বিশ্ব মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস ২০১৫

 

শর্মি রায়

 

৭ অক্টোবর, ২০১৫ বিশ্ব সেরিব্রাল পলসি (সিপি) বা বিশ্ব মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দিবস। এই দিনে বিশ্বের অন্যান্য দেশে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং তাদের অধিকার বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দিবসটি ব্যাপক গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়।

 

আমাদের দেশেও দিবসটি পালিত হয় তবে তেমন ব্যাপকভাবে নয়। এছাড়া অন্যান্য প্রতিবন্ধী মানুষের মত মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত বা সিপি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্বাধীনভাবে মত প্রকাশে সক্ষম এমন ধারণাই এদেশে গড়ে উঠে নি। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা তার পরিবারও জানেন না, একজন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিজের অধিকার বিষয়ে মত প্রকাশ করতে পারেন। মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত সংগঠন গড়ে তোলার বিষয়েও তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে চার ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে বছর দুয়েক আগে একটি আইন পাশ হয়। নিউরো ডেভলাপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুরক্ষা ট্রাষ্ট আইন ২০১৩ নামের এই আইনে অটিস্টিক ব্যক্তি, ডাউন সিন্ড্রোম ব্যক্তি, বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং সেরিব্রাল পলসি বা মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির উন্নয়নের কথা উল্লেখ করা হলেও আমাদের দেশের মস্তিস্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণের অধিকার বিষয়ে এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনো তেমন কাজ হচ্ছে না।

 

সমাজে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে সর্ব প্রথম ২০১২ সাল থেকে বিশ্ব মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত দিবস উদযাপন শুরু হয়। সারা পৃথিবী জুড়ে ১৭ মিলিয়নের বেশি মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে। তবে দরিদ্র ও অনুন্নত দেশগুলোতে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ দরিদ্র ও উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে গেলেও মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি এবং এদেশে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী শিশু হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এর কারণ গবেষনায় স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে মায়ের বয়স কম হলে বা বাবা মায়ের বয়সের ব্যবধান বেশি হলে অথবা প্রসবকালীন সমস্যা হওয়ার কারণে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী শিশুর জন্ম হয়। আর এদেশে বেশির ভাগ মেয়েদের ১৮ বছরের নীচে বিয়ে হয়ে যায়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার দেয়া সূত্রমতে আমাদের দেশে বাড়িতে গর্ভবতীর নারীর প্রসবের হার সরকারি জরিপ মতে ৪৫ ভাগ এবং বেসরকারি মতে ৬০ ভাগ। এদের মধ্যে বেশিরভাগ গর্ভবতী নারী অদক্ষ ধাত্রি দ্বারা সন্তান প্রসব করে।

 

এছাড়া বলা হয়ে থাকে, জন্মের আগে বা পরে অথবা কোন রোগ যেমন জন্ডিস, টাইফয়েড হওয়ার ফলে অপরিণত মস্তিষ্কে আঘাতের কারণে শিশুর মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত হয়। সবচেয়ে বেশি মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত এর কারণে শিশুরা প্রতিবন্ধিতার সম্মুখিন হয়। তবে সব শিশুকে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত একইভাবে প্রভাবিত করে না। অপরিণত মস্তিষ্কে আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের কোন অংশে ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী একটি শিশু শারীরিক, মানসিক, দৃষ্টি, শ্রবণ, বাক প্রতিবন্ধী হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে ৩ জন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত শিশুর মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু হয় ১ জন। প্রতি ২ জন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত শিশুর মধ্যে ১ জন হয় মৃদু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু এবং ৫ জন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত শিশুর মধ্যে ১ জন গুরুতর বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশু হয়। ৪ জন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত শিশুর মধ্যে ১ জন শিশুর খিঁচুনি হয়। ১০ জন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত শিশুর মধ্যে দৃষ্টিহীন প্রতিবন্ধী শিশু হয় ১ জন। ২০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন শিশুর কানে বা কথা বলায় সমস্যা থাকে। ৫০ জন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত শিশুর মধ্যে শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী শিশু হয় ১ জন।

 

মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত এর চিকিৎসা একদিনের নয় দীর্ঘদিনের। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে, এমন কি আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতেও মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত চিকিৎসার ক্ষেত্রে অনেক উন্নত। সেদিক থেকে বাংলাদেশে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত এর চিকিৎসা তেমন উন্নত মানের নয় এবং এ চিকিৎসা উন্নত করার ব্যাপারে তেমন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। বিশেষত প্রাপ্ত বয়ষ্ক মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির চিকিৎসা সঠিকভাবে হচ্ছে না। যেভাবে থেরাপি দেয়া প্রয়োজন সেভাবে হচ্ছে না।

সিপি সম্মুখীন শিশু থেকে প্রাপ্তবয়ষ্ক ব্যক্তিদের নানা ধরণের থেরাপি প্রতিদিন দেয়া প্রয়োজন। যেমন- ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনালথেরাপি, স্পিচথেরাপি, হাইপোথেরাপি, মাসাজথেরাপি, মিউজিকথেরাপি, আচরণগতথেরাপি, প্লেথেরাপি, ভোকেশনালথেরাপি। এছাড়া প্রয়োজন উন্নত মানের সার্জারি। বাইরের দেশে উন্নত মানের সার্জারি ও উপরে উল্লেখিত থেরাপি নিয়মিত দেয়ার মাধ্যমে একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারি প্রাপ্তবয়ষ্ক মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিও পুনরায় হাঁটাচলা করার ক্ষমতা অর্জন করার সম্ভাবনা রয়েছে। অথচ আমাদের দেশে এই ধরণের সার্জারি অনেক কম। যাও বা হয় তা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। থেরাপি চিকিৎসাও অন্যান্য দেশের তুলনায় ব্যয়বহুল।

 

এদেশে মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত ব্যক্তিদের অধিকার অর্জনে যেমন ভাবনা নেই, তেমনি আবার প্রচুর ভ্রান্ত ধারণাও রয়েছে জনমনে। যেমন অনেকেই মনে করেন সিপি সম্মুখীন মানুষ মানেই গুরুতর প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। আবার অনেকেই ভাবেন সিপি মানেই মানসিক প্রতিবন্ধিতা দেখা দিয়েছে তার। এদেশের ডাক্তাররা বলেন প্রাপ্ত বয়স্ক সিপি সম্মুখীন মানুষেরা সুস্থ হয় না। অনেকেই সিপি ও অটিস্টিক এই দুইয়ের মাঝে পার্থক্য নেই বলে মনে করেন। এমন কি অটিস্টিক শিশুদের স্কুলগুলোতে অনেক সিপি শিশুকে ভর্তি করিয়ে তাদেরকে অটিস্টিক শিশুদের মতই থেরাপি দেয়া হয়।

 

অথচ সত্য হল এসবই ভ্রান্ত ধারণা। প্রথমত সব সিপি মানুষ গুরুতর প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হয় না। আবার সব সিপি মানুষই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নন। মস্তিষ্কের আঘাতের ধরণ অনুযায়ী একেক জন একেক রকম প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হয়। যেমন- শারীরিক, মানসিক, দৃষ্টি, শ্রবণ ও বাক ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত প্রাপ্তবয়স্ক সিপি সম্মুখীন মানুষেরাও নিজেদের হাঁটাচলা ঠিকভাবে চালিয়ে যেতে পারেন যদি তারা নিয়মিত ব্যায়াম ও সঠিক পরিচর্যা মেনে চলেন। তৃতীয়ত অটিজম ও সেরিব্রাল পলসি এই দুটি ভিন্ন ধরণের প্রতিবন্ধিতা। তবে ইউনাইটেড সেরিব্রাল পলসি সেন্টারের গবেষনায় দেখা গেছে ১০ ভাগ সিপি শিশুর মধ্যে অটিজম থাকে।

 

সিপি সংক্রামক নয়, এতে ব্যক্তির হাত-পা অবশ হয় না এবং তিনি ব্যথা, তাপ, ঠান্ডা ও চাপ বোধ করতে পারেন। এই মানুষের স্বাভাবিক জীবন-আয়ু থাকে। তারা আর দশজনের মত সক্ষম হয়। তবে অসচেতনতার কারণে সিপি অল্প থেকে বেশি, বেশি থেকে মারাত্মক আকারও ধারণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, কোন শিশুর সিপি হবার ফলে একটি হাত বা একটি পায়ে সমস্যা হল। সে এক পা টেনে টেনে হাঁটতে পারে অথবা হাঁটার সময় পায়ের গোড়ালি উচুঁ হয়ে থাকতে পারে। এ অবস্থাতেও তিনি স্বাধীনভাবে চলাফেরার শক্তি ধরে রাখতে পারেন। কিন্তু ডাক্তারের সঠিক চিকিৎসার অভাব ও পরিবারের অসচেতনতায় শিশুটি বড় হওয়ার সাথে সাথে তার দেহের অন্যান্য অংশেও এ সমস্যা বিস্তৃত লাভ করে। ধীরে ধীরে তার শরীর অক্ষম হয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে তিনি হুইচেয়ারে বসে পড়েন। দৈনন্দিন জীবনযাপন ও কাজকর্মের জন্য অন্যের সাহায্যের শরণাপন্ন হতে হয়। তাই সিপি সম্মুখীন শিশুর পরিবারের সকল সদস্যদের সিপি সম্পর্কে জানতে হবে এবং সচেতন হতে হবে।

 

সিপি শিশুর নিয়মিত ব্যায়াম প্রয়োজন। সিপি শিশুর ব্যায়াম যেন কোনভাবেই বন্ধ না হয় তা লক্ষ্য রাখতে হবে পরিবারকেই। পাশাপাশি তাদের শারীরিক ও মানসিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, নিউরোলজিষ্ট, ফিজিওথেরাপিষ্ট ও অকুপেশনালথেরাপিষ্ট এর ভূমিকা ব্যাপক। উন্নত বিশ্বে অর্থপেডিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, নিউরোলজিষ্ট, ফিজিওথেরাপিষ্ট, অকুপেশনালথেরাপিষ্ট এদের নিয়ে দল গঠনের মাধ্যমে সিপি শিশুরা স্বল্পমূল্যে সুচিকিৎসা এবং চলাচল, দৈনন্দিন জীবনযাপন কাজকর্মে প্রশিক্ষণ পাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে তারা আত্মনিরভর্শীল হয়ে ওঠে। এদেশেও সিপি ব্যক্তি, তাদের পরিবার এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও থেরাপিষ্ট দ্বারা তেমন দল গঠন করা অত্যন্ত  প্রয়োজন।

 

 

লেখকঃ  গ্রাফিক্স ডিজাইনার ও আইসি প্রোগ্রামার –

সুপার নোভা ইঞ্জিনিয়ারিং এবং

একজন মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি