‘নতুন শিক্ষা ভবন নির্মাণে একীভূত নির্দেশনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভা

10

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন শিক্ষাভবনগুলোতে উপেক্ষিত প্রবেশগম্যতা

 

 

অপরাজেয় প্রতিবেদক

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত এক পরিপত্রে নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভবন নির্মাণকালে অনুসরণীয় বিষয়াদিতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীবান্ধব ব্যবস্থাপনার উল্লেখ না থাকায় সম্প্রতি ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংগঠনগুলোর মাঝে।

 

অভিযোগে উঠেছে ২০১০ সালে শিক্ষানীতি অনুযায়ী একীভূত শিক্ষা বাস্তবায়নে সকল ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বাধামুক্ত অংশগ্রহণের নির্দেশনা ছিল। কিন্তু সরকারের আন্তরিক স্বদিচ্ছা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব আইন প্রণীত হওয়া সত্ত্বেও এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যাপক অনীহা প্রকাশ পেয়েছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ নির্দেশনা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবান্ধব করতে প্রতিবন্ধী নাগরিক সংগঠনের পরিষদ (পিএনএসপি) এবং বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্যা চেঞ্জ এ্যান্ড অ্যাডভোকেসি নেক্সাস (বি-স্ক্যান) এর যৌথ উদ্যোগে ‘নতুন শিক্ষা ভবন নির্মাণে একীভূত নির্দেশনা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এই অভিযোগগুলো উঠে আসে।

 

গত ২২ আগস্ট, ২০১৫ পিএনএসপি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, সিআরপিডি শরীক রাষ্ট্র হিসেবে একীভূত সমাজ বিনির্মানে সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্ত সহ (রিজেনেবল একমোডেশন), সার্বজনীন পরিকল্পনার (ইউনিভার্সাল ডিজাইন) ভিত্তিতে সকল ভবন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব বা তাদের প্রবেশগমন উপযোগী করে তোলা সরকারের দায়িত্ব। এছাড়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এবং  প্রস্তাবিত জাতীয় ইমারত নিমার্ণ বিধিমালা-আইন ২০১৫ অনুযায়ী সকল মানুষের প্রবেশগম্যতা ও ব্যবহার উপযোগীতা নিশ্চিতে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা নেয়া না হলে ভবিষ্যতেও এমন অবহেলাই প্রকাশ পাবে।

 

সভার প্রধান অতিথি বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ জাতীয় ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ২০১৫ কনসালটেন্ট ড. জেবুন নাসরীন আহমেদ গণস্থাপনার নকশা অনুমোদন প্রদানকারী সংস্থাগুলোতে সার্বজনীন প্রবেশগম্যতা অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, রাজউক এবং সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান যারা স্থাপনার নকশা নিয়ে কাজ করেন এবং অনুমোদন দেন তারাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব চাহিদা পূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করবেন।

শিক্ষা ভবনে প্রবেশগম্যতা শুধুমাত্র শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য নয় উল্লেখ করে পিএনএসপি এর সভাপতি এম ওসমান খালেদ বাংলা ইশারা ভাষায় বক্তব্য প্রদানকালে বলেন, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ এবং শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের জন্যেও চাহিদার ভিত্তিতে ভবনে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বিশেষত শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষের বিষয়টি অবহেলিত সবক্ষেত্রেই।

 

বিশেষ অতিথি সুইড বাংলাদেশ এর সভাপতি জওয়াহেরুল ইসলাম মামুন বলেন, আলোচিত সমাধানগুলো আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবায়নের অভিষ্টে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রাণালয় ছাড়াও অন্যান্য দায়িত্বরত মন্ত্রাণালয়ে প্রবেশগম্যতার বিষয়ে পরিপত্র জারি করতে হবে। বিশেষত সমাজকল্যাণ মন্ত্রাণলয়ের অধীন স্থাপনাগুলোর জন্য কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ক্রীড়া কমপ্লেক্স।

সার্বজনীন প্রবেশগম্যতা মাথায় রেখে স্থপতিদের নকশা করার আহবান জানিয়ে মতবিনিময়কালে স্থপতি সাঈদা সুলতানা এ্যানি বলেন, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পিএনএসপি এর এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আইন করলেই হবে না তার বাস্তবায়নে মনিটরিং ব্যবস্থাও জোরদার করা প্রয়োজন।

