আমার শিক্ষা সফর; অবর্ণনীয় এক সংগ্রামের গল্প

জান্নাতুল ফেরদৌস

 

আলোরও প্রদীপ তিনি,

আঁধারেরও প্রদীপ তিনি।

সকল প্রদীপ নিভে গেলেও,

তবু তাহার প্রদীপ নিভে না।

 

চোখের পাতা বুজলে সারা বিশ্ব আঁধার হয়, কিন্তু শ্রবণ শক্তি যায় না কমে। এই অপরূপ প্রকৃতির শব্দ যেমন শুনতে পাওয়া যায় ঠিক তেমনি অনুভবও করা যায় অনেক কিছু। তবুও কেন যেন বন্ধ চোখে সব উপলব্ধি করতে পারলেও বেলা শেষে পৃথিবীর রং দেখতে চায় এই চোখ। আমি মাত্র বার বছর বয়সে হারিয়ে ফেলি চোখের দৃষ্টি। শুধুমাত্র অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার কারণে। তখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়তাম। বছরের শেষে ২০০৯-এ আমি হয়ে যাই দৃষ্টিহীন। চোখ খুললেও দেখা যায় না পৃথিবীর সকল আলো। তবুও ছিল না আমার মনের মাঝে কোনো কষ্ট। শারীরিক অবস্থা ও দৃষ্টি হারাবার পর শুধু মনে ব্যথা বিদ্যালয়ে  জন্য। সারাদিন রাত শুধু অশ্রু ঝড়েছে শিক্ষা অর্জনের জন্য। কিন্তু পরিবার, আত্মীয়-স্বজন সকলের চিন্তা কি হবে আমার ভবিষ্যৎ। সকলের জন্য হয়ে গেলাম আমি দৃষ্টিহীন এক “অসুস্থ” ব্যক্তি।

 

এদিকে আমার চিন্তা ভাবনা ছিল ভিন্ন। নিজেকে কখনও মনে করি নি দৃষ্টিহীন। জটিল এই রোগে আক্রান্ত হবার পরেও জীবনের স্বপ্নটিকে বড় যত্নে বুনেছি নিজের মাঝে। কখনও আশা ছাড়ি নি। কেননা আমার মনের আলো ছিল বড় তীব্র। সব সময় ভাবতাম এই বুঝি ফিরে এল চোখের আলো। কিন্তু দিন গেল, মাস গেল, বছরও পেরিয়ে গেল, তবুও আঁধার কাটলো না আমার জীবনে।

তিন বছর পর ২০১১ সালে নতুন যুদ্ধ শুরু করলাম সকলের সাথে একত্রে পড়ালেখার উদ্দেশ্যে। আমি তখন ঢাকায়। নতুন কিছু শেখার বিষয়ে মগ্ন। হাজারো বাধা পরও আমি আমার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ২০১২ সালের মে মাসে এক বন্ধুর সাহায্যে রাশেদ স্যার নামক এক মায়াশীল শিক্ষকের সাথে পরিচয় হয়। যিনি আমার পড়াশোনার উদ্যোগ নেন। এবং অবশেষে সকল বাধা অতিক্রম করে আমি স্কুলে ভর্তির জন্য কাগজপত্র একত্রিত করতে শুরু করলাম। সে সময় সামাজিক পারিবারিক অসচেতনতা, কঠিন বাস্তবতা বা আমার আশেপাশে সকলের অসম্মতির কারণে পড়াশোনা থেকে আমি আরও কয়েক বছর পিছিয়ে যাই।

 

তবুও হাল ছাড়ি নি। জীবনের আশা-স্বপ্নগুলো মজবুত ভাবে ধরে রেখে পাঁচ বছর পর আবারও ২০১৪ সালের ৮ মার্চ আমি মূলধারার বিদ্যালয় ফৌজদারহাট পাবলিক স্কুল এ্যান্ড কলেজে ৮ম শ্রেণীতে ভর্তি হতে সক্ষম হই। প্রথমে স্কুল কর্তৃপক্ষ অসম্মতি দেখালো আমার পড়াশোনায়। তবে জেলা শিক্ষা অফিসারের আদেশে অবশেষে তারা আমাকে ভর্তির অনুমোদন দেয়। ভর্তির পর স্কুলে শিক্ষকগণ ভেবেছিলেন আমি ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারব না। আমার জন্য তাদের স্কুলের রেকর্ডও খারাপ হবে। ধীরে ধীরে পরীক্ষায় আমার ভালো ফলাফল, মেধার বহিঃপ্রকাশ দেখে তারা অত্যন্ত খুশি। ইদানিং স্কুলের মেধাবী ছাত্রী হিসেবে তারা আমাকে সকলের কাছে তুলে ধরেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সহপাঠী এমনকি আমার পরিবারও আমাকে অনেক সাহায্য করছেন এখন। জীবনে দৃষ্টি থাকা অবস্থায় যা কিছু অর্জন করেছি, তার চেয়েও দ্বিগুণ অর্জন করেছি দৃষ্টিহীন হবার পর। প্রকৃতির সব উপলব্ধি নিয়ে জ্ঞানের জগতে নিজেকে বিলীন করে যা অনুধাবন করতে পারি তা হয়ত দৃষ্টি থাকলে পারতাম না। শিখেছি কষ্ট করে নিজের অধিকার আদায় করা এবং কঠিন কষ্টময় বাধা অতিক্রম করে নিজের স্বপ্ন মজবুতভাবে বুনে তা বাস্তবতায় পরিণত করার পদ্ধতি। এছাড়া আমরা সাধারণত বই পড়ে যা অর্জন করি তার মর্ম তখনই বুঝি যখন নিজের জীবন সংগ্রামে অবতীর্ণ হই। অতীতে আমার প্রতি সবার অবজ্ঞা ছিল যা আজ আর নেই। সবাই এখন মোটামুটি আমার শিক্ষা গ্রহণের বিষয়ে সম্মতি দেয়।

