সিজোফ্রেনিয়া; অবহেলা করা অথবা আড়ালে রাখা নয় চাই গ্রহণযোগ্যতা

20

জাভেদ আলী

 

ধরুন আপনার কোন প্রিয়জন, নাম অন্তু। বেশ কয়েকদিন ধরে কিছুটাু অদ্ভুত আচরণ করছে, যা আপনাকে বিচলিত করে তুলেছে। কোন আÍীয় বা বন্ধুর পরামর্শে ডাক্তার দেখালেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়লো তার সিজোফ্রেনিয়া আছে! ডাক্তারী পরামর্শে, সুস্থতার জন্য তাকে ভর্তি করালেন মানসিক হাসপাতালে। প্রশ্ন হল, আপনি কি সমাজের বাকিদের মত অন্তুর সঙ্গ ত্যাগ করবেন? তাকে সমাজের আড়ালে রাখবেন? স্বাভাবিকভাবে নিদারুন বাস্তবতায় উত্তর হবে হ্যাঁ বোধক, তা আপনি তাকে যতই ভালবাসুন না কেন। কিন্তু এটাই হবে আপনার চরম একটি ভুল সিদ্ধান্ত। কারণ সিজোফ্রেনিয়াকে কোন মানসিক রোগ নয়, মানসিক সমস্যা বলে স্বাভাবিকভাবে গণ্য করা উচিত।

 

সিজোফ্রেনিয়া শব্দটির উৎপত্তি গ্রীক শব্দমূল skhizein (spilt বা দুভাগ করা) এবং phren- (mind  বা মন) থেকে যার মানে দাঁড়ায় “দ্বিখন্ডিত মন”। মূলত সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল, দুর্বোধ্য এবং দুরারোগ্য মানসিক সমস্যা। যার ফলে মানুষটি তার অনুভব ও চিন্তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। এই হারিয়ে যাওয়া অনেকটাই অস্থায়ী। অর্থাৎ সবসময় থাকে না, আসে-যায় এমন। এই আসা যাওয়ারও কোন নিশ্চয়তা নেই। এ কারণেই বেশি দুর্বোধ্যতা। সিজোফ্রেনিয়ার বিজ্ঞানসম্মত কারণ আজও অজানা। যে কারো যে কোন বয়সে বা সময়ে এটি দেখা দিতে পারে। এর কোন প্রতিষেধক বা টিকা নেই। বংশগত, শৈশবের পরিবেশ, নিউরোবায়োলজি এবং মানসিক ও সামাজিক প্রক্রিয়াসমূহ এ রোগের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসাবে প্রতিভাত হয়।

সাধারণত ছেলেদের ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২৫ বৎসর বয়স ও মেয়েদের ২০ থেকে ৩০ বৎসর বয়সেই এটা বেশি দেখা দেয়। সুচিকিৎসা পেলে এদের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ব্যক্তি বৎসরকাল চিকিৎসার পর ঔষধ সেবন ছাড়া বাকি জীবন নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় কাটাতে সক্ষম হন। বাকি সবাই বিভিন্ন মাত্রায় অন্যের উপর নির্ভরশীল ও প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হয়ে পড়েন।

 

আমাদের দেশে ২০০৩-০৫ সালে ১৮ বৎসরোর্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে পরিচালিত এক নমুনা জরিপের পরিসংখ্যান মতে জটিল মানসিক অসুস্থ ব্যক্তিদের সংখ্যা ছিল ১.১%। জটিল মানসিক অসুস্থতা বলতে সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার ডিজর্ডার ও পারসনালিটি ডিজর্ডার বুঝায়। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০১ সালের রিপোর্ট  মতে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ, স্ত্রী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে ১% লোক সিজোফ্রেনিয়ার সম্মুখীন হন। তাই এই পরিসংখ্যানের ১.১% ব্যক্তি মূলত সিজোফ্রেনিয়া। এর লক্ষণগুলো সবার মধ্যে সবসময় থাকে না আবার সমান মাত্রায়ও থাকে না। লক্ষণগুলোর প্রধান হলঃ অদৃশ্য কোন ব্যক্তি/সত্তার কথা শুনতে পাওয়া, যা নেই তা দেখতে পাওয়া, অন্যরা তার কথা জেনে ফেলেছে এমন মনে করা, নিজে যা নয় এমন কোন বিরাট কিছু মনে করা ও অতি মাত্রায় সন্দেহপ্রবণতা  ইত্যাদি। ফলে মানুষটি চরম আতঙ্কিত, নিরাপত্তাহীনতা এবং অস্বস্তিতে ভোগেন। এসব আচরণ সব সময় দূর থেকে ধরা যায় না নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয় অনেক ক্ষেত্রে। সমাজ, সংসার এবং বন্ধু-স্বজনদের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। আর অসুস্থতা, সংশ্লিষ্ট স্টিগমা (সামাজিক ও পারিবারিক বাধার সামষ্টিক নাম) এবং সবার কাছ থেকে গ্লানি পেতে পেতে বিভিন্ন মাত্রায় প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হয়ে পড়েন। অনেক সময় এই পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসার অভাবে আÍহত্যা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের বড় দুর্ঘটনা ঘটে। সে সময় রোগীর সঠিক পরিচর্যা অনেক জরুরী। গতানুগতিক আচরণের সাথেও রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। যেমন, চোখের দিকে সরাসরি তাকানো যাবে না, পিঠ/কাঁধ বোলানোর চেষ্টা করলে থাকে ক্ষতির ঝুঁকি। তাই এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম, বিশেষত তাদের পরিচর্যাকারীদের। অন্যান্য রোগের ঔষধের মত সিজোফ্রেনিয়ার ঔষধ রোগ কমায় না বরং ‘নিয়ন্ত্রণ‘ করে। এবং এই সবগুলো ওষুধই শরীরের বিভিন্ন অর্গান (বিশেষত কিডনি, লিভার ও হৃৎপিন্ড) ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সিজোফ্রেনিয়ায় সম্মুখীনদের গড় আয়ু ১৫-২০ বছর কম যার একটি কারণ হিসেবে ওষুধের ক্ষতিকর দিক ধরা হয়। তবুও রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য ওষুধ খেতে হয়। পশ্চিমা বিশ্বে এখন এর বিকল্প প্রচলিত থাকলেও আমাদের দেশে সেই সুযোগ নেই।

 

মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশ কয়েক বছর cure ও disease দুটির পরিবর্তে যথাক্রমে recovery ও disorder বা illness ইত্যাদি ব্যবহার করছে। রিকভারি মানে রোগ মুক্তি নয় বরং এর সাথেই বেঁচে থাকতে শেখা। তার জন্য প্রয়োজন প্রচণ্ড জেদ ও আত্মশক্তি। অনেকটা ধূমপান পরিত্যাগের মত। আর এই কঠোর আÍপ্রত্যয়ের জন্য প্রয়োজন সুযোগ এবং আশেপাশের সবার সহনশীল মনোভাব। সিজোফ্রেনিয়া সম্মুখীনদের অযোগ্য মনে না করা, বিরক্ত না করা এবং যে কেউ এর সম্মুখীন হতে পারেন এই চেতনা বোধ নিজের ভেতর জাগ্রত করা প্রয়োজন। আর এই সব সহায়ক দৃষ্টিভঙ্গীই তাদের ভাল থাকতে, সফল হতে সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়। এই রোগের চিকিৎসায় পারিবারিক বন্ধন একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক বিষয়। যা এতদিন আমাদের দেশে থাকলেও বর্তমানে আমাদের পরিবারগুলো ছোট হওয়ায় এবং প্রবীণ ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পরিচর্যাকারী কমে যাচ্ছে ফলে পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল হচ্ছে। অস্থিরতার কারণে তাদের জন্য সময় কাটানো একটা বিশাল সমস্যা। আসামের গোহাটি শহরে আধ-ডজনের মত ‘ডে-কেয়ার সেন্টার’ রয়েছে। তাছাড়াও এদের উপযোগী কর্মের মধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে বহিঃবিশ্বে নানান ব্যবস্থা প্রচলিত আছে।

 

