লোকলজ্জার ভয় এবং সচেতন আমরা!

13

 

রবিন তন্চংগ্যা

 

নির্ভয়া থাকতে না পেরে শেষে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, আমি তাকে ভালোবাসি কিনা। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের দিকে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ তাকিয়ে থেকে বললুম, আমার রৌদ্রজ্জ্বল আকাশ ভালো লাগে, মেঘলা আকাশ নয়। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের কারণে জবাবটা আজ দেবো না, আরেকদিন। এই বলে প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলুম। চোখ তুলে আবার নামিয়ে নিলো সে, কিছুই বলল না।

 

হাঁটা শুরু করলুম, আবার। পাশাপাশি। নির্ভয়া আমার কলিগ। এখনো ¯পষ্ট মনে আছে সেদিনটির কথা যখন সে অফিসে জয়েন করলো। কথাবার্তায়, চালচালনে, রূপে-গুণে, উফ কী স্মার্টনেস…অফিসে সবাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়েছিল সেদিন। বস এসে একে একে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। পরিচয়ে কী খুশিই না হলাম আমি। তার ও আমার কাজের ধরণ একই হওয়ায় অন্য কলিগদের চেয়ে তার পাশাপাশি থাকার সুযোগটা হয়েছিল একটু বেশি। আমরা একসাথে রিপোর্ট আর ফাইলগুলো তৈরি করতাম, সে জন্যে ধীরে ধীরে বোঝাপড়াটাও ভালো হয়েছিল, আর এই সমস্ত কারণে অফিসে প্রায়ই আমাদের একসাথে থাকতে হতো। ধীরে ধীরে অফিস ছুটির পর পড়ন্ত  বিকালগুলোও একসাথে কাটাতে শুরু করলাম। এভাবেই ঘনিষ্টতা শুরু। আজ থেকে হয়ত আর সে ঘনিষ্টতা থাকবে না। অফিসে নির্ভয়াকে দেখতাম কাজ নিয়ে বেশ সিরিয়াস। অপ্রয়োজনে তেমন কথা বলে না। অন্যরা মনে করতো একটু দেমাগী, আমিও প্রথমদিকে তাই মনে করতাম। কিন্তু ঘনিষ্টতার সুবাধে মনে হলো  অন্যরা যা ভাবে আসলে সে তা নয়। অফিসের বাইরে তার ছিল একটি কোমল মন। যে মন দিয়ে বিশ্ব  জয় করতে চাইতো সে, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ পরিস্থিতিকে আরো বেশি ভালো করতে চাইতো। আর নিজের যতটুকু সামর্থ্য তা দিয়েই অন্যদের সাহায্য করে যেতো। প্রতিদানে তার কিছুই চাওয়ার ছিল না। মানুষের আনন্দ দেখে তার সে কী ভালো লাগত! হয়ত ভাষায় প্রকাশ সম্ভব নয়।

 

এককথায় ভালো মানুষ বলতে যা বুঝায় তার সবটুকু দিয়ে স্রষ্ঠা গড়েছিলো তাকে। আমরা পার্কে বসে বাদামের খোসা ছাড়তে ছাড়তে গল্পগুজবে পড়ন্ত বিকেলগুলো কাটিয়ে দিতাম। কখনো ফাস্টফুডের দোকানে বসতাম না আমরা। বসার সার্মথ্য যে ছিল না, তা নয়। যথেষ্ট ছিল। কিন্তু নির্ভয়া মনে করতো ঐ ফাস্টফুডগুলো ভোগবাদের জন্ম দেয়। আর ঐ ভোগবাদ থেকে বেড়িয়ে আসাও অনেক কষ্টের। তাছাড়া সে মনে করতো বেশি ভোগবাদে জড়িয়ে গেলে মানুষের কষ্ট বোঝাও কিছুটা কঠিন হবে। তাই আমরা এড়িয়ে চলতাম। ছুটির দিনে দূরে কোথাও ঘুরতে যেতাম আমরা। ভালোই কেটে যাচ্ছিল দিন। সে কবিতা আবৃত্তি করে যেতো। আমাদের যে প্রেম ছিল সেটাও না। কিন্তু পর¯পরের পাশাপাশি সঙ্গ যথেষ্ট উপভোগ করতাম। অস্বীকার করছি না, আমি ভালোও বেসেছিলাম। এবং তা আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়েও দিয়েছিলাম। কিন্তু নির্ভয়া বুঝেও নির্বিকার। তাই সময় নিচ্ছিলাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দেয়ার।

 

কিন্তু তার আগে আজ ঘটে যায় এক দুর্ঘটনা। ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয়েছি। নির্ভয়া হঠাৎ বলে তার কিছু বলার আছে আমাকে। আমি বললুম, বলে যাও। তার জবানীতে, রবিন, তোমাকে আজ আমার দুঃস্বপ্নের চেয়ে অনেক বড় দুঃস্বপ্নের কথা শুনাবো। মানসিকভাবে প্রস্তুতি নাও। এটা বলার পর সে শুরু করে, বছর দেড়েক আগে, এক জ্যোৎস্না  রাতে আমাদেরই প্রতিবেশী মানুষরূপী একদল নরপাষন্ড বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। আমরা তাদের যথেষ্ট আদর আপ্যায়নও করেছিলাম। তারপর কথা নেই, বার্তা নেই হুট করে পকেট থেকে অস্ত্র বের করে বাবা মায়ের দিকে তাক করে আমাকে ডেকেছিল। আমি বুঝতে পেরেছিলাম এর পরে কী ঘটতে যাচ্ছে  কিন্তু আমি পালাই নি। কারণ পালিয়ে গেলে আমার মা-বাবার জীবন শেষ। আমি অভিভাবকহীন হতে চাই নি। তাই!

 

তারা সারারাত আমার মা-বাবার সামনে আমার শরীরকে উপভোগ করেছিল। আমি চিন্তা করি নি, কাঁদি নি, শুধু ঘৃণাভরে তাকিয়েছিলাম। আর নীরবে সয়ে গেলুম। পরের দিন, বাবা মামলা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশেরা মামলা নেয় নি। বাবা ঐখানে থেমে থাকেন নি। গিয়েছিলেন আদালতে,  সেখানেও মামলা নেয় নি। কারণ যারা আমার শরীরকে ভোগ করেছিল তারা অনেক অনেক ক্ষমতাবান। তবুও যতটুকু সাধ্য করেছিলেন বাবা। কিন্তু পারেন নি। পরে সে ক্ষমতাবানরা সমাজ ছাড়া করে আমাদের। সব শেষে গ্রাম ছাড়া হয়ে এই শহরে বসত গড়েছি। কী দুঃসময় না গিয়েছিলো আমাদের। মাথা গোঁজার ঠাই ছিল না। তবুও টিকে থাকার সংগ্রাম করেছি আমরা। ধীরে ধীরে সয়ে এসেছি সেগুলো। তারপর হঠাৎ একদিন তোমাদের অফিসে চাকরি। খুব খারাপ লাগে মাঝে মাঝে তবুও এখনো যে বেঁচে আছি তার জন্যে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে হয়। তুমি অনেকবার জ্যোৎস্না উপভোগ করতে বলেছো। আমি প্রতিবারই না বলেছি। এখন সম্ভবত কেন না বলেছি বুঝতে পারছো!! কিছুই বলতে পারলাম না। শুধু মাথা নাড়লাম। তারপর ধীরে ধীরে সে জানতে চাইলো, আমি তাকে ভালোবাসি কিনা। আমি তার প্রশ্নের জবাবটা সুকৌশলে এড়িয়ে গিয়েছিলাম। কারণ আমার সমাজকে ভয়! কারণ আমি সতী নারী চাই। কারণ আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। আর নির্ভয়া তো সতী  নয়, অসতী। সমাজও মেনে নেবে না তাকে। ঐ ধরণের মেয়েকে ভালোবেসে ঝামেলায় যাওয়া আমার শখ নেই।

 

আমি নিশ্চিত জানি, মেয়েটি নিরাপরাধী, তবুও সমাজের মতো আমারো ধারণা মেয়েটি অপরাধী! কারণ সে পালায় নি কেন? অথচ আমি সমাজ নিয়ে কথা বলি। সমাজ পরিবর্তনের কথা বলি। এভাবেই কী তবে সমাজ পরিবর্তন??