আমাদের সিদ্ধান্ত আমরাই নিতে চাই

 

দেশের বেশিরভাগ মানুষের প্রচলিত ধারণা প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিজেদের কাজটুকুই নিজেরা করতে পারে না। তারা বেঁচে থাকার জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল। আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের প্রশ্নই উঠে না। ফলে অপ্রতিবন্ধী মানুষেরা নিয়ন্ত্রণ করছে প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন। স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নিজের উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণে চর্চার সুযোগ প্রতিবন্ধী মানুষের নেই। অথচ জনগোষ্ঠীর স্বাধীন মতপ্রকাশ ও দাবি উপস্থাপিত হয় প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে। কিন্তু মোট জনসংখ্যার শতকরা ১০ ভাগ প্রতিবন্ধী মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতিনিধিত্ব সমাজ বা রাষ্ট্রের কোথাও দেখা যায় না। এমনকি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন বা সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে তাদের অংশগ্রহণ নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় প্রয়োজনীয় হয় না। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকদের দাবি উপস্থাপিত হয় প্রতিনিধিদের দ্বারা। তাই প্রতিনিধিত্ব যে কোন জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়নের প্রথম ধাপ। প্রতিবন্ধী জনগণের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি কখনো আলোচনায় আসেনি।

 

দেশে প্রতিবন্ধী মানুষদেরকে স্বীকৃতি দিয়ে প্রথম আইন ‘বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১’ পাশ হয়। এই আইনের আওতায় ২০০৩ সালে জাতীয় সমন্বয় কমিটি, নির্বাহী কমিটিসহ সকল জেলায় প্রতিবন্ধী কল্যাণ কমিটি করা হয়। এইসব কমিটিতে প্রতিবন্ধী জনগণের পক্ষে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রতিনিধিত্ব করতে পারেনি। ব্যতিক্রম দুই-একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই সব কমিটির সদস্য হতে পেরেছেন। অর্থাৎ প্রতিবন্ধী মানুষ স্বীয় অধিকার, চাহিদা এবং বৈষম্য বিরোধী দাবিগুলো তুলে ধরতে পারেনি। তাই শত বছরের ধারাবাহিকতায় অপ্রতিবন্ধী মানুষের দ্বারা তাদের জীবন ও অধিকার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত। গত এক দশকে এইসব কমিটি বহুবার পরিবর্তিত হলেও এ প্রথার কোন পরিবর্তন নেই। এমনকি এই সময় পর্যন্ত প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নের জন্য সবকিছুই মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে করা হয়।

 

জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সনদের (সিআরপিডি) কারণে বিশ্বজুড়ে প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও উন্নয়ন দর্শনে ঘটেছে যুগান্তকারী পরিবর্তন। আমাদের দেশেও এই সনদের আলোকে প্রণীত হয়েছে নতুন আইন-‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’। এই আইনে প্রতিবন্ধিতার অর্থ যেকোন কারণে ঘটিত দীর্ঘস্থায়ী বা স্থায়ীভাবে কোন ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্থতা বা প্রতিকূলতা এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারস্পারিক প্রভাব, যাহার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার সাথে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধা প্রাপ্ত হন। এই প্রথম প্রতিবন্ধিতাকে সজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে সামাজিক এবং পরিবেশগত বাধার বিষয় গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হল। অতীতের বিচ্ছিন্নতার ধারণা পাল্টে ঘোষিত হল, সমাজের সকল কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য একীভূত সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়। সম্প্রতি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এই আইনের আওতায় জেলা কমিটিসহ বিভিন্ন কমিটি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু এই কমিটিগুলোতে প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণের বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা বাধ্যবাধকতা নেই। বেশকিছু জেলায় ইতিমধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার সংক্রান্ত জেলা কমিটির বেসরকারি সদস্য হিসেবে যাদের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে, তার সবই অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি।

 

