টাইপ রাইটার আর্টিস্ট: পল স্মিথ

42

শারমিন রহমান নিয়ন

 

বিশ্বজুড়ে তার পরিচয় টাইপ রাইটার আর্টিস্ট হিসেবে। তবে  ¯পাস্টিক সেরিব্রাল পালসির সম্মুখীন হবার কারণে তার কথা, হাঁটা এবং অন্যান্য দৈনন্দিন কার্যক্রমে বাধাগ্রস্ত হতেন। পল আমেরিকার ফিলাডেলফিয়াতে, ২১শে সেপ্টেম্বর ১৯২১ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। ডাক্তাররা ভেবেছিলেন তিনি বেশিদিন বাঁচবেন না। তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে তিনি দীর্ঘ পঁচাশি বছরের জীবন অতিবাহিত করে ২৫ জুন, ২০০৭ সালে পরলোক গমন করেন। পল স্মিথের পঁচাশি বছরের সময়ের মধ্যে সত্তর বছর ধরে টাইপ রাইটার আর্টের মাধ্যমে তাঁর সৃজনশীলতায় সবাইকে মুগ্ধ এবং অনুপ্রাণিত করেন।

 

পল স্মিথের জীবন শুরুর সে সময়ে সেরিব্রাল পালসি (সিপি)র সম্মুখীন ব্যক্তিদের জন্য সীমিত সুযোগ সুবিধা ছিল ফলে তিনি মূলধারার শিক্ষা গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হন, এমন কি ছোটবেলায় লেখাপড়াই শেখানো হয়নি তাকে। তখনকার দিনে চিকিৎসা ব্যবস্থা এতটা উন্নত ছিলনা। ডাক্তাররা পরামর্শ দিতেন গুরুতর মাত্রার ¯পাস্টিক সিপি শিশুদের ইন্সটিটিউশনালাইজড করে রাখতে, যদিও পল তার পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। নিজে নিজে খাওয়া, কাপড় পড়া, কলম পেনসিল হাতে ধরা ইত্যাদি কাজ, এমন কি মনের ভাবনা প্রকাশ করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়তো। তবুও তার উদ্যমতা, ইচ্ছাশক্তি এবং চেষ্টার ফলে যোলো বছর সময় নিয়ে কথা শিখেছেন, বত্রিশ বছরে হাঁটতে শিখেছেন।

 

পলের যখন এগারো বছর বয়স তখন তার টাইপ রাইটার আর্টের আগ্রহ জাগে। প্রতিবেশীর একটি বাতিল করা টাইপ রাইটার দিয়ে তিনি কাজ শুরু করে দেন। একে নিজের ভাবনাগুলো প্রকাশ করতে পারতেন না, তার ওপর লেখা বা আঁকার জন্য পেনসিল, কলম,  ব্রাশ, মার্কার, প্যাস্টেল, কালার ইত্যাদি হাত দিয়ে ভালভাবে ধরতে পারতেন না, তাই টাইপ রাইটারটি তার মনের সুপ্ত ভাবনাগুলোকে প্রকাশ করার অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছিল।

 

 

পল তার ছবির মাধ্যমে নানান বিষয় তুলে ধরেছেন। প্রাণী, স্থির চিত্র (স্টিল ফটোগ্রাফি), প্রাকৃতিক দৃশ্য, যুদ্ধের দৃশ্য, আধ্যাত্মিক চিহ্ন ও বাইরের দৃশ্য আঁকতে বেশি পছন্দ করতেন। ট্রেনের সাথে নিজের শৈশবের স্মৃতি বিজড়িত মোহ, কাঠবিড়ালীর সাথে বন্ধুত্বের অনুরাগ ইত্যাদি বিষয়গুলো প্রতিফলিত হয় তার চিত্র কর্মে। বিশ্ববিখ্যাত আধ্যাত্মিক নেতাদের প্রতিকৃতি যেমন- পোপ, যীশুখ্রীষ্ট, মাদার তেরেসা এবং যুদ্ধ দৃশ্যে দেশের বিভিন্ন বীর পুরুষের ছবি আঁকতেন। সুপরিচিত ও প্রশংসিত শিল্প কর্মের ছবির নিখুঁত প্রতিলিপিও আঁকতেন তিনি। যেমন- লিওনার্ডো দা ভিঞ্চির ‘মোনালিসা’, আগস্টো রোডিনের ‘দ্যা থিংকার’ এবং ‘ওয়াশিংটন ক্রসিং দ্যা ডেলওয়ার’ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

পলের চিত্রকর্মের বিষয়গুলো অসাধারণ কিছু না হলেও টাইপ রাইটারের উপরের সারির মাত্র কয়েকটি চিহ্নের দক্ষ ব্যবহার দ্বারা বিদ্যমান কাজের নিখুঁত প্রতিলিপি এবং আশেপাশের পরিবেশের উদ্ভাবনীয় উপস্থাপন তার চিত্রকর্মকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়, সেই সাথে অসাধারণ। চিত্রকর্মের ধরণ অনুযায়ী এক একটি কাজ শেষ করতে দুই সপ্তাহ থেকে তিনমাস সময় লেগে যেত। কাজ শেষে ছবির নিচে টাইপ করে নাম সই করতেন। প্রতিদিন কয়েক ঘন্টা কাজের পর অক্লান্ত পরিশ্রমের সেই কাজগুলো বিনামূল্যে দিয়ে দিতেন সবাইকে। অসাধারণ স্বতন্ত্রমূলক এই আর্ট ফরম দেখে মানুষের মাঝে আগ্রহ জন্মাল। ধীরে ধীরে তার চিত্রকর্মের চাহিদা বাড়তে লাগল। তিনি বিশ্বাস করতেন তার এই প্রতিভা ঈশ্বর প্রদত্ত একটি বিশেষ উপহার। পুরো বিষয়টি সাধনার মত ছিল তার কাছে। শিল্প জগতে তিনি অন্যান্য টাইপ রইটার চিত্রশিল্পীদের জন্য এক উচ্চতর স্থান তৈরি করে গেছেন যা খুব কম শিল্পী অতিক্রম করতে পেরেছেন।

 

 

 

 

দীর্ঘ জীবনে পলের প্রায় চারশর বেশি চিত্রকর্ম রয়েছে যা যুগ যুগ ধরে চিত্রশিল্পীদের অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছে, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মানুষদের। প্রায় দেখা যায় যে প্রতিভাবান শিল্পীরা জীবদ্দশায় তাদের কাজের স্বীকৃতি পান না। পলের বেলায় এমনটি হয়নি, তিনি তার জীবদ্দশায় যথেষ্ট সম্মান ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। ১৯৩০ দশকের মধ্য ভাগে যখন পল তার টাইপ রাইটার দিয়ে কাজ শুরু করেন তখনকার চেয়ে বর্তমান যুগের প্রতিবন্ধী শিল্পীরা আরো উন্নত উপায়ে আঁকছেন। শুধু যা বদলায় নি তা হল তাদের উদ্যম ও ইচ্ছাশক্তি যা দক্ষতা অর্জন এবং ভালভাবে কাজ সম্পন্ন করার জন্য অতি প্রয়োজনীয়। পলের কাজ প্রমাণ করে দেয় ধৈর্য ও চেষ্টা থাকলে অসম্ভবকে সম্ভব করে যে কোনকিছ্ইূ অর্জন করা যায়। যার জন্য আজও আমরা তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।