কোটা’র ফাঁকি; আমাদের জন্য কি কেউ নেই!

12

 

মোঃ শাহ আলম মিয়া

 

বর্তমান সরকার এক বিরাট জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন কিন্তু নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ইস্তেহার কতটুকু পূরণ করতে পেরেছেন তা সবার জানা। প্রশ্ন হল সরকার যে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তা শিক্ষিত প্রতিবন্ধী গোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে বাস্তবায়ন কিভাবে সম্ভব!

 

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারি প্রথম শ্রেণির চাকরিতে এক শতাংশ কোটা রাখার ঘোষণা দেন। এতে শিক্ষিত প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর মনে আশার আলো ফুটে ওঠে। কিন্তু কত জনেই বা জানেন তাদের সাথে এক নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণ করা হয়েছে! এমনকি এই গোষ্ঠীর কজনেই বা জানেন সরকার কর্তৃক নির্ধারিত কোটার ব্যাখ্যা কি?

 

প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সরকারি প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে এক শতাংশ কোটা রাখার যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে তাতে বর্তমানে কোটার কত শতাংশ হয়, ৫৫ নাকি ৫৬? এই প্রশ্নের উত্তর কেউ জানেন না। একেক জনের একেক ব্যাখ্যা হলেও অবশেষে টিভি সাক্ষাৎকারে মুখ খুললেন সরকারের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। তিনি বললেন সরকার কর্তৃক নির্ধারিত প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এক শতাংশ কোটা ৫৫ শতাংশের মধ্যে। কিন্তু এ বিষয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রকাশিত গেজেটে যা আছে তা হল-

 

(ক) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারি প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে এক শতাংশ কোটা পূরণ করা হবে।

(খ) প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সরকারি প্রথম এবং দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে অন্যান্য কোটা খালি থাকা সাপেক্ষে এক শতাংশ কোটা পূরণ করা হবে।

 

তাহলে কি দাঁড়াল? গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য এক শতাংশ কোটা রাখার কথা বলেছেন সেটা কোথায়? তবে কি আমরা মিথ্যা আশ্বাস পেয়েছি? প্রতিবন্ধী গোষ্ঠীর সাথে যে নিষ্ঠুর, অমানবিক, অন্যায়, অবিচার করা হচ্ছে তা চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন নয় কি? প্রতিবন্ধী মানুষের দুর্ভোগ এখানেই শেষ নয়। সরকারি তৃতীয় শ্রেণির চাকরিতে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য ১০ শতাংশ কোটা পূরণ করার কথা থাকলেও তা পূরণ হয় না। দেশে আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই, সেটা আবার শুধু আমাদের বেলাতেই। দেশের শিক্ষিত প্রতিবন্ধী মানুষেরা আজ অসহায়। বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে মৌখিক পরীক্ষা দিয়েও চাকরি হচ্ছে না। বিভিন্ন সংগঠনের কাছে গিয়েও প্রতিকার পাওয়া যায় না। তবে কি আমরা এর কোন প্রতিকার পাবো না? সংবিধানের ২৮ (৪) অনুচ্ছেদে বলা আছে, নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশে অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না। সংবিধানে অনগ্রসর অংশের বিশেষ বিধান থেকে শুধুমাত্র প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী বঞ্চিত হচ্ছে যা চরম অমানবিক।

 

সম্প্রতি সিজিএতে জুনিয়র অডিটর নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী কোটায় কোন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে নিয়োগ দেয়া হয় নি। অনেক সংগঠনের কাছে অভিযোগ করেও কোন প্রতিকার পাওয়া যায়নি। টিআইবিতে অভিযোগ করা হলে তারাও অপারগতা প্রকাশ করে। কেউ কি বলতে পারেন কোথায় অভিযোগ করলে আমাদের এই দুর্ভোগের অবসান হবে? দেশে অনেক সংগঠন আছে যারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কাজ করেন তারা কিন্তু এর দায় এড়াতে পারেন না। কিন্তু দুঃখ লাগে যখন দেখি দিবস কেন্দ্রিক র‌্যালি, সভা-সমাবেশ, সেমিনার করেই দায়িত্ব শেষ করেন আমাদের জন্য কর্মরত সংগঠনগুলো। তাহলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির স্ব-উদ্যোগী সংগঠনগুলোর আরও বেশি সোচ্চার হওয়া উচিৎ নয় কি?

 

সরকার শুধু প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আইন পাশ করেন বাস্তবে যার কোন প্রতিফলন নেই। তারা যদি সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকেন তাহলে তাদের প্রতি রাষ্ট্রের এত অবহেলা কেন? সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা ছাড়াও তারা যে সমাজে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। অপরদিকে বিসিএস থেকে শুরু করে সরকারের যাবতীয় নিয়োগ পরীক্ষাতেও বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেন এই শিক্ষার্থীরা।

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় প্রথম কোটা ব্যবস্থা চালু করলেও তাতে প্রতিবন্ধী কোটায় কোন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের নেয়া হয়নি। সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় অন্যান্য কোটার শিক্ষার্থীরা যে নূন্যতম নম্বর পেয়ে উর্ত্তীণ হন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের পরিপন্থী।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বলেন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণ আমাদের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এমনকি তার সরকার প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, সরকার কর্তৃক নেয়া এই পরিকল্পনা বা পদক্ষেপগুলোর প্রতিফলন আমরা কবে দেখতে পাবো? দেশের সরকার, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, বেসরকারি এনজিও সংস্থা ইত্যাদি এই দায় এড়াতে পারে না।