মিস ভ্যারোনিকা এ ক্যাম্পবেল; একজন আলোর দিশারী

এদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিক্ষার্থীদের প্রথম বিদ্যালয় ব্যাপ্টিস্ট সংঘ অন্ধ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মিস ভ্যারেলিকা এ ক্যাম্পবেল গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ দেশে মারা যান। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্রীবৃন্দ তাঁর স্মরণে গত ১৫ নভেম্বর, ২০১৪ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর.সি. মজুমদার মিলনায়তনে একটি স্মরণ সভার আয়োজন করে।

 

সভায় জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার বিষয়ক সনদের আন্তর্জাতিক পরীবিক্ষণ কমিটির প্রাক্তন সদস্য ও ডিজ্যাবেলিটি কাউন্সিল ইন্টারন্যাশনাল এর নির্বাহী সদস্য জনাব মনসুর আহম্মেদ চৌধুরী, ব্যপ্টিস্ট মিশন ইন্টিগ্রেটেড স্কুলের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল মিসেস মঞ্জু সমাদ্দার ও সিলভিয়া সান্তশ্রী মজুমদার, মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটারি ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন প্রিন্সিপাল রাজিয়া সুলতানা এবং সুইড বাংলাদেশ এর সভাপতি জনাব জওহেরুল ইসলাম মামুন অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। স্মরণ সভায় প্রায় ৭০ জনের অধিক প্রাক্তন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রীসহ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও উন্নয়ন নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রীদের প্রাণপ্রিয় মাসিমার মৃত্যুতে তাঁর আলোয় আালোকিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রীরা গভীর শোক প্রকাশ করে এবং তাঁর বিদেহী আত্নার শান্তি কামনা করেন। মাসিমার কাজের স্বীকৃতি ও তার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য দরিদ্র ও মেধাবী দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রীদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করার জন্য “মিস ভ্যারোনিকা এ ক্যাম্পবেল” শিক্ষা বৃত্তি চালু করা, বিদ্যালয়ের মিলনায়তনটি “মিস ভ্যারোনিকা এ ক্যাম্পবেল মিলনায়তন” নামকরণ, তাঁর জীবনি লিপিবদ্ধকরা, প্রাক্তন ছাত্রীদের নিয়ে একটি অ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েসন গড়ে তোলাসহ আরো অনেক উদ্যোগের পরামর্শ অতিথিদের বক্তব্যে উঠে আসে।

 

মিস ভ্যারোনিকা এ ক্যাম্পবেল ছিলেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য একজন আলোর দিশারী। বাংলাদেশের সকল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রীরা মাসিমাকে আদর্শ মেনেই শ্রদ্ধা করেন। তিনি ১৯৪১ সনের ২৮ নভেম্বর ইংল্যান্ডের ডেভোন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইংল্যান্ডের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের শিক্ষা বিষয়ক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫৭ সালে মিশনারি হিসেবে তিনি বাংলাদেশে আসেন। তখন থেকেই গ্রামে গ্রামে ঘুরে দুঃস্থ অসহায় মানুষের সেবা করতেন এবং সুযোগ পেলেই ঢাকার আসাদগেটে তৎকালীন অন্ধ স্কুলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্রদের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন।

 

১৯৫৭ সালে বাংলাদেশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রমের সূচনা হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভাবে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণ করার কোনো সুযোগ ছিল না। এ অবস্থা দেখে তিনি আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করেন অবহেলিত এবং পিছিয়ে পড়া দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে শিক্ষার্থীর জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। অবশেষে ১৯৭৫ সালে মিস ভ্যারোনিকা এ ক্যাম্পবেল ব্রিটিশ মিশনারি সোসাইটি ও বাংলাদেশ ব্যাপ্টিস্ট সংঘ (দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে দাতা সংস্থা) এবং সিবিএম জার্মানির নিকট দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য প্রথম স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবনা উপস্থাপন করলে সিবিএম জার্মানি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তা গ্রহণ করেন এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্র“তি প্রদান করেন। তারই ফলে ১৯৭৭ সালের ৪ জানুয়ারি মাত্র ৭ জন ছাত্রী নিয়ে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য ব্যাপ্টিস্ট সংঘ অন্ধ বালিকা বিদ্যালয় নামে ভাড়া বাড়িতে এই স্কুলের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীকালে ঢাকাস্থ সেনপাড়া পর্বতা মিরপুর-১০ নম্বরে নিজস্ব জমিতে নির্মিত ভবনে ১০০ আসন বিশিষ্ট একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন মেয়েদের লেখাপড়াসহ  যাবতীয় ব্যয়ভার স্কুলই বহন করত। মিস ক্যাম্পবেল শিক্ষার পাশাপাশি সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে চিত্তবিনোদন ও প্রশিক্ষণের জন্য রিক্রিয়েশন ট্রেনিং সেন্টার এবং বয়স্ক ও স্বল্প বুদ্ধিসম্পন্ন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন করেন। এই বিদ্যালয়ে ১৯৮৬ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়ে এসএসসি পাশ করে। এদের মধ্যে অধিকাংশই বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। এখানে একটি কথা বলা অপরিহার্য যে তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ১৯৮৪ সাল থেকে এ স্কুলের মেয়েরা মিরপুর গার্লস আইডিয়েল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটে সমন্বিত পদ্ধতিতে লেখাপড়া করে আসছে। ঐ সময়ে অন্য কোন স্কুলের সাথে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদের সমন্বিত শিক্ষা ব্যবস্থা মোটেও সহজ ব্যাপার ছিল না। তাঁর প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ  তা সহজে অনুমান করা যায়, কেননা স্কুল প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ ৩৮ বছর এমনকি স্বাধীনতার পর ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়েই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েদের জন্য এত বৃহৎ পরিসরে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।

 

মাসি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রকৃতির। স্নেহমমতা ছিল তাঁর চরিত্রের বড় বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে আসার পরপরই তিনি বাংলা ভাষা এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত ব্রেইল পদ্ধতি খুব ভালবভাবে রপ্ত করেন। তিনি ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ থেকে চলে যান। ২০০৮ সাল পর্যন্ত মাসিমা বেশ কয়েকবার দেশে এলেও পরবর্তীতে অসুস্থতার কারণে তাঁর পক্ষে আর আসা সম্ভব হয়নি। গত বছর ২৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের অগণিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েদের কাঁদিয়ে তিনি নিজ শহরের একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের সকল দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মেয়েরা আজীবন তাঁকে স্মরণ করবে বিনম্র শ্রদ্ধা ও অকৃত্রিম ভালোবাসায়।

 

লেখকঃ নাজমা আরা বেগম পপি
সহকারি সমন্বয়কারী, জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম এবং
ফাহিমা খাতুন,
নির্বাহী অফিসার, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক লিঃ