদী বা সার্বিক পরিস্থিতিটা কি? বাংলাদেশের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত প্রতিবন্ধী সন্তানের বাবা মা এর প্রতি আপনার যদি কিছু বলার থাকে। 

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  আমরা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার আগ পর্যন্ত শ্বাস নেই। তাই যতক্ষণ পারা যায় যেভাবে পারা যায় সেভাবেই চেষ্টা করতে হবে। নৈরাশ্যবাদী হওয়া যাবে না। সচেতনতা বৃদ্ধি বেশি জরুরী। একমাত্র সচেতন নাগরিকই পারে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিতে। প্রতিবন্ধী সন্তানের মা-বাবাদের বলব, আপনি হাত বাড়ালে হাত ধরার লোক আপনি পাবেন। আপনি এগিয়ে আসুন। আপনার জন্যও নিশ্চয়ই কেউ এগিয়ে আসবে।

 

অপরাজেয়ঃ  মিসেস ফাতেমা চৌধুরী, সন্তানের মা হিসেবে এক্ষেত্রে আপনার অভিমত কি সেটা জানতে চাইছি।

মিসেস ফাতেমা চৌধুরীঃ  এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ধৈর্য ধরতে হবে এবং চেষ্টা করে যেতে হবে তবেই সফলতা আসবেই। তবে পারিবারিক সহযোগিতার পাশাপাশি সামাজিক সহযোগিতাও একান্ত দরকার বলে মনে করছি আমি।

 

অপরাজেয়ঃ  অপরাজেয় এর পক্ষ থেকে আপনাদের ধন্যবাদ।

মোঃ আনোয়ারুল হকঃ  অপরাজেয়কেও অনেক ধন্যবাদ।