প্রতিবন্ধী সহপাঠীর প্রতি আমার আচরণ-কর্তব্যবোধ

19

 

তাসমিয়া ইসলাম

 

সবুজাভ বৃক্ষরাশির ফাঁকে মৃদু মন্দ বাতাস। পাখপাখালীর কিচির মিচির। অতৃপ্ত মন চায় শাসনহীন স্বাধীন আনন্দে ছুটে বেড়াই দিগিদিক। অপরূপ সৌন্দর্যের এই সমারোহে আমি যখন মুগ্ধ-বিস্মিত, অনুভব করি ওদের। যারা সান্ত্বনা খুঁজে অন্তরে, অনুভবে।

 

অপরূপ সবুজের সমারোহ ছুঁতে পারে না যাদের দৃষ্টিকে। দিক ছুটে বেড়াতে গেলেই কোথায় যেন বাধা। নানারকম প্রতিকূলতাকে জয় করে বাঁচে যারা। হতাশায় নিমজ্জিত আঁধারে হাতড়ে বেড়ায় সুদৃঢ় ভবিষ্যতের স্বপ্নচাবি। তারা আর কেউ নয় আমাদের আশেপাশে থাকা দৃষ্টি শক্তি হারানো বন্ধু, বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়া মানুষ, অবুঝ হয়ে বেড়ে ওঠা ভাই-বোন কিংবা আমারই সহপাঠী। করুণা নয় চায় উৎসাহ, ভালবাসা আর আর দশজনের মতোন জীবন যাপনের অধিকার। যা পেলে তারাও রাখতে পারে সমাজ ও জাতির জন্য অবদান।

 

বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণেই প্রতিবন্ধী মানুষেরা পিছিয়ে আছে। তাই বলে কি সামনের দিকে এগিয়ে যেতে মানা!?

 

আমার সহপাঠীও হতে পারে একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে একজন অ-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হিসেবে আমার করণীয় অনেক কিছুই থেকে যায়। দায়বদ্ধতা এড়ানো হয়ে পড়ে দুষ্কর। তাই তো, নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে তার প্রতিটি প্রয়োজনে। মনে রাখতে হবে- “সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।”

 

বিদ্যালয় যেন এক শিক্ষাদানকারী মা। আর শিক্ষার্থী হল এর সন্তান। এখানে থাকে না কোন ভেদাভেদ, থাকে না কোন প্রতিবন্ধকতা। আমার মত আমার প্রতিবন্ধী সহপাঠীটিও বিদ্যালয়ের সন্তান। স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালবাসা পারে পৃথিবীকে নতুন করে সাজাতে। সে অনুপ্রেরণায় সবসময় নিজেকে উদ্বুদ্ধ করে প্রতিবন্ধী সহপাঠীকে ভালবাসা পূর্ণ আচরণের মাধ্যমে কাছে টেনে নেয়া আমার প্রধান কর্তব্য। বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে তাকে হতাশার আঁধার থেকে আলোর পথ দেখাতে হবে। পথ চলতে গিয়ে সম্মুখীন হতে পারে নানান সমস্যার। হাতে হাত রেখে সাহস যোগাতে হবে। নির্ভীক এক সাহসী যোদ্ধার প্রতিমূর্তি তুলে ধরে তার মাঝে বিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে, চাইলে তারাও পারে। ‘এক বার না পারিলে দেখ শতবার’- সহাস্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত কিংবা প্রাণবন্ত উৎসাহ যোগাতে হবে তার হৃদয়ে। সফলতার চাবি- ‘শিক্ষার আলো’য় আলোকিত হবার সর্বাত্মক চেষ্টার অনুপ্রেরণা দিতে হবে তাকে।

 

প্রতিভা- এমন একটি শব্দ যার প্রকাশ ‘কখন? কীভাবে? কে করবে?’- শব্দগুলো দিয়ে যাচাই করা সম্ভব না। মানুষ যা করতে পারে সেটাই তার প্রতিভা। কিন্তু সময় ও সুযোগের অভাবে হারিয়ে যায় প্রতিভাবান মানুষেরা। তাদের ধরে রাখা আমাদেরই কর্তব্য। আর আমার প্রতিবন্ধী বন্ধুটি যদি তেমনি একজন প্রতিভাবান মানুষ হয় তাহলে সেক্ষেত্রে কর্তব্যের ভার অনেক বেশি। স্বল্প হোক তবুও, আমার একটু প্রচেষ্টা হয়তো পারে তার প্রতিভার বহিঃপ্রকাশে সাহায্য করতে। আর তাই তো, একজন বন্ধু হিসেবে শিক্ষাঙ্গনের প্রতিটি সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তার অংশগ্রহণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আমার অন্যতম দায়িত্ব। এছাড়া শিক্ষাঙ্গনে তার চলাচলের প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূরীকরণে কাজ করতে পারি আমরা অ-প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীগণ। প্রয়োজনে শিক্ষকের সাহায্য নিতে পারি। পড়ালেখায় সর্বাধিক সহযোগিতা করা উচিৎ আমাদের। যেন তারা আর দশজনের মতই মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে।

 

যুগ পাল্টেছে। সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু এখনো প্রতিবন্ধী মানুষকে বোবা, কানা, খোড়া ইত্যাদি সম্বোধনে উপহাস করা হয় যা সবচেয়ে নিচুমনের পরিচায়ক। প্রতিবন্ধী সহপাঠীকে তার প্রতিবন্ধিতা নিয়ে কখনোই উপহাস করা উচিৎ নয়। তার আÍসম্মানে আঘাত বা অপমানিত না করে বরং উদার মানসিকতায় তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ সহজ করা আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য।

 

মানুষকে নিয়েই সমাজ। সমাজবিহীন পৃথিবীতে বসবাস অসম্ভব। তাহলে, প্রতিবন্ধী মানুষেরা কীভাবে সমাজবিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকতে পারবে? কিন্তু পারিবারিক ও সামাজিক নানান প্রতিবন্ধকতা তাদের আটকে দেয় পদে পদে। হীনমন্যতা তাদের কুক্ষিগত করে রাখে। একজন সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের দায়বদ্ধতার জায়গাটা অনেক বড়। সেই জায়গায় থেকেই প্রতিবন্ধী সহপাঠীদের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করে তাদের উন্নত জীবনের পথ দেখানো এবং সক্ষম হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করা আমার জীবনের অনন্য কর্তব্য। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে হারিয়ে তারাও একদিন হয়ে উঠবে হেলেন কেলার অথবা স্টিফেন হকিং -এর মতোন দিগি¦জয়ী। বিশ্বের বুকে সগর্বে তুলে ধরবে লাল সবুজের সোনালী বাংলাদেশের এক টুকরো মানচিত্রকে।

 

প্রতিবন্ধী সকল সহপাঠীর উদ্দেশ্যে একটাই শ্লোগান-

 

“প্রতিবন্ধিতা নয় কোন অভিশাপ

নয় কোন পরাজয়

শিক্ষা আর মনোবল দিয়ে করব

পৃথিবী জয়

বন্ধু আছি তোমার পাশে সর্বক্ষণ।”

 

 

লেখকঃ ছাত্রী, ৮ম শ্রেণী, শাখা-শাপলা,

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ।

অনুলিখনঃ নূর নাহিয়ান