প্রতিবন্ধী মানুষের ভাগ্যবিধাতা সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত

16

 

মাননীয় অর্থমন্ত্রীর প্রত্যাশা সরকারের চলতি মেয়াদের শেষে দেশের সকল ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তন ঘটাতে যাচ্ছে উন্নয়নশীল বাজেটের প্রণয়ন। বিশেষত বাজেট ২০১৫-১৬ এর ফলে সারাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে। সকলেরই স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ঘাটতি হবে না কারণ কর্মসংস্থানের ব্যবস্থার মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন হবে।

 

দেখা যাচ্ছে তিনি প্রত্যাশা করছেন চলতি বাজেট সত্যিই একীভূত সমাজ বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে। একীভূত বাজেট প্রণয়নের ফলে মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো নিশ্চিত হতে যাচ্ছে দেশের নাগরিকদের। বঞ্চিত ও দুর্দশাগ্রস্থ জনগণও আছে এতে।

কিন্তু আসলেই কি তাই?!

 

আমরা দেখি, বাজেট বক্তব্যে প্রতিবছর কিছু নতুন শব্দের অবতারণা হয়। যেমন ইনক্লুসিভ গ্রোথ, ফিনান্সিয়াল ইনক্লুশন, ইনক্লুসিভ বাজেট বা একীভূত বাজেট। সরকার প্রতিনিধিগণ একীভূত অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়ে চমৎকার সব শব্দের চয়নে মন ভুলানো বক্তব্য রাখেন, অথচ একীভূত সমাজের কাঠমোর কণাটুকুও যখন দেখা যায় না তখন সত্যিই একীভূত সমাজ, একীভূত বাজেট, একীভূত উন্নয়ন এই শব্দগুলো আমাদের প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনে আদৌ কী কোন প্রভাব রাখছে কিনা ভাববার রয়েছে বটে!

২০০১ সালের কল্যাণ আইনের সময়কার বক্তব্যগুলো হয়তো প্রতিবন্ধী মানুষের মনের দুঃখ খানিকটা মেটাতো। কিন্তু কয়েক বছরের মাথায় জাতিসংঘ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার সনদ (সিআরপিডি) এলো। তারও কয়েক বছর পর হালের সময়ে আমরা কল্যাণ আইন থেকে বেড়িয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ পেয়েছি। যে আইনে বলা হচ্ছে প্রতিবন্ধী মানুষেরা সর্বক্ষেত্রে সমান আইনি স্বীকৃতি পাবে। সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাষ্ট্রীয় ইত্যাদি ক্ষেত্রেও পূর্ণ ও কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করবে। তাদের শিক্ষা মূলধারায় নিশ্চিত হবে। প্রবেশগম্যতা থাকবে সর্বক্ষেত্রে। সহায়ক ব্যবস্থাও থাকবে যানবাহনে। কিন্তু আইন বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের যেভাবে কাজ করা দরকার তেমন তাগিদ খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। এমন কি প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য যে নতুন দু’টি আইন এসেছে তার বিধি প্রণয়নের ঘোষণা ছাড়া ইতিবাচক সাড়া মেলে নি আজও।

 

তাহলে অধিকার ও সুরক্ষা আইনের নামে দেশে আসলে কী হচ্ছে?! মৌলিক অর্থে যা প্রয়োজন প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সেই সামান্য প্রতীকি বাস্তবায়নও ছিলো না বাজেট ঘোষণায়। তাহলে কিভাবে এই বাজেটকে একীভূত বলা যায়, যে বাজেটে প্রতিবন্ধী মানুষেরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় শুধু মাত্র একটি মন্ত্রণালয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে। সমাজের কল্যাণে নিয়োজিত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধী মানুষের ভাগ্যবিধাতা যেনো! শিক্ষা, ক্রীড়া, বিনোদন, স্বাস্থ্যসেবা, নারী-শিশু বিষয়ক এবং অধিকার তথা আইনসমূহ সকল কিছু উক্ত একটি মন্ত্রণালয়েরই অধীনস্থ। অন্যান্য কোন মন্ত্রণালয়ই প্রতিবন্ধী মানুষের জন্যে অর্থ বরাদ্দের চাহিদা তুলে ধরে না।

কিন্তু এ কিভাবে সম্ভব? সিআরপিডি সনদের অনুসমর্থনকারী শরীক রাষ্ট্র হয়েও বাংলাদেশে দিনের পর দিন এহেন বৈষম্য ঘটে যাচ্ছে, আর প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কর্মরত উর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞ সকলেই মুখে কুলূপ এটে বসে আছেন! কিন্তু কেন?!

 

এদিকে স্বয়ং সরকার এবং সরকার সংশ্লিষ্ট বিশেষত অর্থমন্ত্রীসহ সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী, সরকারি উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ বিগত সময়ে বেশ কিছু মন্ত্রণালয়ের আওতায় বরাদ্দের অঙ্গীকার করেছিলেন। তাহলে কেন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার সত্ত্বেও বারেবারেই একই প্রবঞ্চনার শিকার প্রতিবন্ধী মানুষেরা?

আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সমাজের মূলধারায় ক্রীড়া বা বিনোদন উপভোগের অধিকার অর্জিত হওয়া এখনো বহুদূরের কথা শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র প্রবেশগম্যতা-যানবাহন সব দিকেই বঞ্চিত তারা।

 

একটি হুইলচেয়ার প্রবেশগম্য বাস রাস্তায় নামাতেই আমাদের সরকারের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিআরটিসি কর্তৃপক্ষের গলদঘর্ম অবস্থা। কবে কোনকালে ১০০ বাস আমদানি প্রসঙ্গে দয়া পরবশ হয়েই সম্ভবত কেউ বলেছিলেন তন্মধ্যে ১০টি বাসকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব করা হবে। বাতাসে মিলিয়ে গেছে সেই ঘোষণা! অথচ বাজেট ঘোষণায় দেখতে পাই উন্নত পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কথা ভেবে নানান পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে। প্রতিবন্ধী মানুষের নিরাপদে চলাচলের জন্য ফুটপাত এবং প্রবেশগম্য গণপরিবহনের মত ক্ষুদ্র সমস্যা সমাধানের পথ না মিটিয়ে সরকারের আগ্রহ দেখা যায় অলাভজনক ডেমু ট্রেন, আর্টিকুলেট বাস অথবা মেট্রোরেলের মতো বিশাল সব বিলাসী প্রকল্পের দিকেই ঝুঁকতে।

 

এদিকে বাংলা ইশারা ভাষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপনের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবহেলিত বাজেটে। এবার প্রথমবারের মতো শিশু বাজেট ঘোষণা হলো কিন্তু প্রতিবন্ধী শিশুরা এখানে বঞ্চিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় অপ্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য নানা প্রকল্প গৃহীত হলেও প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্রসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাগুলোও এই খাতের অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যখাতে না হয় বরাদ্দ এলো না। কিন্তু বিশেষায়িত স্বাস্থ্যখাতে অথবা জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল ও ইএনটি হাসপাতাল ইত্যাদির মতো কিছু জায়গায় আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরা কিছু পাই না। সত্যিকার অর্থে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে না। তবে ইদানিংকালে আবার কিছু এনজিও যেমন সোসাইটি ফর এসিসট্যান্স টু হিয়ারিং ই¤েপয়ার্ড চিলড্রেন (সাহিক), সেন্টার ফর রিহ্যাবিলিটেশন অব প্যারালাইজড (সিআরপি) খুব সামান্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে। কিন্তু এমন ছোটখাট বরাদ্দের কারণে দেশ ব্যাপি প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাস্থ্যসেবা মূলক যে কর্মকান্ড হওয়া উচিৎ তা সম্পুর্ণ বন্ধ। সিআরপি বা সাহিক নিশ্চয় সারা দেশের প্রতিবন্ধী মানুষের চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। সারা দেশের বিশাল এই জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবামূলক চাহিদাপূরণে জন্য সরকারের কি কোন দায় দায়িত্ব নেই?

 

সরকার আমাদের অধিকার সুরক্ষায় মুখরোচক আইন তৈরি করেন আর সে আইন বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ তো পায়ই না, উল্টো জমকালো আয়োজনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অধিদফতর উদ্বোধন করে আসেন স্বয়ং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে যে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বইতে এই অধিদফতর বাস্তবায়নের উল্লেখ্য থাকে সেই তিনিই  প্রতিবন্ধী মানুষের সাথে বৈঠককালে তাদের মুখে অধিদফতরের নাম শুনে চমকে ওঠেন! বিস্মিত হোন বা সরকারের দ্বৈতনীতি ভাবুন এমনটাই বাস্তবে ঘটছে।

২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে এই অধিকার ও সুরক্ষা আইন পাওয়ার পর আসলে প্রতিবন্ধী মানুষের মনে খানিকটা আশা জাগে এরপর অন্তত বাজেটে মানুষের মৌলিক যে অধিকারগুলো রয়েছে সেসব পূরণের লক্ষ্যে অর্থ বরাদ্দ আসবে তাদের জন্যেও। সারা দেশের প্রতিবন্ধী মানুষের সমাজের মূলধারায় অন্তত শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অন্যান্য সকল খাতে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বরাদ্দ পাওয়ার দ্বার খুলে গেলো বুঝি।

 

দুঃখজনক হলো এসব ভারী কথা কেবল আইনি কাগজের ফাইলেই আবদ্ধ থাকে। সব কিছুতেই সমাজকল্যাণের দ্বারস্থ হতে হয় আমাদের! যদি অপ্রতিবন্ধী মানুষের স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ক্রীড়া খাতে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক শিক্ষার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইত্যাদি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক মন্ত্রণালয় বরাদ্দ পায়, প্রতিবন্ধী মানুষের কেন সকল কিছুর জন্যেই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে যেতে হবে? প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে রাষ্ট্রের এই প্রবঞ্চনার আদৌ কি শেষ হবে? অন্তত ন্যায্য অধিকারের বাস্তবায়ন পেলে হয়তো এই ক্ষোভ পুঞ্জিভূত মেঘ হয়ে বাংলাদেশের আকাশে ভেসে বেড়াতো না!