প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলোর সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা

19

 

 

বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী মানুষেরা বা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলো আদৌ কি সংগঠিত হতে পারছে? প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু আমরা মনে করি! এবং সংগঠিত হতে না পারার পেছনে বাধা কী রয়েছে?  — ইত্যাদি প্রশ্ন রাখা হয়েছিলো বিভিন্ন প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে। জানতে চাওয়া হয়েছিলো এ বিষয়ে তাদের ভাবনা।

সবার ভাবনায় ঘুরে ফিরে একটি কথাই উঠে এসেছে, স্বীয় স্বার্থ বা আÍ-প্রচারণায় ব্যস্ত না হয়ে কিংবা নিজেদের কাজগুলোকেই শুধু প্রচার না করে সবার উচিৎ একত্রিত হয়ে কাজ করা। ছোট কিংবা বড় ক্ষেত্রে যে যেভাবেই কাজ করুক না কেন সবাই আসলে আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরাই নিজেরা নিজেদের অধিকার অর্জনে কাজ করছি এ উদ্দেশ্য নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার অর্জনে ডিপিও সংগঠনগুলোর সংগঠিত হওয়া এবং নেতৃত্ব চর্চা অত্যন্ত জরুরী বলে মনে করছেন তারা। এই লক্ষ্য ঠিক রেখে সবাই সংগঠিত হয়ে একসাথে কাজ করতে পারলেই ব্যাপক উন্নয়ন সম্ভব। সম্পাদনায় –তানভীর আহমেদ ইসহাক

খন্দকার জহুরুল আলম

নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর ইনফরমেশন এন্ড সার্ভিসেস অন ডিজঅ্যাবিলিটি (সিএসআইডি)

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন সংখ্যায় খুব নগণ্য। তবে এই ডিপিওগুলো এক হলে জ্ঞানের পরিধি আরও বিস্তৃত হত। নিজেদের তথ্য ও ভাব বিনিময় বৃদ্ধি এবং সংগঠিত হওয়া সহজ হত। দুর্ভাগ্য, এখনো এদেশে তা হয় নি এবং ভবিষ্যতেও হবে এমন সম্ভাবনাও দেখছি না।

আমি দুটো বিষয়ে বলছি- জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করা এবং রিসোর্স প্রেজেন্টেশনে ভাল করা। প্রতিবন্ধী মানুষেরা সংগঠিত হলেই ডিপিওগুলোর উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। তবে ডিপিও এবং প্রতিবন্ধী মানুষেরাও নিজেদের জ্ঞান, পরিকল্পনা অন্যদের কাছে চলে যাবার ভয়ে বিনিময় করতে চায় না।

প্রত্যেকে আলাদা সত্তা, আলাদা স্বকীয়তা চায়। আমাদের অনেকের মধ্যে এক ধরণের কু-রাজনীতিপূর্ণ মনোভাব রয়েছে। আমরা কেউ চাই না অন্যরা আমাদের সমকক্ষ হোক। অ-প্রতিবন্ধী মানুষেরা চায় না প্রতিবন্ধী মানুষ নিজেরা কথা বলুক। তবে তরুণদের আধুনিক ধ্যান ধারণা, জ্ঞানবোধ আছে।

স্বাধীন কোন সংগঠন দেশে খুব একটা নেই। যেমন এডিডি এর- তৃণমূল নারী সংগঠন এবং এনজিডিও। তারা কখনোই তাদের নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারে নি। নিজেরাই নির্যাতিত, এডিডির ওপরেই নির্ভরশীল। ন্যাডপো, বিপিকেএস-এর অঙ্গসংগঠন হিসেবে তাদের অধীনে কাজ করেছে, কিন্তু কখনোই স্বাধীনতা পায় নি। এখন আমি খুব আশাবাদী নতুন ডিপিও নেটওয়ার্ক পিএনএসপি হয়তো ভাল কিছু করবে। এখানে সবাই নতুন। তাদের চিন্তাচেতনা ভিন্ন এবং জ্ঞানের পরিধিও ভাল। তাই এখনো পর্যন্ত বেশ ভাল অবস্থানে আছে।

 

জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরামের নেতৃত্বগত অবস্থান বিষয়ক ভাবনা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যেন এর বাইরে কিছু হবে না, এই কারণে ২০১২ সালে আমি ডিপিও আন্দোলন থেকে সরে গেছি। আমি এখনো আন্দোলনগুলোর কর্মী হয়ে অংশ নিতে চাই কিন্তু নেতৃত্বের পর্যায়ে যেতে চাই না।

প্রতিবন্ধী মানুষের সংগঠিত হওয়া তাদের একার পক্ষে সম্ভব না। অ-প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধী মানুষদের একসাথেই কাজ করতে হবে এবং লক্ষ্য রাখতে হবে নেতৃত্বটা যেন অ-প্রতিবন্ধী ব্যক্তির হাতে চলে না যায়। কোনভাবেই তারা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। শুধুমাত্র নেতৃত্ব হস্তান্তরের কারণে অনেক আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যায়। নেতৃত্ব ও গুণাবলি বৃদ্ধি বিষয়ে দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণ দরকার। এটি না থাকার কারণে মফস্বল শহরে বা তৃণমূল পর্যায়ে সেভাবে উন্নয়ন হয় নি।

