মন্ত্রণালয় ভিত্তিক টানা পোড়েন ও উদ্যোগের অভাবে পিছিয়ে নারী প্রতিবন্ধীগণ

13

সিডো ও নারী নীতি বাস্তবায়নে অ-প্রতিবন্ধী নারীরা উন্নয়নের শীর্ষে;

মন্ত্রণালয় ভিত্তিক টানা পোড়েন ও উদ্যোগের অভাবে পিছিয়ে নারী প্রতিবন্ধীগণ

 

 

শারাবান তোহ্রা সেঁজুতিঃ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বন্ধের কথা বলা হচ্ছে, অ-প্রতিবন্ধী নারীরা আজ উন্নয়নের শীর্ষে উঠে এসেছে কিন্তু তবুও গুরুত্ব পাচ্ছে না প্রতিবন্ধী নারীদের বিষয়টি। ২০১৩ সালে প্রণীত নারী নীতির ৩৯নং ধারাতে প্রতিবন্ধী নারীর অধিকার রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং বিভিন্ন সময় সরকার ও মহিলা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতার আশ্বাস দেয়া হলেও দিন শেষে ফলাফল শূন্য। আর তারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী নারীদের বর্তমান সামাজিক অবস্থানে।

 

১৯৭৯ সালে জাতিসংঘ প্রণীত কনভেনশন অন দ্যা ইলেমিনেশেন অব অল ফর্মস অব ডিসক্রিমিনেশেন এগেইনস্ট ইউমেন – সিডো, জাতীয় নারী নীতি ১৯৯৭, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০, পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন ২০১০ সহ আরো বহু নারী বান্ধব আইন রয়েছে শুধুমাত্র নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করতেই। ১৯৭৫ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হচ্ছে নারী দিবস। কিন্তু এই সমস্ত আইন, সভা সেমিনার বিশেষত সিডোর বাস্তবায়ন অ-প্রতিবন্ধী নারীদের এগিয়ে নিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও এদেশের প্রতিবন্ধী নারীর ভাগ্য পরিবর্তনে কোন ভূমিকা পালনে সক্ষম হয় নি। কেন হয় নি এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু প্রতিবন্ধী নারী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠন (ডিপিও) এর মুখোমুখি হয় অপরাজেয়।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিষয়গুলো সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে হবার ফলে প্রতিবন্ধী নারীদের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে না বলে মনে করছেন এদের কেউ কেউ। তাদের বেশির ভাগেরই অভিযোগ নারী মন্ত্রণালয়ের বেশিরভাগ কার্যক্রমে প্রতিবন্ধী নারীদের সম্পৃক্ততার অভাবই গুরুত্ব না পাওয়ার জন্য মূলত দায়ী।

 

তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১১ সালের নারী নীতি অনুযায়ী ২০১৩ সালে করা এ্যাকশন প্ল্যানে প্রতিবন্ধী নারীর জন্য কিছু উদ্যোগের উল্লেখ্য আছে যা কিনা শুধুমাত্র কাগজে কলমে। নীতি নির্ধারকসহ সংশ্লিষ্ট মহলগুলো মূলধারার নারী আন্দোলনেও তাদের চাহিদা ভিত্তিক প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেন। কিন্তু কার্যত কোন প্রকল্পের উদ্যোগ নেই শুধুমাত্র বিভিন্ন সেমিনারের আমন্ত্রণপত্র ব্যতীত। নারী মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, তাদের অন্যান্য প্রকল্পে প্রতিবন্ধী নারীদের সমন্বয় করতে না পারার মূল কারণ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা। নেই নারী প্রতিবন্ধীদের জন্যে বিশেষ কোন ঋণ ব্যবস্থাও। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ টাকার ঋণ দেয়া হয় যা পরিশোধের ভিত্তিতে পরবর্তীতে যে কেউ চাইলে ২০,০০০ থেকে ১,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ঋণের আবেদন করতে পারেন। কিন্তু এই ঋণ পেতে যেমন বহু চড়াই উৎরাই পার হতে হয় তেমনি অবকাঠামোগত বাধার ফলে অধিকাংশ প্রতিবন্ধী নারীর জন্য তা কষ্টসাধ্যও।

 

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের আওতায় নির্যাতিত মহিলা ও শিশু কল্যাণ তহবিল রয়েছে যেখানে নির্যাতিত নারীদের জন্য আইনি সহায়তা, ডিএনএ পরীক্ষা ইত্যাদি ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস এর মাধ্যমে সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে। আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধী নারীরা প্রতিনিয়ত চরম উপেক্ষা, বৈষম্য ও বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। কিন্তু এক্ষেত্রে কিছু কিছু ঘটনার মামলা হলেও নির্যাতন প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনগুলো প্রতিবন্ধী বান্ধব না হওয়ায় এবং আইনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মামলাগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিষ্পত্তি হচ্ছে না উল্লেখ করে সরকারের এই বিভাগটিকে প্রতিবন্ধী নারীদের বিষয়ে আরো সক্রিয় করার আহ্বান জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী প্রতিবন্ধী উন্নয়ন কর্মী।

 

তিনি মনে করেন, প্রতিবন্ধী নারীর চাহিদার অনেকাংশেই বাস্তবায়ন সম্ভব মহিলা ও শিশু বিযয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় নারীদের জন্য নেয়া কর্মসূচিগুলোর মাধ্যমে। এই কর্মসূচিগুলোতে সঠিকভাবে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব; যেমন নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রয়াস কর্মসূচি ‘জয়িতা’র মাধ্যমে নারীদের উৎপাদিত পণ্যের বিপণন ব্যবস্থার পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। কর্মসংস্থানমূলক কারিগরী ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণের উদ্যোগ রয়েছে- বিউটিফিকেশন ট্রেনিং, মোবাইল সার্ভিসিং ট্রেনিং, দর্জির কাজ, কম্পিউটার ট্রেনিং ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে দুঃস্থ মহিলা উন্নয়ন কর্মসূচি (ভিজিডি), দরিদ্র মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা, কর্মজীবি ল্যাকটেটিং মাদার তহবিল ইত্যাদি। এ সকল সুবিধার আওতায় প্রতিবন্ধী নারীদেরও আনা গেলে তাদের অবস্থার একটি বিরাট পরিবর্তন হতে পারে এমনটি বলছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

 

এদিকে জানা যায়, একমাত্র ‘জয়িতা’ ব্যতীত নারীবান্ধব যত প্রকল্প আছে তার কোনটাতেই প্রতিবন্ধী নারীদের জন্যে কোন উদ্যোগ নেই। এবছর একজন নারী প্রতিবন্ধী শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে ‘জয়িতা’ হিসেবে পুরষ্কৃত হয়েছেন কিন্তু তার এতটা পথ পাড়ি দেয়া একেবারেই সহজ ছিল না। প্রচণ্ড সামাজিক ও পারিবারিক বাধার সম্মুখীন হয়েছেন পদে পদে যার বেশিরভাগই অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা। জয়িতা আকলিমা খাতুন তার নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে জানান যে সব বাধা পেরিয়ে কোন প্রতিবন্ধী নারী যদি চাকরি করতে চান নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী তখন সেটাতেও বাধা। সরকারি চাকরিগুলোতে কোটা আছে প্রতিবন্ধীদের জন্য কিন্তু কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ নেই বললেই চলে। আর প্রতিবন্ধীবান্ধব কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করে শুধুই কোটা রাখা প্রহসনেরই নামান্তর। তাই তার মতে সরকারি চাকুরিতে প্রতিবন্ধীবান্ধব কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে আইনের চেয়ে মানবিক দিকে বেশি প্রাধান্য দেয়া উচিত।

 

জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামে কর্মরত নাজমা আক্তার পপি বলেন, নারী মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী নারীদের একটি স্বতন্ত্র ডেস্ক থাকা চাই যেখান থেকে তাদের জন্যে নেয়া গৃহীত প্রকল্প কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে তা জানা যাবে এবং এক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে একজন নারী প্রতিবন্ধীর সম্পৃক্ততা থাকা আবশ্যকীয়। আমি মনে করি, একমাত্র ভুক্তভোগীই নিজের পরিস্থিতি সম্পর্কে ভাল ধারনা রাখেন। এছাড়া তিনি আরও বলেন সকল সুযোগ সুবিধা কেবলমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক না করে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে দিলে আরো বেশি মানুষ সেবা নিতে পারবে। ধর্ষিত নারী যদি গর্ভবতী হয় তাহলে তার পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার গর্ভকালীন ভাতা দিতে পারেন।

 

অগ্রপথিক সংগঠনের শ্যামলী জানাচ্ছিলেন, প্রতিবন্ধী নারীরা ঘরের ভিতরে ও বাইরে নানা নির্যাতনের শিকার হন যার বিচার পাওয়া প্রায়শই অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। কোন প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষিত হলে পরিবারের সম্মান ও সমাজের ভয়ে কিছু প্রকাশ করতে চায় না। আর সেই মেয়েটিই যদি বাক বা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী হয় তার পক্ষে নিজে থেকে বিচার চাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ কারণেই তাদের অধিকার রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সকলের ইশারা ভাষায় দক্ষ হওয়া প্রয়োজন। আর এইসবের বাস্তবায়নে প্রতিক্ষেত্রে চাই নারী প্রতিবন্ধীদের জন্য যুগোপযোগী সহায়ক আইন এবং তার প্রয়োগ। সর্বোপরি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী বদলানো অপরিহার্য।

 

নারী উন্নয়ন কর্মীদের অনেকেই মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী নারীর বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার জোর দাবী জানিয়ে আসছে অনেক দিন ধরেই। তন্মধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর এক নারী উন্নয়ন কর্মী বলেন, বারে বারে প্রথম সারির নারী নেত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সত্বেও কাজ হচ্ছে না। যাদের মাধ্যমে আমাদের এই দাবীগুলো নীতি নির্ধারণী মহলে পৌঁছাবে সেই নারী অধিকার আন্দোলনের মূল প্ল্যাটফর্মে আমাদের বিষয়গুলো স্থান পাচ্ছে না বলেই এমনটি হচ্ছে। তাই নারী প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংগঠন (ডিপিও) সমূহের আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন অপরিহার্য এমনটিই মনে করছেন সংশ্লিষ্টগণ।