প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষা বিষয়ে গোলটেবিল বৈঠক

 

দেশের ২০টি সরকারি জনগুরুত্বপূর্ন স্থাপনাগুলো নিরীক্ষণে মাত্র ১ টিতে র‌্যাম্প এবং ১টি প্রবেশগম্য টয়লেট পাওয়া গেছে। বি-স্ক্যান এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশেনের মাধ্যমে ডেইলি স্টার ভবনে গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকদের সামনে গবেষনার চিত্রটি এভাবেই তুলে ধরেন। মূলত ৫ ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই নিরীক্ষায় অংশ নেন এবং তারা ঢাকা এবং চট্টগ্রামের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি কর্পোরেশন, রেল স্টেশন, সমাজসেবা কার্যালয়, বাস স্টেশন, পুলিশ স্টেশন এবং হাসপাতাল ইত্যাদি স্থাপনাসমূহ সরেজমিন নিরীক্ষণের মাধ্যমে এই চিত্র দেখতে পান।

 

প্রবেশগম্যতার সঠিক চিত্র পেতে গত জুন, ২০১৪ ওয়াটারএইড এর সহযোগিতায় বি-স্ক্যান এর উদ্যোগে ঢাকা এবং চট্টগ্রামের মোট ২০টি জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ভবনে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা বিষয়ে নিরীক্ষা চালানো হয়। নিরীক্ষণের চিত্রটি যথাযথ কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যে ২২ নভেম্বর, ২০১৪ ওয়াটারএইড, বি-স্ক্যান এবং ডেইলিস্টার এর যৌথ উদ্যোগে ওয়াশ সেবাসমূহ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিতকরণ শীর্ষক একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

শারীরিক, দৃষ্টি, স্বল্প দৃষ্টি এবং  শ্রবণ বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কারো দিক থেকেই ভবনগুলো প্রবেশগম্য নয় অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০০৮ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার আইন ২০১৩ তে স্পষ্টভাবেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে এবং এই ব্যবস্থা না থাকা একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

 

ওয়াটারএইড এর পরিচালক প্রোগ্রাম এবং পলিসি এ্যাডভোকেসি এর জনাব হাসিন জাহান এই বিষয়ে তার বক্তব্যে বলেন, প্রতিবন্ধী মানুষের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের সময় এসেছে। বিগত কয়েক বছরে ওয়াটারএইড দরিদ্র এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমতা এবং অন্তভুক্তির উপর জোর দিয়ে কাজ করে আসছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) উন্নয়ন ও চুড়ান্তকরণের সময় আমরা কাজ করেছি, প্রবেশগম্যতা বাস্তবায়নে নিরীক্ষা কাজে সহায়ক হিসেবে বি-স্ক্যান ও আমরা একসাথে কাজ করছি। আসল উদ্দেশ্য হলো পলিসি মেকারদের সংবেদনশীল করা এবং চিন্তায় নাড়া দেয়া । বিভিন্ন মহল থেকে চাপ দেয়া সত্ত্বেও নতুন বিএনবিসি এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছে। আমরা আশা করছি এটা দ্রুতই বাস্তবায়ন হবে তবে আমাদের কাজ সেখানেই শেষ নয়। বাস্তবায়ন এবং পরবর্তীতে পরীবিক্ষণের কাজটি আরো কঠিন হবে। তারপরও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর বাস্তবায়ন একটি বিরাট সাফল্য এবং আশা করা যায় বিভিন্ন মহলের উন্নয়ন কর্মীদের চাপে এভাবেই বিএনবিসিও অনুমোদন পাবে। এই যাত্রায়, জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই একই উদ্দেশ্যে প্রচারাভিযান ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই।

 

ওয়াটারএইড এর পলিসি এ্যান্ড অ্যাডভোকেসি এর প্রধান জনাব শামীম আহমেদ বলেন, বিশুদ্ধ পানি এবং স্যানিটেশেন নিশ্চিতে  সম্পূর্ণ সাফল্য অর্জন করতে পারবো না যদি প্রতিবন্ধী মানুষেরা এর থেকে বাদ পড়ে যান। যদি একজন মানুষের ভবনে প্রবেশের উপায়ই না থাকে তবে সে কি করে বিশুদ্ধ পানি পান বা স্যানিটেশেন সুবিধা নেবে? এই চিন্তা থেকেই আমরা, বি-স্ক্যান এবং দ্যা ডেইলি স্টার প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার রক্ষায় একসাথে প্রচারিভিযানে নেমেছি। আমরা ঢাকা এবং চট্টগ্রামের ২০টি জনগুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও ভবনে সর্বজনীন প্রবেশগম্যতা বিষয়ে নিরীক্ষা চালিয়েছি।

 

আমরা এই ২০টি ভবনের কর্তৃপক্ষকে তাদের ভবনের প্রবেশগম্যতা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে বলছি। চট্টগ্রাম ওয়াসা ইতিমধ্যে তাদের ভবনে পরিবর্তন করতে টেন্ডার ডেকেছে। আমরা ডেইলি স্টারকে সাথে নিয়ে এই ভবনগুলো ফলোয়াপ করবো এবং রিপোর্ট প্রকাশ করবো।

এটা লক্ষ্য করা উচিত যে, নেতৃত্ব অনেক কিছু বদলে দিতে পারে। পানি, স্যানিটেশেনের দাবীতে আমাদের জোরালো নেতৃত্ব প্রয়োজন যে সহজতর প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী মানুষসহ সবার জন্য সব জায়গায় নিরাপদ খাবার পানি, স্যানিটেশেন সুবিধা এবং  স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে।

প্রতিবন্ধিতা কোন সমস্যা নয়, আসলে মূল্য সমস্যা হচ্ছে সামজিক এবং প্রশাসনিক অবকাঠামো এবং সমাজে মানুষের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী আমাদেরকে পিছিয়ে দিচ্ছে বলে মত প্রকাশ করেন টার্নিং পয়েন্ট এর নির্বাহী পরিচালক জনাব জীবন উইলিয়াম গোমেজ।

 

বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) এর সাধারণ স¤পাদক সালমা মাহবুব তার বক্তব্যে বলেন, আমরা ২০০৯ সাল থেকে কাজ করে আসছি। এই প্রবেশগম্যতা নিরীক্ষা তারই একটি অংশ। ওয়াটারএইড, পিএসটিসি এবং সাজেদা ফাউন্ডেশেনের সহায়তায় আমরা এই কাজটি করেছি। আমরা উল্লেখযোগ্য জনগুরুত্বপূর্ণ ভবন এবং স্থাপনায় সকল ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদার দিকটি বিবেচনা করে এই নিরীক্ষা কার্যক্রমটি চালিয়েছি। গবেষণায় দেখা গিয়েছে প্রবেশমুখেই আমাদেরকে বাধার সম্মুখিন হতে হচ্ছে। ২০টি ভবনের মাঝে ১টিতে র‌্যাম্প, ২টিতে লিফট, ১টিতে জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা এবং ১টি টয়লেট পাওয়া গেছে। সঠিক নিয়ম মেনে তৈরি করা র‌্যা¤পটি ছিল চট্টগ্রাম সিডিএ ভবনে। এছাড়া সিডিএ ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (নগর ভবন) এ লিফট সুবিধা ছিল, শুধুমাত্র ঢাকা ওয়াসাতে নিরাপদ জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা আছে যাও আবার তালা দেয়া অবস্থায় দেখা গেছে এবং একমাত্র গাবতলী বাসস্ট্যান্ডের টয়লেটটি ছাড়া আর কোথাও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কোন প্রবেশগম্য টয়লেট পাওয়া যায় নি। সমাজসেবা জেলা কার্যালয়ের অবস্থা বড়ই করুণ ছিল। ঢাকায় পুরাতন ভবন হওয়ায় উপর তলায় গিয়ে সেবা নেয়া সম্ভবপর নয় এবং চট্টগ্রামে নতুন ভবন হওয়া সত্ত্বেও সেখানেও প্রবেশগম্যতার অভাব রয়েছে। ঢাকা রেলস্টেশনে মালপত্র বহনের খাড়া ঢালু পথ দিয়ে হুইলচেয়ার ব্যবহারি ব্যক্তিকে অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণভাবে উঠানো নামানো হয়।

 

