বিধি প্রণয়নে গড়িমসি; প্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষমতায়ন জরুরি

31

 

 

এই কমিটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাতে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ বেশি থাকলে বিধি প্রণয়ণের ব্যাপারে এতটা কালক্ষেপন কখনই হতো না সে ব্যাপারে আমি অন্তত নিশ্চিত।

 

জীবন উইলিয়াম গমেজ: বাংলাদেশে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক একমাত্র পত্রিকা ‘অপরাজেয়’ সত্যিই প্রতিবন্ধী মানুষের কণ্ঠস্বর! আমি বিগত জুন’১৪ সংখ্যাটির প্রধান প্রতিবেদন “প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ এর বিধি প্রণয়নের ক্ষেত্রে গড়িমসি” পড়ার পর তা উপলব্ধি করতে পেরেছি। এই প্রতিবেদনটি ছিল সময়ের দাবি।

 

উক্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ বিধি প্রণয়ন কমিটি কর্তৃক গঠিত ওয়ার্কিংগ্রুপ গত আড়াই মাসে দু’বার বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েও আহ্বায়কসহ কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যগণ ব্যস্ততার অজুহাতে একত্রিত হতে পারেন নি। তাই প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়, কর্মব্যস্ত এই ব্যক্তিবর্গ যদি সময় দিতে না-ই পারেন তবে তাঁরা এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিলেন কেন? এছাড়া প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন-ই বা কেন বারেবারে তাদের সময় বৃদ্ধির আবেদন মেনে নিচ্ছেন? বিধি প্রণয়নে গঠিত কমিটি এবং ওয়ার্কিং গ্রুপের অন্যান্য সদস্যর ভূমিকা সম্পর্কে মনে প্রশ্ন জাগার পাশাপাশি আমাদের প্রতিবন্ধিতা বিষয়ক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ যারা রয়েছেন তারা কি ভূমিকা পালন করছেন তা জানতে ইচ্ছে করে।

 

প্রতিবেদনটিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মতামত উল্লেখ করা হয়েছিল, “প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নের অর্থে যে নেতাদের জীবিকা ও জীবন পরিচালিত হচ্ছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন নিয়ে কথা বলে যারা হাততালি কুড়াচ্ছেন এবং আইন বাস্তবায়নে দাতা সংস্থার কাছ থেকে বড় অংকের তহবিলও আনছেন, তারাই কর্মব্যস্ততার অজুহাতে বিধি প্রণয়নের সভাগুলোতে অংশ নিতে পারছেন না। সরকার বিধি প্রণয়নের জন্য সাব কমিটি করার পর সেখানেও নিজেদের নেতৃত্ব জাহির করতে সদস্য হলেন। আমার মতে তিনি একেবারেই অগ্রাহ্য করার মতো কিছু বলেননি।

 

একটি অপ্রিয় সত্য অনেকের শুনতে খুব খারাপ লাগলেও বলি, নিজে প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হওয়া আর অ-প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কাজ করার মধ্যে উপলব্ধি ও মনের তাগিদের ফারাক যোজন যোজন। বিধি প্রণয়নে গঠিত সাত সদস্য বিশিষ্ট ওয়ার্কিং কমিটিতে যারা রয়েছেন তারা যেমন অ-প্রতিবন্ধী; প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের অগ্রণী নেতৃবৃন্দে যারা রয়েছেন তাদেরও অধিকাংশই অ-প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। তাই প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হবার পরবর্তী যে সমস্ত বঞ্চনা, প্রতিবন্ধকতা এবং বৈষম্য এর প্রতিনিয়ত অভিজ্ঞতা যাদের নেই তাদের কাছে প্রতিবন্ধিতাই বা অগ্রাধিকার থাকবে কেন; নেতৃত্ব, পদ, খ্যাতি – এসব বাদ দিয়ে? এই কমিটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাতে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণ বেশি থাকলে বিধি প্রণয়ণের ব্যাপারে এতটা কালক্ষেপন কখনই হতো না সে ব্যাপারে আমি অন্তত নিশ্চিত।

 

অবস্থাদৃষ্টে এও অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যেও গুটিকয়েক নিজের প্রতিবন্ধিতাকে ব্যবহার করে ব্যক্তিগত অর্জন, প্রভাব ও নেতৃত্ব আঁকড়ে থাকতেই বেশি আগ্রহী। প্রতিবন্ধিতাকে নিজ জীবনে একটি অঙ্গীকার, একটি আহ্বান ও একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে স্বীয় জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এবং সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে কাজ করার তাগিদ তাদের মধ্যে কম। এমনকি প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের জাতীয় পর্যায়ে কোন কোন নেতা নবীন ও উদীয়মান প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পর্কে অন্যদের কাছে এমন নেতিবাচক মনোভাব ও উষ্মা প্রকাশ করেন যে, সে সকল সম্ভাবনাময় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কাজে লাগানোর উৎসাহ অনেক সংস্থাই হারিয়ে ফেলে। আসলে প্রতিবন্ধী মানুষের মাঝে নেতৃত্ব, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার বিকাশ হোক তা না চেয়ে, বরং তারা আজীবন উপকারভোগী হয়েই থাকুক সেটাই অনেকের চাওয়া । এতে ঘুরে-ফিরে হাতেগোনা কয়েকটি চেনামুখ নেতৃত্ব দিয়ে যাবেন, প্রয়োজনে নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করবেন, আবার একত্রিতও হবেন; সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী আর সরকারি-বেসরকারি দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করে অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জীবনকে শুধু জিইয়ে রাখার মতো গতানুগতিক প্রকল্প গ্রহণ করে দাতা সংস্থার অনুদান অব্যাহত রেখে নিজেদের আয়-রোজগার এবং খ্যাতি নিশ্চিত করবেন সেটাই যেন চর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জন্যই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের, বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের, অধিকাংশই এখনও পণ্য ও উপকারভোগী হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

তাই কাগজ-কলমে আর বাস্তবে তাদের জীবনচিত্র মিলে না। এই অচলায়তন থেকে প্রতিবন্ধী মানুষগুলোকে বের হয়ে আসতে হবে; নিজেদের সুদৃপ্ত কন্ঠ উচ্চকিত করতে হবে। আমি মনে করি এক্ষেত্রে অপরাজেয় পত্রিকাটির রয়েছে গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা। শত প্রতিবন্ধকতার মাঝেও অপরাজেয় তার স্পষ্টবাদিতা, সত্য প্রকাশ ও দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিবন্ধী মানুষের কথা, তাদের সংগঠনের কথা অব্যাহত রাখুক; নিজের পথে থাকুক অবিচল – এই কামনা করি।

লেখকঃ নির্বাহী পরিচালক, টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশন,

জোয়ার সাহারা, ঢাকা-১২২৯।