নেতৃত্ব চর্চার জন্য সংগঠনগুলোকে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। যা না করে আমরা নিজস্ব ব্যক্তি সংগঠনকে প্রাধান্য দিতে চাই। দীর্ঘ ২১ বছর ফোরামের সভাপতি পদে থাকাকালীন কেউ জানতো না আমি সিএসআইডির নির্বাহী পরিচালক, ফোরামকেই প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টা করেছি। এখনকার নেতৃত্বে নিজস্ব সংগঠন বেশি গুরুত্ব পায়। এই ভাবনা প্রতিবন্ধী অপ্রতিবন্ধী মানুষের ক্ষেত্রে একই। নতুন প্রজন্ম এটা কাটিয়ে উঠতে পারলে পরিবর্তন সম্ভব।

 

এদেশের প্রতিবন্ধী মানুষেরা অর্থনৈতিকভাবে দরিদ্র ফলে নিজেদের সংগঠনের ভিত্তি মজবুত করতে নিজেরাই আর্থিক সহায়তা দেবে এটা বেশ কঠিন। আন্তর্জাতিক অনুদান সবসময়ই পেতে হবে এমন কোন কথা নাই। বাংলাদেশ সরকারের উচিত এবং আমাদের আইনও বলে এই সংগঠনগুলোকে সহযোগিতা দেয়া।

তবে বাংলাদেশের কর্পোরেট সেক্টরগুলো আমাদের অর্থায়ন করলেও সম্ভব। তাদেরকে আমরা ভাবাতে পারি নি এটা আমাদের ব্যর্থতা। প্রতিবন্ধী মানুষকে কেউ স্বীকৃতি দেয় না, সরকারও না। তাই সরকার এবং কর্পোরেট সেক্টর থেকে একে উন্নয়ন খাতে স্বীকৃতি দিয়ে অর্থায়ন করা দরকার।

বর্তমান আইন বাস্তবায়নে মানুষ খুব একটা লাভবান হবে না। কারণ এর পুরো ব্যবস্থাটাই অ-প্রতিবন্ধী মানুষের হাতে। এর বাস্তবায়নের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা দরকার। যেমন- প্ল্যানিং কমিশনের সাথে ৭ম পঞ্চবার্ষিকীর যে পরিকল্পনা, সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষকে অন্তর্ভূক্ত করা। সেভাবে পরিকল্পনা তৈরি করলে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষ ফায়দা পাবে, নতুবা এই আইন প্রতিবন্ধী মানুষের কোন কাজে আসবে না। আর আইনের কমিটিতেও কিন্তু প্রতিবন্ধী মানুষেরা নেই। বিশেষত নারী প্রতিবন্ধী মানুষেরও অংশগ্রহণ নাই। নারী অংশগ্রহণ বলা হলেও প্রতিবন্ধী নাকি অ-প্রতিবন্ধী উল্লেখ নেই।

বিধি প্রণয়ন বিষয়ে নতুন ডিপিও সংগঠনগুলোর নেটওয়ার্ক পিএনএসপি বেশ বড় সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে বিধিমালা আরও বিস্তৃতভাবে হওয়া দরকার ছিল। তাছাড়া আমার আশঙ্কা রয়েছে, জেলা পর্যায়ে কমিটিগুলোতে প্রতিনিধিত্বের চিঠি গেছে ঠিকই কিন্তু নেতৃত্বে যাবে কারা?

তাই প্রতিবন্ধী মানুষকে এই মূহুর্তে সংগঠিত করতে, তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকার উদ্যোগ না নিলে কোন অনুদান পাওয়া অসম্ভব। প্রতিবন্ধী মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানসহ অন্যান্য অধিকার বাস্তবায়নে সরকারকে আরো কাজ করতে হবে।

 

 

 

জীবন উইলিয়াম গমেজ

নির্বাহী পরিচালক, টার্নিং পয়েন্ট ফাউন্ডেশন

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন, অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মূল চাবিকাঠিই হল সংগঠিত হওয়া। সংগঠিত প্রয়াস প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ঘিরে সমাজে চিরায়ত ও ভ্রান্ত ধারণাগুলো ভেঙে দেয়। আলোচনা, পর্যালোচনা, ধারণার সংশোধন, পরিবর্তন বা দৃঢ়করণ, স্বপ্ন দেখা, লক্ষ্য নির্ধারণ, পরিকল্পনা গ্রহণ ও স্বপ্নের বাস্তবায়ন – এমন অনেক কিছুই হয় সংগঠিত হওয়ার ফলে। সংগঠনের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর যখনই উচ্চকিত হয়, তা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠে। একতাই বল, আমরা সবাই জানি।

