কুমিল্লা জিরো ক্লাবফুট ক্লিনিক; দুঃস্বপ্নের বেড়া জালে আলোর হাতছানি

16

সময়টা ২০১৪ সালের ১৪ই মে। অন্য দশটা নারীর মতো শিউলীর জীবনেরও আকাক্সিক্ষত একটি দিন। তিনি দ্বিতীয় বারের মতো মা হতে চলেছেন। ভূমিষ্ট সন্তানের মুখ দেখার আশায় মনে উঁকি দিচ্ছে নানা জল্পনা-কল্পনা। অবশেষে নোয়াখালী জেলার চাটখিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাভাবিক প্রসব প্রক্রিয়ায় কন্যা সন্তানের জননী হলেন তিনি। প্রসবের পর নবজাতকের পায়ের দিকে নজর গেল এক স্বজনের, একটি পা কেমন যেন একটু বাঁকা মনে হচ্ছে। তখন তারা ভেবেছিলেন, মাত্র ডেলিভারী হয়েছে হয়তো তাই এই অবস্থা, পরে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দেখা গেলো বেড়ে উঠার পরেও পায়ের অবস্থানটার পরিবর্তন হচ্ছে না তখনই মা শিউলী ও খালাদের মনে আধাঁর নেমে এলো। নিরুপায় হয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হয়ে জানতে পারলেন শিশুটি ক্লাবফুটের সম্মুখীন।

 
প্রথম সন্তান কন্যা! তার উপর দ্বিতীয়জনও কন্যা, তাও আবার তার পায়ের পাতা বাঁকা। জীবন ধারনের ব্যয়ভার সামলাতে যেখানে বোন, মামা-খালাদের সহযোগিতাই সম্বল সেখানে এধরণের রোগের চিকিৎসা কোথায় হয় বা চিকিৎসার জন্য কত টাকা লাগতে পারে সম্পূর্ণ অজানা তার। মেয়ের সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা কথা ভেবে ভেবে শিউলীর সুখগুলো যেন কোথায় একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছিল। হাসপাতালে তার বেদনার বহিঃপ্রকাশে চোখের জল তার একমাত্র সঙ্গী। বোনদের সান্ত্বনাও যেন তাকে শান্ত করতে পারছিল না। বার বার মনে হচ্ছিল কেন এমন হলো! কারণ, পরপর দুটি কন্যা জন্ম দেয়ার অপরাধে ঢাকায় থাকা রিক্সাচালক স্বামী হান্নান সন্তান ভূমিষ্ঠ হবার সংবাদটুকু পেয়েও একবারের জন্যেও সন্তানের মুখ দেখতে আসেন নি। সন্তানের পায়ের কথা জানানোর পর তিনি জানান, ‘কি আর করবা, আল্লায় যহন দিছে এইভাবেই থাকুক’।

 

অবশেষে স্বামীর এই অবহেলার হাত থেকে বাঁচতে ঠাঁই নেয় বাবার বাড়িতে। একদিকে স্বামীর অবজ্ঞা অন্যদিকে সন্তানের জন্মগত ত্র“টি- শিউলী আক্তার প্রবেশ করেছেন দুঃশ্চিন্তার আরেক নতুন জগতে। বাবার সংসারে ঠাঁই নেয়া শিউলির ভাবনার কুল কিনারা নেই । আর্থিক অনটনের পাশাপাশি সন্তানের ক্লাবফুট তাকে কিছুটা ভারসাম্যহীন করে তুলেছিল। তবুও শিউলি আশা ছাড়েন নি, স্বপ্ন দেখেন তার সন্তানও একদিন সুস্থ হয়ে উঠবে, অন্যান্য সবার মতো হেসে খেলে বেড়াবে। কিন্তু হতাশার বেড়াজালে সে আশাও যখন কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে উঠছিল তখন হঠাৎ কুমিল্লার মামা সম্পর্কের এক নিকট আত্মীয় তাকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে, চিন্তা করো না, আমার সন্তানের পায়ে এই সমস্যা হবার সাথে সাথেই আমি তাকে লায়ন মোখলেছুর রহমান ফাউন্ডেশনের জিরো ক্লাবফুট ক্লিনিকে বিনামূল্যে চিকিৎসা করিয়েছি। সে এখন মোটামুটি সুস্থ। ক্লাবফুটের সমস্যা ধরা পড়ার পর যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায় সুস্থ হবার সম্ভাবনা তত বেড়ে যায়। অবশেষে শিউলি সন্তানকে নিয়ে কুমিল্লা মেডিকেলের জিরো ক্লাবফুট ক্লিনিকে নিয়ে এলেন। এসে দেখলেন, এ সমস্যার সম্মুখীন শুধু তার সন্তান হালিমা একা নয়। আরো অনেকেই আছে তার সন্তানের মত যারা সেখানে চিকিৎসাধীন বা চিকিৎসা নিতে এসেছেন। শিউলি যেন খুঁজে পেলেন সন্তানের সুচিকিৎসার এক নিরাপদ ঠিকানা। সকল দুর্ভাবনার ভিড়ে সন্তানের স্বাভাবিক জীবনের আশ্বাস শিউলিকে আবারও স্বপ্নপ্রেমী করেছে।

সুমিত বণিক
প্রোগ্রাম ম্যানেজার,
কুমিল্লা লায়ন মোখলেছুর রহমান ফাউন্ডেশন।