প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়কঃ বাস্তবতার আলোকে ভবিষ্যৎ সমাধান

সৈয়দ জাভেদ আলী

 

কিছুদিন আগে বিদেশি স্যাটেলাইট চ্যানেলের এক অনুষ্ঠানে প্রদর্শিত সেরিব্রাল পালসির সম্মুখীন একটি ছেলের স্কুল থেকে ফেরার দৃশ্য আমাকে আমার এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি পরীক্ষার দিনগুলো মনে করিয়ে দেয়ার সাথে সাথে একটি প্রশ্নেরও উদয় ঘটাল। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল একটি দেশে প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থার অবস্থা কি?

 

মুহূর্তেই ফিরি অতীতের সোনালী স্মৃতির আকাশ থেকে কঠিন বাস্তবতার ভূমিতে। আর বাস্তবতা হল, পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়ক, গণপরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকলেও তা নেই আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে। আমার পরীক্ষার সময় পাঁচতলা বাসা থেকে পাজাকোলে আমাকে নিয়ে রাস্তায় নেমে বাবা মায়ের সে কি কষ্ট বাস, সিএনজি বা রিকশা খুঁজে নিতে! কোনভাবে আমরা বসলেও হুইলচেয়ার সেখানে জায়গা করাও কম ঝামেলা নয়। অথচ ভিনদেশি সেই ছেলে কি সুন্দরভাবেই না হুইলচেয়ার নিয়ে সহজে বাসে উঠে চলে গেলো!

 

আমাদের দেশে প্রবেশগম্যতার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট উদ্যোগ দেখা গেছে, যেমনঃ মিরপুর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ টি-টোয়েন্টি’১৪ তে প্রতিবন্ধী দর্শকদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি ডিজেবিলিটি এক্সেস টিকেটের ব্যবস্থা করা, সিদ্ধেশ্বরীতে একটি স্কুলে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ম্যানুয়েল লিফট ও র‌্যাম্পের ব্যবস্থা, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি গণস্থাপনাতে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু আজ এতদিন পরেও যাতায়াত ব্যবস্থা প্রতিবন্ধীবান্ধবের ফলপ্রসূ ও কার্যকরী কোন উপলব্ধি, ভাবনা কিংবা উদ্যোগ ব্যক্তিগত বা সাংগঠনিক পর্যায়েও তেমনভাবে পরিলক্ষিত হয়নি। ২০১১ সালের আদমশুমারি মতে, ৫৫,৫৯৯ বর্গমাইলের এই দেশের জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ জন  এরমধ্যে, পুরুষ জনসংখ্যা ৭,৪০,৮০,৩৮৬ জন ও মহিলা জনসংখ্যা ৭,৪৭,৯১,৯৭৮ জন।

 

রোডস এন্ড হাইওয়ের তথ্য অনুসারে এই বিপুল জনগণের বিপরীতে আছে জাতীয় মহাসড়ক ৩৫৪৪.০৬ কি.মি., আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪২৭৮.০৭ কি.মি., জেলা সড়ক ১৩,৬৫৯.১৩ কি.মি. আর মোট সড়ক দৈর্ঘ্য ২১,৪৮১.২৫ কিলোমিটার। রয়েছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, বঙ্গবন্ধু সেতুর ন্যায় ১২৭.৮৯ কি.মি. দৈর্ঘ্যের ৪,৫০৭টি সেতু, ৩৮.২৮কি.মি. দৈর্ঘ্যের ১৩,৭৫১টি কালভার্ট। মহাখালী, খিলগাঁও, শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার, কুড়িল ও মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ইত্যাদি ফ্লাইওভারও আছে। ২,৮৭৭কি.মি দৈর্ঘ্যের রেল, যার মধ্যে ব্রডগেজ ৬৫৯ কি.মি., মিটারগেজ ১৮৪৩কি.মি., ডুয়েলগেজ ৩৭৫কি.মি। পাশাপাশি ১৮৯টি জলযান (১৪১টি বাণিজ্যিক ও ৫৩টি সহায়ক জলযান), ৬০টি ফেরিঘাট ও ১৫৩টি ফেরিযান সমৃদ্ধ নৌ ও ১২টি (৩টি আন্তর্জাতিক, ৭টি অভ্যন্তরীণ) এবং ২টি স্টল পোর্ট বিমানবন্দর, বাংলাদেশ বিমানের ১৩টি উড়োজাহাজ (১টি বি ৭৪৭-৪০০; ২টি৭৭৭-৩০০ইআর; ৪টি ডিসি১০-১৩-৩০; ২টি বি৭৩৭- ৮০০এবং একটি এফ-২৮) সহ বেসরকারি বহু উড়োজাহাজ সমৃদ্ধ বিমান পরিবহন ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি একমাত্র আন্তর্জাতিক কিছু বিমান ছাড়া এদেশে কোন যানবাহনই প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়, হোক তা সড়ক বা নৌপথ। নেই প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য মানসম্মত যাত্রী সেবা। ২০১১ সালে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ১.৪%। এই কয়েক বছরে যা বেড়েছে বহুগুণ, যা বর্তমানে আনুমানিক ১.৬ কোটি। এর মাঝে পিপিআরসি’র এক গবেষণা মতে বাস স্ট্যান্ড, রোড সাইড, বাজার ইত্যাদি স্থানে সংঘটিত সড়ক দুর্ঘটনায় বার্ষিক ১৩% মানুষ শারীরিক প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হয়ে পড়েন, এদের অধিকাংশ কর্ম অক্ষম হয়ে বরণ করেন দারিদ্রতার অভিশাপ। ফলাফলঃ ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের সংখ্যা। অন্যদিকে ১.২৪ কোটি লোক মৃত্যুবরণ করেন ফি বছর।