স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিপরীত রঙ্গের ব্যবহারের মারাত্নক অভাবে দেখা গিয়েছে। দরজা এবং দরজার ফ্রেমে একই রঙ ব্যবহারের কারণে তাদেরকে সেগুলোকে প্রভেদ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। করিডোরের মাঝে হঠাৎ পিলার বা কলামগুলো স্বল্প দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য মারাত্নক দূর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এছাড়াও করিডোরের মেঝেতে ট্যাকটাইল অথবা দেয়ালে রেলিং এর কোন ব্যবহার দেখা যায় নি যা দিয়ে একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ করিডোর থেকে বাকগুলো বুঝতে পারবেন। অনেক সময় দেখা গেছে করিডোর চওড়া থাকলেও নানারকম জিনিসপত্র রেখে এমন সরু করে ফেলা হয়েছে যা প্রতিবন্ধী মানুষের সহজ চলাচলে বাধার সৃষ্টি করছে। তথ্যকেন্দ্র থাকলেও তা প্রতিবন্ধী মানুষের মোটামুটি উপযোগি ছিল মাত্র ২২% জায়গায়। দুঃখজনক হলো এই ২০টি ভবনের কোথাও আমরা প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য কোন ফোকাল পারসন পাই নি।

 

কনসার্ন উইমেন ফর ফ্যামিলি ডেভেলপমেন্ট (সিডব্লিউএফডি) এর পলিসি এবং অ্যাডভোকেসি অফিসার জনাব মোহাম্মদ ইফতেখার মাহমুদ বলেন, শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষেরা সবচেয়ে বেশি অসুবিধার সম্মুখিন হচ্ছেন। আমরা সহজে তথ্য পেলেও তারা পাচ্ছেন না। আমাদের এই ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের কথাও বিবেচনায় আনা উচিত। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষের পলিসি মেকিং এ কোন অংশগ্রহণ নেই। আমরা যদি তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারি তাহলে এমনিতেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। প্রতিবন্ধী মানুষের পরিসীমা প্রসারিত করে প্রসূতি নারী এবং বয়োবৃদ্ধদের অন্তর্ভুক্তি করা প্রয়োজন।

 

সাধারণত আমরা নতুন ভবন নিয়েই আলোচনা করি কিন্তু যেগুলো ইতিমধ্যে নির্মাণ হয়ে গেছে সেইসব ভবন নিয়ে কিছু বলি না। এই ভবনগুলোও প্রতিবন্ধীবান্ধব করতে মডিফাই করা দরকার। এই মডিফিকেশেনে তেমন খরচ হবে না, দরকার শুধু দৃষ্টিভংগীর পরিবর্তন।

 

বৈঠকে আলোচক হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা দক্ষিণ নগর ভবনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জনাব আনসার আলী খান, সমাজসেবা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ন সচিব জনাব এম এম সুলতান মাহমুদ, হাউজিং এ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইন্সটিটিউট (এইচবিআরআই) এর পরিচালক জনাব মোহাম্মদ আবু সাদেক, রাজুক এর পরিকল্পনা বিভাগের সদস্য জনাব এস কে আব্দুল মান্নান, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং স্থাপত্য বিভাগের প্রাক্ততœ চেয়ারম্যান ড. জেবুন নাসরিন, বাংলাদেশ স্থাপত্য অধিদফতর এর সহযোগি প্রধান স্থপতি জনাব শিহাব রায়হান কবির, সোসাইটি অব দ্যা ডেফ এ্যান্ড সাইন ল্যাক্সগুয়েজ ইউজারস (এসডিএসএল) এর সভাপতি জনাব এম ওসমান খালেদ, টার্নিং পয়েন্ট এর নির্বাহী পরিচালক জনাব জীবন উইলিয়াম গোমেজ, ন্যাশনাল ফোরাম অব অর্গানাইজেশেন ওয়ার্কিং উইথ দ্যা ডিজেবেল্ড (এনএফওডব্লিউডি) এর পরিচালক জনাব নাফিসুর রহমান, এডিডি ইন্টারন্যাশনাল এর কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব শফিকুর রহমান, ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গ্লোবাল হেলথ এর সহযোগি অধ্যাপক জনাব ইলিয়াস মাহমুদ। গোলটেবিল বৈঠকের আগত বক্তাদের বক্তব্য নিয়ে ৩ ডিসেম্বর, ২০১৪ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক দিবসে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয়।