নব্বই ভাগ স্থাপনায় প্রতিবন্ধী মানুষের সহজ প্রবেশের সুযোগ নেই

ঢাকা ও চট্টগ্রামের নব্বই শতাংশ জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাতেই প্রতিবন্ধী মানুষেরা সহজ প্রবেশাধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন (ডিপিও) থেকে পাঁচ ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বেশ কিছু সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষণ শেষে এই চিত্র উঠে আসে।

 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০টি স্থাপনার মধ্যে ঢাকার সবগুলো এবং চট্টগ্রামের নয়টি স্থাপনাতে মূল প্রবেশ পথেই বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন প্রতিবন্ধী মানুষেরা। কিছু স্থাপনায় মূল প্রবেশপথে র‌্যাম্প থাকলেও তাকে র‌্যাম্প ভাবার উপায় নেই। ভেতরেও রয়েছে নানান বাধা। শুধুমাত্র চট্টগ্রামে সিডিএ ভবনে একটি চমৎকার র‌্যাম্প থাকলেও এর প্রবেশমুখ সবসময় মোটরসাইকেলে ঘেরা থাকে। ইমারত বিধিতে ১ ইঞ্চি অনুপাত ১২ ইঞ্চি লম্বা র‌্যাম্প নির্মাণের কথা বলা হলেও কোন কোন জায়গায় ১ ইঞ্চি অনুপাতে ৩ ইঞ্চি র‌্যাম্প রয়েছে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রাম মেডিকেল, নিউমার্কেট ও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে স্লোপের মত ঢালু পথ থাকলেও তাকে র‌্যাম্প বলা যায় না। এগুলো অত্যন্ত খাড়া, পিচ্ছিল এবং এতে কোন রেলিং নেই। এ ঢালু পথগুলো মূলত মালামাল ও রুগী বহনের ট্রলি বা স্ট্রেচার নিয়ে উঠানামার জন্য তৈরি হয়েছে।

 

দৃষ্টি ও স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি, ক্রাচ ব্যবহারকারী ব্যক্তি ও শ্রবণ-বাক প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণে ২০টি স্থাপনায় এ সরেজমিন নিরীক্ষায় দেখা যায় মূলত সচেতনতার অভাবেই মূল প্রবেশ পথ থেকে সম্পূর্ণ স্থাপনা জুড়ে অনুসন্ধান কেন্দ্র, সিঁড়ি, করিডোর, দরজা, কক্ষ ও সভাকক্ষ, টয়লেট, ওয়াটার পয়েন্ট, পার্কিং এলাকা ইত্যাদি জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সার্বজনীন প্রবেশগম্যতার নকশা অনুযায়ী নির্মিত বা পরবর্তীতেও সংস্কার করা হয় নি।

বিশেষত ২০টি স্থাপনার একটিতেও জরুরি নির্গমন পথ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বান্ধব টয়লেট না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন নিরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রতিবন্ধী মানুষেরা। যে কোন ভবনে জরুরি অবস্থায় তারাই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকেন। নির্বিঘ্নে অবস্থানের জন্যও প্রবেশগম্য টয়লেট অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বেশিরভাগ টয়লেটের ক্ষেত্রেই দরজাগুলো চাপা বা দরজার সামনে ২/৩ ইঞ্চি উঁচু চৌকাঠ রয়েছে এবং হুইলচেয়ার ঘোরানোর মত পর্যাপ্ত জায়গা ও হাই কমোডের ব্যবস্থা নেই। তন্মধ্যে ভবনগুলোর পয়োঃনিস্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে যেখানে মারাত্মক পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার অভাব লক্ষণীয়।