পিএনএসপি এর পরিচালক রফিক জামান তার বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ সংবিধানের শিক্ষার অধিকার ও বৈষম্য বিরোধী অবস্থান থেকে প্রতিবন্ধী মানুষের শিক্ষার সুযোগ এবং এই অবকাঠামোগত অবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ও প্রকৌশল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শিপলু হাওয়ালাদার জানান হুইলচেয়ার ব্যবহারের কারণে তার শিক্ষা জীবন প্রতি পদক্ষেপেই বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তবুও প্রতিকূল পরিবেশে লড়াই করেই মূলধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়েছেন এবং ঢাবির কম্পিউটার ও প্রকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তিনি সিইসি বিভাগে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের জন্য অ্যাডভোকেসি করছেন এবং আশা করছেন আগামী ছয় মাসের মধ্যে কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে র‌্যাম্প নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

মতবিনিময়কালে অন্যান্য বক্তারা জানান, নতুন স্থাপনায় প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের পাশাপাশি পুরাতন ভবনগুলোকেও সংস্কার করতে হবে। এছাড়া উপকুলীয় সাইক্লোন সেন্টারের স্কুলগুলো এবং তৃণমূল পর্যায়েও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবান্ধব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণে উদ্যোগী হতে হবে। শ্রেণিকক্ষে লাইট, সাউন্ড, নিরাপদ আসবাবপত্র এবং খেলার মাঠ সবার উপযোগী করা এবং ইনডোর গেমস এর ব্যবস্থা রাখতে হবে।

বিশেষত অভিযোগ এসেছে সবধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নেয়া নীতিমালায় শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী মানুষেরা অবহেলিত। আবাসিক হল, রান্নাঘর, খাবারস্থানসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য কক্ষগুলোও প্রবেশগম্য করার তাগিদ জানিয়েছে সংগঠনগুলো।

 

উল্লেখ্য, ফুটপাত থেকে শিক্ষা ভবনগুলোতে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিতের দাবী উঠে। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ যা থাকা প্রয়োজন- সকল ফুটপাত এবং মেঝে বা পথ অপিচ্ছিল, দৃঢ়, মসৃন করার পাশাপাশি ও মেঝেতে উচ্চতার তারতম্য থাকলে র‌্যাম্প, লিফট ছাড়াও বিপরীত রঙের সঠিক ব্যবহার। সকল প্রবেশগম্য পথের নির্দেশনা, দুইজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারি ব্যক্তির পাশাপাশি চলাচল এবং হুইলচেয়ার নিয়ে ঘোরার মত পর্যাপ্ত স্থান। প্রতি তলায় একটি বা সর্বমোট টয়লেটের নূন্যতম ৫%  প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধবকরন। র‌্যাম্পে হ্যান্ড রেইল ও গ্র্যাব বার, প্ল্যাটফর্ম লিফট, চেয়ার লিফট এবং মূল ভবনের লিফটে ফ্লোর এনাউন্সমেন্ট রাখা।

উল্লেখিত সকল ব্যবস্থাই জাতীয় ইমারত বিধিমালা আইন অনুযায়ী সঠিক মাপ মেনে তৈরির দাবী জানানো হয়। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকবান্ধব নতুন শিক্ষা ভবন নিমার্ণ নিশ্চিতে সকলের মতামতের প্রেক্ষিতে গৃহীত সুপারিশমালা ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রাণলয়ে পেশ করা হয়েছে।

সারা দেশ থেকে আগত সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিবন্ধী মানুষের উপস্থিতিতে পিএনএসপি এর সাধারণ সম্পাদক সালমা মাহবুব এর স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে সভা শুরু হয়। পিএনএসপি এর সভাপতি জনাব এম ওসমান খালেদ এর সভাপতিত্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএনএসপি এর স্বেচ্ছাসেবক ও বাংলাদেশ ভিজ্যুয়ালি ইম্পেয়ার্ড পিপলস সোসাইটি (ভিপস) এর যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ।

 

জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থা (এনজিডিও), মুক্তি প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা, রংপুর বধির সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন এর প্রতিনিধিবৃন্দের পাশাপাশি আরও ছিলেন এনজিও প্রতিনিধিগণ। ইশারা ভাষায় দোভাষীর দায়িত্ব পালন করেন সোসাইটি ফর দ্যা ডেফ এ্যান্ড সাইন ল্যাংগুয়েজ ইউজার্স (এসডিএসএল) এর সমন্বয়ক আবু হানিফ মুহাম্মদ ফরহাদ।