তাদের প্রতি অবিচার ও বৈষম্য রোধে প্রতিকারমূলক ও প্রতিরোধমূলক মানসিক স্বাস্থ্য আইন হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সকল বৈষম্য দূর করা, আধিপত্য ও কর্তৃত্ব নিবৃত করা, সুপ্ত শাস্তি বিরত করা, চিকিৎসার/কল্যাণের অজুহাতে অধিকার লঙ্ঘন ও সর্বোপরি অধিকার প্রতিষ্ঠা ও লঙ্ঘন প্রতিরোধ করা। ইউএন সিআরপিডি আইন প্রণেতাদের সেই কাজটিই করতে বলে। বাংলাদেশ যদিও ইউএন সিআরপিডি প্রতিপালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু দুঃখের বিষয় শুধুমাত্র সিজোফ্রেনিয়া ব্যক্তিদের জন্য জন্য ল্যুনাসি এ্যাক্ট-১৯১২ প্রণীত হয়েছে এবং তা অধ্যাবধি প্রচলিত আছে। আদালত এদের মানসিক ভারসাম্যহীন ঘোষিত করে আইনের মাধ্যমে সকল মানবাধিকার হরণ করে। ফলে দেশের আইনও তাদের বিপক্ষে। ‘The mad and the bad should be out of the society’ নীতি অনুসারী, মানবাধিকারের বর্তমান ধ্যান-ধারণা বিবর্জিত ল্যুনাসি এ্যাক্ট-১৯১২ দ্বারা রাষ্ট্র আজও এদের ভাগ্য নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করছে। আইন একমাত্র এদেরই বিনা অপরাধে অন্যায়ভাবে ভোটাধিকার বঞ্চিত করে। হয়তো তাই WHO এদের denied citizenn আখ্যায়িত করেছে।

 

 

যেহেতু তারা নিজেদের ভাল-মন্দ বুঝতে সক্ষম নন তাই সরকার ও পিতা মাতাকে সমন্বিতভাবে তাদের পুনর্বাসনে ব্যবস্থা নিতে হবে যেন পিতামাতার অবর্তমানে তাদের ভরণ-পোষণে কোন সমস্যা না হয়। তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের পরামর্শসমূহ উল্লেখ করা হলঃ

  • সিজোফ্রেনিয়া তথা মানসিক অসুস্থতা বিষয়ে সর্বস্তরে সচেতনতা বহুগুনে বাড়াতে হবে।
  •  সেন্সর বোর্ডের ও প্রেস ট্রাস্টের মাধ্যমে বিনোদন মাধ্যমগুলোতে সিজোফ্রেনিয়া সম্মুখীন ব্যক্তিদেরকে অসম্মান, ব্যঙ্গ ও কৌতুক প্রচার বন্ধ করতে হবে।
  • তাদের আইনসঙ্গত অধিকার রক্ষায় ল্যুনাসি এ্যাক্ট ১৯১২ এর পরিবর্তে সার্বিক মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক মানবাধিকার ও নাগরিকের প্রকৃত মর্যাদা সম্বলিত যুগোপযোগী বলিষ্ঠ আইন প্রণয়ন করতে হবে।
  • বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম যেমন বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে সিজোফ্রেনিয়া সম্মুখীন ব্যক্তিদের বিষয়ে সমাজে সচেতনতা এবং স্টিগমা সহনীয় মাত্রায় আনার মাধ্যমে বাধা দূর করতে হবে। 
  • বিশেষ বিনিয়োগ প্রকল্প চালু করে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্যে তাদের অভিভাবকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে বিনিয়োগকরণ ও উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করা।
  •  তাদের আর্থিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, আয়কর মওকুফ করা ও স্বাস্থ্য বীমায় মানসিক অসুস্থতায় ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা নেয়া। 
  •  দীর্ঘমেয়াদী ও স্বল্পমেয়াদী বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সমাজে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • বহিঃবিশ্বের উদাহরণ স্বরূপ এদেশেও ডে কেয়ার সেন্টার, ‘শেল্টার এমপ্লয়মেন্ট’ ও ‘সাপোর্টেড এমপ্লয়মেন্ট’ এর উদ্যোগ গ্রহণ।
  •  পরিবারকে সামাজিক ভীতি পরিহার করে তাদেরকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে এগিয়ে আসতে হবে।

 

এগুলো নিশ্চিত করা হলেই সম্ভব সিজফ্রেনিয়া-কে জয় করা।