 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিড়ির বিকল্প হিসাবে লিফটের ব্যবস্থা নেই যেখানে সিড়ির ধাপগুলো অত্যন্ত উঁচু। সিড়ি বা র‌্যাম্পের শুরু ও শেষে এবং করিডোরে টেকটাইল বা ব্রেইল ব্লক এর সঠিক নিয়ম অনুযায়ী ব্যবহার হয় নি। লিফটে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ব্রেইল বাটন ও ফ্লোর ঘোষণার ব্যবস্থা নেই। বিভিন্ন কক্ষে যেতে সাইন পোস্ট বা দিক নির্দেশনা নেই। এছাড়া হুইলচেয়ার ঘুরানোর পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সকলের জন্য স্থাপনা গুলোতে রঙের সঠিক ব্যবহার করা হয়নি দেয়াল, দরজা বা জিনিসপত্র আলাদাভাবে চেনা বা বোঝার সুবিধার্থে। ইনফরমেশন ডেস্কের উচ্চতাও হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তিদের তুলনায় অনেক বেশি।

নিরীক্ষায় অংশ নেয়া একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ব্যক্তি বলেন, অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ অফিসেই প্রতিবন্ধী মানুষের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের সুযোগ-সুবিধা দেখার যে সংস্থা, সেই সমাজসেবা কার্যালয়েই প্রবেশগম্যতা নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামের সমাজসেবা কার্যালয়ে আমরা দেখেছি হুইলচেয়ার নিয়ে দোতলায় যাওয়া তো অনেক দূরের কথা এক তলাতেই প্রবেশ সম্ভব নয়।

 

সার্বজনীন প্রবেশগম্যতায় শ্রবণ বাক প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদাগুলো একেবারেই উপেক্ষিত। কোথাও ইশারা ভাষার সহযোগিতা নেই। জরুরি নম্বরে এসএমএস সার্ভিসের ব্যবস্থা কাজ করে না। তথ্য অনুসন্ধান নোটিশ বোর্ড বা সিটিজেন চার্টার লোকেশন ম্যাপ ইত্যাদি সব জায়গায় নেই। এদিকে রেলওয়ে স্টেশন, গাবতলী বাসস্ট্যান্ড ও ঢাকা নিউমার্কেটের মসজিদের সম্মুখে ছাড়া আর কোন স্থাপনায় পানি পানের নির্দিষ্ট স্থান পাওয়া যায় নি।

উল্লেখ্য গত ১৬, ১৮ ও ১৯ জুন’১৪ চট্টগ্রামে এবং ২৩ – ২৫ জুন’১৪ ঢাকার সরকারি গুরুত্বপূর্ণ গণস্থাপনাগুলোতে প্রতিবন্ধী মানুষের সাথে প্রবেশগম্যতা সম্পর্কিত বিষয়ক অভিজ্ঞ ব্যক্তি, বুয়েট ও চুয়েটের প্রকৌশলী, ইশারা ভাষার দোভাষী ও স্বেচ্ছাসেবীদের একটি দল নিয়ে এই নিরীক্ষা কার্যক্রমের উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এ্যান্ড এ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান)।

 

বি-স্ক্যান এর সহযোগি সংগঠন হিসেবে যোগ দেয় ওয়াটারএইড, পপুলেশন সার্ভিসেস এ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার(পিএসটিসি), সাজিদা ফাউন্ডেশন। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন রিহেবিলিটেশন সেন্টার ফর দ্যা ডিজেবেল্ড (আরসিডি), চট্টগ্রাম বধির উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশ ভিজুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি (ভিপস), সোসাইটি অব দ্যা ডেফ এন্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজারস (এসডিএসএল) এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত সংস্থা সেন্টার ফর দ্যা রিহেবিলিটেশন ফর দ্যা প্যারালাইজড (সিআরপি) কৌশলগত সহযোগি সংগঠন হিসেবে সম্পৃক্ত ছিলেন।

 

