সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন প্রতিবন্ধী তরুণেরা

 

আজিজুর রহমান

 

জন্ম মৃত্যু মানব জীবনের চিরায়ত খেলা। এ খেলার সূত্রপাত ঘটে মানব শিশু জন্মের মধ্য দিয়ে। কিন্তু কোন মানুষ সম্পূর্ণতা নিয়ে জন্মায় না। তবে কিছু মানুষের জন্য সেই অসম্পূর্ণতা স্বাভাবিক জীবন যাপনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক তখনই চারপাশ থেকে গুঞ্জন উঠে ‘প্রতিবন্ধী’। স্বাভাবিক জীবন যাপনে কিছুটা সমস্যার সম্মুখীন হবার কারণে এই তাদের বেশিরভাগই অনেকটা বন্দী জীবন কাটায়। যেন পুরো পৃথিবীতেই তারা অবাঞ্চিত, কোথাও তাদের ঠাঁই নেই।

 

সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে সাইপ্রাসে প্রতিবন্ধী যুবকদের মধ্যে পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, সার্বজনীন প্রবেশাধিকারের অভাবসহ বিভিন্ন বাধা বিঘ্নের কারণে তারা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন। ২০ জন প্রতিবন্ধী তরুণ এবং সাইপ্রাসের ইউরোপিয়ান সোশ্যাল ফোরামের অন্যান্য  তরুণদের মধ্যে ২০১৩ সালে “কর্মে যুবসমাজ”  শীর্ষক এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছিল। এতে প্রতিবন্ধী তরুণদের সামাজিকীকরণ এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাধাসমূহ পরখ করা হয়েছিল। আরো বাস্তবসম্মত ফলাফল পেতে গবেষণাটি প্রতিবন্ধী তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সাথে পরিচালিত হয়েছিল।  ফলাফলে প্রকাশ পেয়েছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সাধারণত সামাজিকভাবে একীভূত এবং সমাজে সক্রিয়ভাবে জড়িত হতে চায়। কিন্তু প্রায়ই জনগুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রবেশগম্যতার অভাব এবং সামাজিক অন্তর্ভুক্তির সীমিত সুযোগের ফলে এটা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিকীকরণে প্রবেশগম্যতা এখনও অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবেই রয়ে গেছে। সমাজের অনেক স্থান শুধুমাত্র অন্যদের সহায়তায় প্রবেশগম্য, যার অর্থ একজন প্রতিবন্ধী  ব্যক্তি একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারে না বা নিজে নিজে বাইরে বেরুতে পারে না।

 

গবেষণাটি থেকে প্রতীয়মান হয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি তখনই সম্ভব যখন একটি সাধারণ ভ্রমণে তারা নিজেদের বোঝা মনে করে না।

প্রতিবেদনে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের মধ্যে অনেকেই স্কুলে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে যা তাদেরকে পরবর্তীতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া বা চাকরির সুযোগ থেকে বিরত রেখেছে।

 

এই গবেষণাটি সাইপ্রাসে হলেও বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী মানুষদের অবস্থাও কিন্তু একই ক্ষেত্র বিশেষে আরো খারাপ। কারণ আমাদের দেশে বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষদের ঘর থেকে বের হওয়ার একেবারেই সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে সামাজিক বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার চেয়ে অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা মোটেও কম নয়। তাই আমাদের দেশের পথে ঘাটে শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ অনেকাংশেই কম দেখা যায়। তবে তার মানে এই নয় যে এদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা নগণ্য। আমাদের দেশের জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন। আর সরকারিভাবে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা নিয়ে জরিপ পরিচালনার ক্ষেত্রে বিপুল অর্থের বরাদ্দ পেলেও বরাবরই হেলাফেলা করা হয়েছে এই জরিপে। বিগত দিনের সরকারি পরিসংখ্যান যেখানে বলছে দশ শতাংশ সেখানে ২০১৩ তে এক বছর ধরে আলাদাভাবে শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে পরিচালিত প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপের পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে দেশে মাত্র এক শতাংশের কিছু বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। তবে সংখ্যা যাই হোক, প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকাংশই নূন্যতম মৌলিক অধিকার হতে বঞ্চিত। আর অবকাঠামো ও সচেতনতার অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাও বেশির ভাগেরই ভাগ্যে জুটে না। এতে দেশের সম্ভাবনায় তারুণ্য প্রতিনিয়ত বোঝা হিসেবেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ‘কিন্তু তারা কি বোঝা নাকি তাদের বোঝা করে রাখা হচ্ছে?’ একটু চিন্তা করলেই দেখা যায়, তাদের আসলে বোঝা বানিয়ে রাখা হচ্ছে। সব মানুষেরই আলাদা আলাদা শাখায় অদম্য মেধা থাকে। তাদেরও শিক্ষার সুযোগ ও অবকাঠামোগত অল্প কিছু সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমেই সমাজের মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসা যায়। এতে তারাও যেমন স্বনির্ভর হতে পারবে সেই সাথে দেশও উপকৃত হবে। কারণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের শক্তি। আর প্রতিবন্ধী মানুষেরাও যে কর্মক্ষম আমরা বিভিন্ন সময় সেই উদাহরণ পাই। কিন্তু এই সংখ্যা সামান্যই। এত প্রতিবন্ধকতা ঠেলে সবার উপরে উঠে আসা সম্ভব নয়। আবার সামাজিক, বিশেষত পারিবারিক বাধাগ্রস্ত হয়ে অনেকের সে মনোবল হারিয়েও যায়।

 

তাই সমাজ থেকে অনেকটাই দূরে থাকা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজে স্বাভাবিকভাবে নিয়ে আসার জন্য অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর ও সচেতনতা বৃদ্ধি আজ সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে।