স্কলিওসিস; ধারণা এবং প্রতিকার

61

 

মোঃ জাহিদুল ইসলাম

 

Scoliosis একটি নিউরো মাস্কুলার রোগ যা কিনা মেরুদন্ডের হাড় গুলোকে বিভিন্ন ভাবে বাঁকা এবং মুচড়িয়ে ফেলে। শুধু শারীরিক প্রতিবন্ধী বা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী নয়, যে কারোরই এটি হতে পারে। মূলত স্নায়ুবিকব্যাধির কারণে এমন হয়। মানব দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নার্ভ স্পাইনাল কর্ড যা মেরুদন্ডের ভিতর দিয়ে মস্তিষ্কের সাথে সংযুক্ত, সেই নার্ভ যখন দুর্বল হয়ে পরে তখন মেরুদন্ড দেহের স্বাভাবিক ভার বহন করতে পারেনা। ফলে অনিয়মতান্ত্রিক চলাফেরা এবং দীর্ঘক্ষণ বাঁকা হয়ে বসে থাকার ফলে মেরুদন্ড বাঁকা হয়ে যায়। এর ফলে পিঠে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। বেশির ভাগ ডাক্তার বলে থাকেন যে মানব দেহের হাড় একটি নির্দিষ্ট বয়সের (২০ বছর) পর আর বৃদ্ধি পায় না, এটি একেবারেই ভুল ধারণা। মনে রাখতে হবে যে স্কলিওসিস এমন একটি রোগ যা হলে মেরুদন্ড বাঁকা হতেই থাকবে যদি না সঠিক চিকিৎসা দেয়া হয়।

 

আমি নিজেও একজন স্কলিওসিস রোগের প্রায় সর্বোচ্চ ভুক্তভোগী। শারীরিক প্রতিবন্ধিতার কারণে আমি হাঁটা-চলা করতে পারিনা। তাই আমাকে দীর্ঘ সময় বসেই থাকতে হয়। এবং একটা সময় আমার মেরুদন্ড বাঁকা হয়ে যেতে থাকে। প্রচন্ড পিঠে ব্যথার জন্য যখন আমি বসেও থাকতে পারছিলাম না, তখনি আমার পিঠের এক্স-রে করানোর মাধ্যমে জানতে পারি আমার স্কলিওসিস হয়েছে। বাংলাদেশে অসংখ্য ডাক্তার দেখিয়েও কোন কাজ হয়নি। এই পিঠে ব্যথার জন্য আমাদের দেশের ডাক্তাররা শুধু কিছু থেরাপি দিয়ে থাকেন, যা কি না শুধু সাময়িকভাবে ব্যথা কমিয়ে রাখে কিন্তু স্থায়ী কোন সমাধানের চিন্তা আমাদের দেশে করা হয় না। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে যখন মেরুদন্ডের বাঁকার পরিমাণ কম থাকে তখন থেকেই সঠিক চিকিৎসা নেয়া প্রয়োজন। মেরুদন্ড বেশি বাঁকা হয়ে গেলে প্রচন্ড শ্বাস কষ্ট সহ স্পাইনাল কর্ড অকার্যকর হয়ে সারা জীবনের জন্য পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে যাবার এমনকি জীবননাশেরও আশঙ্কা রয়েছে।

 

আমার স্কলিওসিস ধরা পরে ২০০৮ সালের এপ্রিলে, তখনই মেরুদন্ড অনেক বেশি বাঁকা ছিল। প্রথমে গিয়েছিলাম মিরপুরে সি.আর.পি তে। সেখান থেকে আমাকে একটি ব্রেস দেয়া হয়, যা কিনা খুবই শক্ত অনেকটা বড় একটা খাঁচার মত এবং এটা পরলে সোজা হয়ে বসে থাকা যায়। কিন্তু পরবর্তীতে জানতে পেরেছি দীর্ঘ সময় ধরে এই ব্রেস পরিধানের ফলে উপকারের চেয়ে অপকারের পরিমাণ অনেক বেশি হয়েছে আমার। এটা দেহের মাংস পেশী গুলো দুর্বল করে দেয় যার ফলে দেহের পেশী স্বাভাবিক ভাবে মেরুদন্ডকে ধরে রাখতে পারেনা। খুব টাইট করে এই ব্রেস অনেকক্ষণ পরে থাকতে হয় বলে প্রচন্ড শ্বাসকষ্টও হয়।

মেরুদন্ডের বাঁকার পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে সাধারণত আমাদের দেশের ডাক্তাররা অপারেশন করতে বলেন যা কিনা বাংলাদেশেও সম্ভব না এবং এই অপারেশন পৃথিবীর যে কোন দেশেই প্রচণ্ড ঝুঁকিপূর্ণ এবং অপারেশেনের পরেও ভুক্তভোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনা কম।

 

কিন্তু মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ করুণায়, ইন্টারনেটে অসংখ্য তথ্য খোঁজাখুঁজির পর আমি পেয়ে যাই বিরক্তিকর ব্রেস ও অপারেশন ছাড়াই সম্পূর্ণ  নিরাপদ পদ্ধতিতে খুবই উন্নত chiropractic থেরাপি এর মাধ্যমে স্কলিওসিস চিকিৎসার খোঁজ। এই চিকিৎসা পদ্ধতিটি আমেরিকার একটি প্রতিষ্ঠান CLEAR-INSTITUTE (www.clear-institute.org) Gi Dr. Dennis Woggon আবিষ্কার করেন। আমি সরাসরি তাঁর সাথে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করে আমার শারীরিক সমস্যা খুলে বলি তাকে। আমার বাংলাদেশে করা এক্স-রে এর ছবি এবং তাঁর নির্দেশ মত আমি আমার পুরো শরীরের ভিডিও করে তাঁকে পাঠাই। যদিও বাংলাদেশে করা এক্স-রে গুলো তাঁদের করা এক্স-রে থেকে অনেক আলাদা। কিন্তু Dr. Dennis Woggon সব কিছু দেখে আমাকে জানান এখনো আমার স্কলিওসিস এর চিকিৎসা করা সম্ভব। কিন্তু আমেরিকা গিয়ে এই চিকিৎসা করানো অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এশিয়া মহাদেশে শুধুমাত্র দুই জন ডাক্তার এই পদ্ধতিতে চিকিৎসা করান জাপান এবং সিঙ্গাপুরে। আমি সিঙ্গাপুরে Bones and Beyond Scoliosis Centre  এর Dr. Hugh Van Kieu এর সাথে যোগাযোগ করি এবং তিনিও সব কিছু শুনে আমার চিকিৎসা সম্ভব বলেন। যদিও সিঙ্গাপুরেও এই চিকিৎসা করানো অনেক ব্যয়বহুল কিন্তু আমেরিকার তুলনায় কম। উন্নত থেরাপি মেশিন এবং chiropractic থেরাপির মাধ্যমে আমার মেরুদন্ডের বাঁকার পরিমাণ আল্লাহ্র রহমতে নীচের অংশের বাঁকা (Lumber spine) ৮৫ ডিগ্রী থেকে ৫৮ ডিগ্রীতে এবং উপরের অংশে (Thoracic spine)  ৭১.৫ থেকে ৫৯ এ নেমে এসেছে মাত্র ১৪ দিনের চিকিৎসায়।

 

বলে রাখা প্রয়োজন এই চিকিৎসা পদ্ধতিতে ৩টি ধাপ অনুসরণ করা হয়।

  1. Mix (warm up the spine)
  2. Fix (adjust the spine)
  3. Set (lock spinal corrections)

 

 

প্রত্যেক স্কলিওসিস রোগীই একজন আরেকজনের থেকে কিছুটা ভিন্ন। তাই এই রোগের বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রোগীর অবস্থা বুঝে তার চিকিৎসা পদ্ধতি ঠিক করেন। সাধারণত, ২৫ ডিগ্রীর নিচে মেরুদন্ড বাঁকা থাকলে ৭ দিন এই থেরাপি নিতে হয়। ২৫ থেকে ৪০ ডিগ্রী বাঁকা হলে ১৪ দিন থেরাপি নিতে হয়। এবং যাদের মেরুদন্ডের বাঁকার পরিমাণ আরও অনেক বেশি তাদেরকে চিকিৎসা শেষে বাসায় একটা অত্যাধুনিক Scoliosis Traction Chair ব্যবহার করতে হতে পারে। কারণ দীর্ঘ দিনে যে মেরুদন্ড অনেক বাঁকা হয়ে গেছে তা মাত্র ১৪ দিনের থেরাপিতে পুরোপুরি আগের অবস্থায় আনা সম্ভব নয়। এই ১৪ দিনের থেরাপিতে মেরুদন্ডকে অনেক বেশি ফ্লেক্সিবল করা হয় এবং Scoliosis Traction Chair ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাসায় ব্যবহার করলে তা অনেকখানি কমে আসবে ইনশা-আল্লাহ।

 

আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। স্কলিওসিস এর জন্য মূলত আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেই দায়ী তাঁর অনিয়ম তান্ত্রিক চলা ফেরার জন্য। আমরা অনেকেই হয়ত বসার সময় মনে রাখিনা আমাদের কিভাবে বসলে মেরুদন্ডে কম চাপ পড়বে। বিশেষ করে আমরা যারা শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী এবং হুইলচেয়ারে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকি তাদের উচিত কিছুক্ষণ পরপর বসার স্থান পরিবর্তন করা এবং বাঁকা/কুঁজো/কোন দিকেই বেশি ভর না দেয়া। যতটা সম্ভব শরীরকে সঠিক ভারসাম্যে রাখা যাতে করে শরীর ডান বা বাম কোনদিকে বেশি বাঁকা না হয়ে যায়।

 

বলা যেতে পারে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অশেষ কৃপায় আমি স্কলিওসিস রোগের কারণে প্রায় মৃত্যুর খুব কাছ থেকে ফিরে এসেছি। তাই আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই লেখার মাধ্যমে কেউ যদি স্কলিওসিস সম্বন্ধে কিছুটা ধারণা বা সচেতন হয়ে থাকেন, তাহলেই আমার এই লেখা সার্থক।

মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুস্থ থাকার তৌফিক দান করুন।

 

লেখকঃ ছাত্র, এম.বি.এ. নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়,

ইন্টারনেট মার্কেটিং প্রফেশনাল।