প্রতিবন্ধী মানুষের তাই সরকারের কাছে প্রশ্ন, অধিকার ভিত্তিক আইনে তার প্রতিনিধিত্বের অধিকার কোথায়? আমরা কি কেউ ভাবতে শিখেছি, নারীর প্রতিনিধিত্ব পুরুষ করতে পারে। তবে প্রতিবন্ধী জনগণের প্রতিনিধিত্ব কিভাবে অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা করতে পারে। তবে এটা আমরা স্বীকার করি যে, যেসব প্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্বীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না, যেমন গুরুতর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষ, তাদের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তাদের বাবা-মা প্রতিনিধিত্বের সুযোগ রাখে। এছাড়াও সরকারের আন্তমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে সিআরপিডি মনিটরিং কমিটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা তাদের সংগঠনের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই। এমনকি জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আওতায় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত স্টিয়ারিং কমিটি বেসরকারি প্রতিনিধির মধ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অংশগ্রহণ নেই।

 

সিআরপিডি বাস্তবায়নের প্রেক্ষাপটে গত দুই বছর থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রথাগত অবস্থান পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। সমাজসেবা অধিদফতরের আওতায় প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ প্রকল্পের বাস্তবায়ন কমিটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর বিধি প্রণয়নে চলতি বছরে একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। এই কমিটিতে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেশে প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি স্বীকৃতি পেয়েছে নারী অধিকার প্রসংঙ্গে। সংসদ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত সকল স্তরে নারীর অংশগ্রহণ সংরক্ষিত আসন নীতিমালার কারণে ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। সামাজিক প্রতিষ্ঠানসহ সকল ক্ষেত্রে নারীদের প্রতিনিধিত্ব সংরক্ষণ নিশ্চিত করার বিষয়টি বাস্তবায়নাধীন। এই সাফল্য এদেশের বৈষম্য পীড়িত বিশেষত প্রতিবন্ধী মানুষ তাদের প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংরক্ষণ নীতির দাবিতে সোচ্চার। কারণ রাষ্ট্র ও সমাজের কোন স্তরে তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই।

 

প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে একীভূত সমাজ গঠন অপরিহার্য। একীভূত সমাজ গঠনে প্রয়োজন সমাজের সকল সংরক্ষণ প্রতিবন্ধী মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। নতুন আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে একীভূত সমাজ গঠনের প্রথম পদক্ষেপ এই আইনের সকল কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অংশগ্রহণ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা। অন্যথায় এই আইন প্রতিবন্ধী মানুষদের কাছে পরিহাসের দলিল হিসেবেই বিবেচিত হবে। তাই অবিলম্বে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট তিন দফা দাবি বাস্তবায়ন অপরিহার্য-

 

১. প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এ উল্লেখিত সকল কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষদের এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। 

২. প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নে গৃহীত প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি ও তাদের অধিকার বিষয়ক বিভিন্ন নীতি সংশ্লিষ্ট কমিটিসহ সকল স্তরে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

৩. নতুন আইনের বিধিতে উল্লেখিত বেসরকারি সদস্য হিসেবে পুরুষ ও নারী প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী পুরুষ ও নারীর জন্য সংরক্ষণের জন্য সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

 

চলতি সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে প্রতিবন্ধী নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে বর্তমান সরকার যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি বিশেষ সংবেদনশীল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার

 

নেতৃত্বেই প্রণীত হয়েছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ ও নিউরো ডেভেলেপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাষ্ট আইন ২০১৩ সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নীতি ও নির্দেশনা। প্রতিবন্ধী মানুষদের দৃঢ় বিশ্বাস, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে সরকারের সকল উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন কমিটিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনের প্রতিনিধিকে অন্তর্ভূক্ত করার প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের দাবি যৌক্তিক ভাবেই বিবেচনা করবেন।

 

প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি)

বাড়ি-৫২৭, রোড-১২, বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটি, শ্যামলী, ঢাকা।