হার না মানা উদ্যমী এক শিক্ষক

 

মুন্না আজিজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:

 

এস.এম.সোহেল, একজন সংগ্রামী মানুষের নাম। লড়াকু মানুষের নাম। শারীরিক প্রতিবন্ধিতা ও নানান প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে তিনি আজ প্রতিষ্ঠিত সফল একজন। বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়াস্থ সাবেরা সোবহান সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারি শিক্ষক (ইংরেজী) পদে কর্মরত আছেন। তবে জীবনের এই পর্যায়ে আসা এতটা সহজ ছিল না।

 

তিনি যখন পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র তখনই তার জীবনে নেমে আসে মহাপ্রলয়। ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় দৃষ্টি শক্তি হারিয়ে ফেলেন চিরদিনের জন্য। জীবনে নেমে আসে অমাবস্যার অন্ধকার। কিন্তু তার ছিল দৃঢ় মনোবল ও আত্মবিশ্বাস। ছিল অন্ধকারকে জয় করে আলোয় আসার তীব্র আকাঙ্খা। ব্রেইল পদ্ধতির সাহয্যে নতুন করে শুরু করেন পড়াশোনা। এগিয়ে যাওয়ার পথে তাকে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করেন তার মা ও তার প্রিয় শিক্ষক সেলিম স্যার। স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন ইংরেজী বিষয়ে পড়াশোনা করবেন এবং বি.সি.এস পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে সরকারি কলেজে শিক্ষকতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেবেন। তার এ স্বপ্নের পথ ছিল দুর্গম ও অমসৃণ। প্রতি পদে মুখোমুখি হয়েছেন নানাবিধ প্রতিবন্ধকতার। কিন্তু কোন কিছুই তার আত্মবিশ্বাসে এতটুকু চির ধরাতে পারে নি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হওয়ার পর তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে। সেখানে তিনি সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, ফখরুল আলম এবং রুবিনা খান -দের মতো আদর্শ শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করেন। অতিক্রম করেন স্বপ্নের প্রথম ধাপ। ইতোমধ্যেই জানতে পারেন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কোন সুযোগ নেই। এতে দমে না গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি শুরু করেন প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম। প্রথম দিকে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছাত্র সংঘ) এর সভাপতি এবং পরবর্তীতে (বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ছাত্র সংঘ) এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

 

এই সময়ে তিনি বিসিএস পরীক্ষায় সকল ধরণের প্রতিবন্ধী মানুষের সম অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এবং পাশাপাশি দেশের সর্বোচ্চ ক্যাডার সার্ভিসে সকল ধরণের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ৫ শতাংশ কোটার দাবীতে গড়ে ওঠা তীব্র আন্দোলনে অংশ নেন। এই আন্দোলনেরই অংশ হিসেবে ২০০৬ সালে তৎকালীন সংস্থাপন সচিব এবং সমাজ কল্যাণমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে সংগঠনের পর থেকে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন এবং ২০০৯ সালে ২৯ তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী মানুষের অংশগ্রহণের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি আবেদন পত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দেন। ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্র“য়ারি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক (ইংরেজী) পদে যোগদান করেন। যদিও এ সমস্ত আন্দোলনে অংশ নেবার পরেও শেষ অবধি তিনি বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

 

বর্তমানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তার কর্মজীবন অতিবাহিত করে চলেছেন। শিক্ষার্থীদের কাছে নিজেকে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চান। কর্মক্ষেত্রে এসেও তিনি নানাবিধ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছেন। রাষ্ট্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাকরি ক্ষেত্রে সুযোগ সৃষ্টি করলেও মাঠ পর্যায়ে কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছেন। এহেন পরিস্থিতির কারণে প্রতিবন্ধী মানুষেরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না যদিও। তবুও এই বিরূপ পরিবেশেই যুদ্ধ করেই টিকে থাকার চেষ্টা করে সবাই। এ অবস্থার উন্নয়নে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ করে গড়ে তুলেছেন বাংলাদেশ ভিজ্যুয়ালি ইম্পোয়ার্ড গভর্নমেন্ট এমপ্লয়েজ নেটওয়ার্ক (BVIGEN)| । তিনি এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

 

এ আন্দোলন সংগ্রামে তার শিক্ষার্থীদেরকে যুক্ত করার মাধ্যমে তিনি একটি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে চান। স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যতে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবেন এবং বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী মানুষের অবস্থান সুদৃঢ় করতে নেতৃত্ব দেবেন।