এ্যাডভোকেট নুরুজ্জাহানের স্বপ্নযাত্রায় সহযাত্রী ব্যাংক এশিয়া

সালেহ আহম্মেদ রাখি

 

একদা যিনি মাত্র আড়াই হাজার টাকা পুঁজি করে শুরু করেছিলেন নকশি বাংলা নামের একটি বুটিক, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী হয়েও আজ নিজ যোগ্যতায় প্রথম প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে তিনি পেলেন আড়াই লক্ষ টাকার ব্যাংক ঋণ। এ্যাডভোকেট নুরুজ্জাহানকে এই ঋণ প্রদানের মাধ্যমে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলো চট্টগ্রাম ব্যাংক এশিয়ার স্ট্র্যান্ডরোড শাখা।

 

প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হওয়া মানেই যে সফলতার পথে বাধা হওয়া নয় তা আমরা আবারও দেখলাম এ্যাডভোকেট নুরুজ্জাহান এর কর্মে। একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী নারী হয়েও নিজেকে গুটিয়ে না রেখে নিজ চেষ্টায় আজ তিনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত সফল এক মানুষ।

আড়াই হাজার টাকা পুঁজি সম্বল করে ২০১২ সালে নকশী বাংলা বুটিকটি খোলেন মাত্র দুজন প্রতিবন্ধী মানুষকে সাথে নিয়ে। বর্তমানে সেখানে সাতজন প্রতিবন্ধী মানুষ কর্মরত রয়েছে। মূলত তাদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করা এই নকশী বাংলা বুটিকে বিভিন্ন ধরনের কাজ হয়ে থাকে যার মাঝে রয়েছে হস্তশিল্প, থ্রী-পিস, ব্লক, বাটিক, এমব্রয়ডারী প্রিন্ট, নকশীকাঁথা, নিমানেটি কাঁথা ইত্যাদি যা গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী করা হয়ে থাকে। এভাবেই একসময় পুঁজি বৃদ্ধি করেন এবং ট্রেড লাইসেন্স নেন। প্রাপ্ত ট্রেড লাইসেন্স এর মেয়াদ দেড় বছর হবার পর তিনি বেশ কয়েকটি ব্যাংকে ঋণের জন্য আবেদন করেন এবং সেই সাথে তিনি ২০১০ সালে চট্টগ্রাম উইমেন চেম্বারের সদস্যপদও লাভ করেন। বিভিন্ন ব্যাংকে আবেদনের দীর্ঘদিন পরেও ফলপ্রসূ সাড়া পাওয়া যায় নি। কোন কোন ব্যাংক থেকে নানা ভাবে অপমানিত হয়েছেন। কিন্তু দমে যান নি। পৃথিবীতে ভালো মানুষ এখনো আছে তাই হয়তো মানব সমাজ এখনো টিকে আছে এই বিশ্বাস ধারণ করে অবিরত চেষ্টা চালিয়ে গেছেন।

 

অবশেষে এ্যাডভোকেট নুরুজ্জাহানের অদম্য ইচ্ছে শক্তি ও মেধার প্রয়াস দেখে ব্যাংক এশিয়ার স্ট্র্যান্ডরোড শাখার এ্যাসিটেন্ট ম্যানেজার সালমা রহমান এর আন্তরিক সহযোগিতায় গত ২০ মার্চ, ২০১৫ এই ঋণ পান তিনি। উচ্ছ্বসিত নুরুজ্জাহান অপরাজেয়কে জানান, নিজের পুঁজিতেই নিজের ব্যবসা করতে পারতাম, কিন্তু আমি সবাইকে দেখিয়ে দিতে চাই চেষ্টা ও ইচ্ছা শক্তি থাকলে কোন ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকেই তার চারপাশের প্রতিকূলতা থামিয়ে দিতে পারে না। এটা সমাজকে দেখিয়ে দেয়ার জন্যই এই ঋণ নেবার জন্য এতদিন চেষ্টা চালিয়েছি আমি।

তিনি আশা করেন তার এই সফলতা অন্যান্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ আবেদন ও পাওয়ার পথ অনেকটাই সহজ হবে।

 

উল্লেখ্য, এ্যাডভোকেট নুরুজ্জাহান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৭ সালে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী শেষ করে দেশের একমাত্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে বার কাউন্সিলের সদস্যপদ লাভ করেছিলেন, কিন্তু সিনিয়র আইনজীবীদের অসহযোগিতার কারণে নিজের প্র্যাকটিস চালিয়ে নিতে পারেন নি। পরবর্তীতে তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান উৎস-এর ব্রেইল প্রেস ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছেন।

 

শুধু মাত্র নিজের জন্য কিছু করে বসে নেই অ্যাডভোকেট নুরুজ্জাহান। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাইট এ্যাকশন ফর ডিজ্যাবিলিটি (র‌্যাড) নামে ডিপিও সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি যার উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা।

এই প্রতিষ্ঠান গঠনের পেছনের তিক্ত অভিজ্ঞতার গল্পটি জানালেন নুরুজ্জাহান। ২০০৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে তিনি প্রাথমিক স্কুল শিক্ষকপদে পরীক্ষা দেন এবং লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু চাকরি পেতে তার কাছে ঘুষ চাওয়া হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর পর নানান প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করেও একই অবস্থা বেশির ভাগ জায়গায়। এরপরেই সিদ্ধান্ত নেন অন্য প্রতিবন্ধী মানুষেরা যেন তার মত এই ধরনের বিড়ম্বনায় না পড়েন সে জন্যে কিছু করবেন। সেই ইচ্ছা থেকেই র‌্যাড এর জন্ম। র‌্যাড থেকে এ পর্যন্ত ১৫ জন প্রতিবন্ধী মানুষ প্রশিক্ষণ নিয়ে নানান কাজের সঙ্গে জড়িত আছেন। তার ভবিষ্যৎ ইচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের প্রতিবন্ধী মানুষকে প্রশিক্ষণ মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে তোলা।