ঢাকা বিভাগে ওয়াসা ভবন, সমাজসেবা কার্যালয়, দক্ষিণ নগর ভবন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি ও বহিঃবিভাগ, নিউমার্কেট, গাবতলী বাস টার্মিনাল, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, তেজগাঁও ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, তেজগাঁও থানা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ভবন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ওয়াসা ভবন, শিক্ষা বোর্ড, সমাজসেবা কার্যালয়, বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন, নিউ মার্কেট, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি করপোরেশন, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি ও বহিঃবিভাগ, ডাবল মুরিং থানা ইত্যাদি স্থাপনা নিরীক্ষা শেষে গত ১৫ জুলাই’১৪ চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করে সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্তসহ (রিজেন্যাবল একমোডেশন), সার্বজনীন পরিকল্পনার (ইউনিভার্সাল ডিজাইন) ভিত্তিতে সরকারি সকল গণস্থাপনা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যে প্রবেশগমন উপযোগী করার জোর দাবি জানিয়েছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন (ডিপিও) সমূহ। ‘গুরুত্বপূর্ণ গণস্থাপনায় সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষণ’ শিরোনামে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বি-স্ক্যান এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব।

 

নিরীক্ষায় চিহ্নিত সমস্যার প্রেক্ষিতে প্রতিবন্ধী মানুষের সুবিধার্থে সংবাদ সম্মেলনে ১৪টি দাবি পেশ করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ স্থাপনার প্রতিটি ভবনে সার্বজনীন প্রবেশগম্যতার নকশা অনুসরণ নিশ্চিত করা, প্রবেশপথে দুই পাশে রেলিংযুক্ত অপিচ্ছিল র‌্যা¤প নির্মাণ, সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য ডেস্কের উচ্চতা ২৯ থেকে ৩০ ইঞ্চির মধ্যে করা, রঙ-এর ব্যবহারের দিকে লক্ষ্য রাখা, প্রতি তলায় অন্তত একটি সার্বজনীন প্রবেশগম্য টয়লেট রাখা, বিভিন্ন কক্ষে দিক-নির্দেশনার ব্যবস্থা, দরজা নূন্যতম ৩৬ ইঞ্চি চওড়া হওয়া, সিড়ি করিডোরে ব্রেইল ব্লক ও লিফটে ব্রেইল বাটনের ব্যবস্থা, তথ্য অনুসন্ধান কেন্দ্রে শ্রবণ-বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ইশারা ভাষার সহযোগিতা, জরুরি নম্বরে এসএমএস সার্ভিসের ব্যবস্থা, তথ্য অনুসন্ধান নোটিশ বোর্ড, সিটিজেন চার্টার, লোকেশন ম্যাপ এবং মানসম্মত পয়োঃনিস্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা ইত্যাদি।

 

সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বি-স্ক্যানের সভাপতি সাবরিনা সুলতানা, রিহেবিলিটেশন সেন্টার ফর দ্যা ডিজেবল্ড এর সভাপতি রাশেদুজ্জামান চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আসমা আক্তার, চট্টগ্রাম বধির সংস্থার সাধারণ সম্পাদক নিমাই বণিক, সিফাত তানজিলা, প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ সমন্বয়ক মুহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদ, ওয়াটারএইড এর প্রোগ্রাম ম্যানেজার শামীম আহমেদ ও পিএসটিসি এর প্রজেক্ট ম্যানেজার রফিকুল ইসলাম মজুমদার।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দাবির পক্ষে মতামত পেশ করেন ডাঃ মাহফুজুর রহমান, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্র, মোঃ জালালউদ্দিন, প্রধান প্রকৌশলী, শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগ, সাইফুদ্দিন মাহমুদ, উপ-সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, আরিফুল ইসলাম, নির্বাহী প্রকৌশলী, ওয়াসা, রাশেদ রউফ- সহ-সভাপতি, প্রেস ক্লাব, মহসিন চৌধুরী- সাধারণ সম্পাদক, প্রেস ক্লাব। এছাড়া সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা, প্রতিবন্ধী ব্যাক্তিবর্গ এবং সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

 

উক্ত সম্মেলনে জানানো হয়, এই নিরীক্ষার আলোকে গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পর ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে অচিরেই একটি আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।