 

 

১৯৭২ সালের সংবিধানের ৩৬নং অনুচ্ছেদে প্রদত্ত “উন্মুক্ত চলাচলের স্বাধীনতা” অধিকার নিশ্চিতকল্পে মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩তে প্রতিবন্ধী মানুষের সড়ক ও স্থাপনায় বাধামুক্ত চলাফেরার ব্যবস্থা রাখার নির্দেশ রয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ ট্রাফিক আইন ও নিয়মাবলী এবং সড়ক ও গণপরিবহন আইন ২০১৩ বিদ্যমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাস্তবতা হল এর একটিরও কঠোর অনুসরণ আজও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ক্রমশ দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়েই চলেছে এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়ক নিশ্চিতকরণ সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু যদি যুগোপযোগীভাবে আইনসমূহের সংশোধন এবং যথার্থ ও কঠোর অনুসরণ নিশ্চিত হলে অসম্ভবও সম্ভব হবে। আর যেসব আইনের বিধিমালা এখনো প্রণয়ন হয়নি যত দ্রুত সম্ভব প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও কঠোর অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের জন্য আইন সমূহের প্রতিপালন ও অনুসরণ বাধ্যতামূলক করতে কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা নেয়া অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে সর্বত্র, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে গণপরিবহন ও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও সুরক্ষা স¤পর্কিত সকল আইনের প্রচারের ভুমিকা অনস্বীকার্য।

 

 

বর্তমানে পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্সধারী চালক সংখ্যা প্রায় ৮০%। এ সংখ্যা হ্রাস করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়। পাশাপাশি গণপরিবহনের ফিটনেস নিশ্চিতকল্পে আইন প্রয়োগের মাধ্যমে যথার্থ ব্যবস্থা নিতে হবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে, নিশ্চিত করতে হবে নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা। ফলে লাঘব হবে জনদুর্ভোগ এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়ক সংক্রান্ত  অন্যতম সমস্যা ও বাধার সুষ্ঠু সমাধানও হবে এমনটি মনে করছেন বাস ট্রাক মালিক সমিতির চেয়ারম্যান। অপরদিকে গ্রাম ও শহরে বসবাসকারী প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় গণপরিবহন, যাত্রী সেবা, সুপরিকল্পিত প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়ক নির্মাণ ও সড়ক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন সংশ্লিষ্ট ও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার উন্নয়ন ও সুরক্ষা নিয়ে কাজ করে এমন ব্যক্তি ও সংগঠনগুলোকে এ বিষয়ক যথার্থ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল সৃষ্টিকরণ, সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি ও পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থাকরণ, প্রতিবন্ধী মানুষের সড়ক ও স্থাপনায় প্রবেশগম্যতা ইত্যাদি নিশ্চিত করার পক্ষে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তা ব্যক্তিরা। তাদের মতে, সুপরিকল্পিত নগরায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

 

প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়ক নিশ্চিতকল্পে আইনের কঠোর অনুসরণের জন্য প্রয়োজনীয় সচেতনতা সৃষ্টিতে মূল বাধা নিরক্ষরতা। দেশের উন্নতির জন্যে প্রথমেই নিরক্ষরতার হার কমাতে হবে। এ লক্ষ্যে বিশেষত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে উচ্চতর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা চালু, প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রাইমারি স্কুল পর্যায় থেকেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পাঠ দান অপরিহার্য। গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত প্রতিবন্ধী সম্প্রদায়ের দোরগোড়ায় অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি তথা ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে হবে। মোটকথা, প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়ক নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সমস্যার সমাধান করতে হবে। এজন্য দরকার সুষ্ঠু, কার্যকরী ও সুদূরপ্রসারী  পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও যথার্থ প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবলের।

 

প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী দেশ বা জাতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের বাদ দিয়ে কোন জাতির উন্নয়ন অসম্ভব। তাদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হলে সরকার ঘোষিত ভিশন ২০২১ এর সফলতা ও একটি উন্নত রাষ্ট্রের সোনালী স্বপ্নপূরণ কখনোই সম্ভব হবে না এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব সড়ক ও গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সরকার, রাজনৈতিক দল, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহ, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, প্রতিষ্ঠান তথা দেশ ও প্রবাসী প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক ভূমিকা এক্ষেত্রে অনস্বীকার্য।