 

ছোট থেকে বড় হয়েছি বন্ধু-বান্ধবের কোন সাহায্য ছাড়া। সুখের সময় সবাই পাশে ছিল কিন্তু দুঃখের সময়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। অল্প সংখ্যক কিছু ব্যক্তি ছাড়া। কষ্টের সম্মুখীন হবার পর দেশে-বিদেশে নানা জায়গায় ভ্রমণ করেছি, সেই সময়টিতে অনেক কষ্টের সাথে লড়াই করতে হয়েছে। নিজের শারীরিক যন্ত্রণা, মানুষের মন্দ ব্যবহারে মন খুলে কেঁদেছি। পরে আবার নিজে নিজে হেসেছি। জীবন সংগ্রামে পা রাখার পর যতই বাধা আমার জীবনে এসেছে, সকল বাধার ব্যথা মুছে শেখার জগতে মগ্ন হয়েছি। বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে, নানা মানুষের সাথে কথা বলে নানা বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেছি। সংগীত চর্চা, নৃত্য চর্চা, আবৃত্তি, মনের ভাব ও গল্প-কবিতা লেখালেখি, রন্ধন শিল্প এবং সকল সময় আত্মনির্ভরশীল থাকা এসব ঘিরেই ছিল আমার জগৎ। জীবনের কিছু ক্ষেত্রে সম্মতি না পাওয়ার কারণে আমার প্রচন্ড রাগ ছিল, কিন্তু তা কখনো প্রকাশ করিনি। সকল প্রশ্নের জবাবের সম্মুখীন হয়ে নিজেকে গড়ে তুলেছি। আর এ বিষয়ে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন আরেকজন গুণী শিক্ষক। যার নাম ইয়ামীন স্যার। তার দোয়া, সকল বিষয় সম্পর্কে তার দিক নির্দেশনার উপর ভিত্তি করে নিজের আত্মবিশ্বাস ও মনোবল বৃদ্ধি করতে পেরেছি। আমার ঘুমন্ত জ্ঞানের জগতকে জাগ্রত করতে সক্ষম হয়েছি। আমার জীবনে সফলতা অর্জনে তার অবদান অনেক।

 

জীবনের একটি কঠিন বাস্তবতা বলতে চাই। বাবা, মা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউ কখনো সারাজীবন সঙ্গী হয়ে থাকে না। কেউ কখনো কারো জীবন গড়ে দিতে পারে না। হাজার কষ্টের মধ্যে থাকলেও জীবনে সফলতা অর্জন করতে চাইলে সঠিক পথটি নিজেকেই খুঁজে বের করতে হয়। এবং সেই পথের পথিক হিসেবে সকলের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করতে হয় যে, আমি পারবই সকল বাধা ভেঙে উপরে উঠতে, সকল স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে এবং অর্জনকৃত জ্ঞানের আলোয় আঁধারকে জয় করতে। আজ সাড়ে পাঁচ বছর পর জীবনে অনেকখানি সফলতা অর্জন করেছি। তাই আমি বর্তমান অবস্থান থেকে বলব, জীবনে একটি সঙ্গ নয়, কেবলমাত্র দোয়া ও সঠিক শিক্ষকের প্রয়োজন।

 

এই জীবনে শুধু সৃষ্টিকর্তার রহমত চাই এবং সৃষ্টিকর্তা আমাকে যে জ্ঞান দান করেছেন সে জ্ঞানের জগৎ থেকে আমি শপথ পাঠ করছি- আমি নই শুধু আমার, আমার এই দু হাত নয় শুধু আমার, আমার এই দু’হাত মালিক দিয়েছেন মানব কল্যাণে এগিয়ে আসার জন্য। কষ্ট পেয়ে ঝড়ে যাওয়ার জন্যে নয়। বরং কষ্ট পেয়ে বাঁচতে শেখা মানুষের সহযোগিতার জন্য। দেশ ও বিশ্বের কাছে নিজ জ্ঞান ও একটি সত্য মানবের জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ তুলে ধরব। সর্বশেষে আমি বলতে চাই, চোখে যতই অশ্রু আসুক না কেন, যতই কষ্ট পাই না কেন। সকল মুহূর্তের মাঝ থেকে শুধুমাত্র সৃষ্টিকর্তাকে মনে প্রাণে স্মরণ করলে, তিনি মুছে দেন সকল অশ্রুও দূর করে দেন সকল কষ্ট এবং তার কুদরতি ধারা এনে দেয় জীবনে এক সত্যের সমুদ্র এবং সেই সমুদ্র থেকে নিজের ঈমান মজবুত রেখে সাঁতরে ওঠার দায়িত্ব আমাদের।