আমার সীমিত অভিজ্ঞতার আলোকে এ ব্যাপারে বাধা ও করনীয়গুলো বলতে চাই। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে অভিন্ন ও দূরদর্শী লক্ষ্য থাকাটা খুব জরুরি। নিজের মতের সাথে অন্যের ভিন্নমত থাকতেই পারে। সহমত ও ভিন্নমত মিলিয়েই তো লক্ষ্য অর্জনের পথটি বাতলানো যায়। তাই দেশের অন্যান্য সংগঠন বা দলগুলোর মতো আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠন (ডিপিও) কিংবা তাদের নিয়ে সংগঠনগুলোর মতভেদ থাকলেও প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও অংশগ্রহণণের মূল বিষয়গুলোতে অবশ্যই সবাইকে এক হতে হবে।

সংগঠন মানেই শক্তি। এ শক্তিকে যাতে কোন বিশেষ ব্যক্তি বা মহল স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে। প্রতিবন্ধী মানুষের জীবনের নিয়ন্ত্রণ যেন অন্যদের হাতে না থাকে তার জন্য সচেতন হতে হবে। নেতৃত্বের বিকাশের পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের বিকাশে আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এর জন্য নতুনদের সুযোগ দিতে হবে। বর্তমানে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের সহযোগিতা করতে হবে। অগ্রজদের অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে হবে।

 

প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সুযোগ পায় একটা পর্যায় পর্যন্ত। তারপর যখন তার মধ্যে সম্ভাবনা দেখা দেয় তখনই বাধার শুরু। তার জন্য এগিয়ে যাওয়ার পথটা আরও বন্ধুর ও প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর কারণগুলো হতে পারে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দয়ার দৃষ্টিতে দেখা, তাদের সক্ষমতাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া এ ধরনের মান্ধাতার আমলের মানসিকতা আমাদের উন্নয়নকে বার বার বাধাগ্রস্থ করছে।

কাজের এই ক্ষেত্রটা এমনই যে, কোন দক্ষতা বা যোগ্যতা লাগে না। প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আবেগময়ী বক্তব্য, চোখ ভরা জল, গতানুগতিক কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়ে প্রচারে নামতে পারলেই হল। সমাজে মহৎ, বৈষয়িক লাভ ও উচ্চাসন পেতে আর বেগ পেতে হয় না। বরং সমাজের সাধারণ মানুষ তাদের সরল চিন্তা ও বিশ্বাস থেকেই এই অপপ্রচারকারীদের উপরে স্থান দেন। ওই প্রতিবন্ধী মানুষগুলোর জন্যই! অপপ্রচারকারীরা সমাজের এই উদারতাকে কাজে লাগিয়ে ওই ক্ষুদ্র মানসিকতার বলয়কে আরও পাকাপোক্ত করে তুলেন। বর্তমানে প্রতিবন্ধিতা আন্দোলনের অগ্রযাত্রায় এরাই বড় বাধা!

নারীদের প্রতিনিধিত্বের বেলায় শুধু পুরুষের অংশগ্রহণ হাস্যকর। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতিনিধিত্বে তাদের অংশগ্রহণ না থাকাটাও তাই। কিন্তু বাস্তবিকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনাময় ও যোগ্য নতুন মুখ থাকা সত্ত্বেও তাদের উন্নয়নে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারছেন না। এ যেন শিশুদের নাট্যমঞ্চের মতো যেখানে শুধু বড়রাই শিশুদের অভিনয় করে যাচ্ছে। আর শিশুরাই দর্শকের সারিতে! প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতিটি ক্ষেত্রে সক্রিয় হতে হবে। শুধু নামকাওয়াস্তে দু-একটা র‌্যা¤প, একটু প্রবেশযোগ্যতা ও কাগজে-কলমে প্রতিবন্ধিতার কথা থাকে। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও নেতৃত্বে প্রতিবন্ধী মানুষগুলোর বাস্তব অংশগ্রহণ খুব কম দেখা যাচ্ছে। মূলত, আমাদের প্রতিবন্ধী মানুষদের কাছ থেকে যেন প্রতিবন্ধিতাকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে – সচেতন ও অসচেতন দুভাবেই!

 

প্রতিবন্ধী ও অপ্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন, যারা বড় মন নিয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের চিনতে হবে। তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি দিয়ে যোগ্য স্থান দিতে হবে। আমার বিশ্বাস, আমরা লক্ষ্য অর্জন করতে পারবো।

অপরাজেয় এর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অনেক অনেক শুভ কামনা রইল।

 

 

বদরুল মান্নান

সাধারণ সম্পাদক, ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ফর মেন্টাল হেল্থ এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন

 

বাংলাদেশে মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী মানুষদের নিজেদের সংগঠন করার মত সুযোগ, যোগ্যতা ও স্থায়িত্ব নেই। তেমন অবস্থা এবং পরিবেশও নেই। মনোসামাজিক বলতে আমি আলাদা কোন সমাজ বলিনা। এই সমস্যা নিয়েও তারা চাকরি করছে। সংগঠন করার জন্য কিছু গুণাবলীর ও নিয়ন্ত্রণের দরকার হয় যা তাদের নেই। অনেকে চাকরি করছে যারা সংগঠন করার কথা প্রকাশ করতে পারছে না, প্রকাশ করলে হয়তো তাদের চাকরি চলে যেতে পারে। বাধাগুলো অতিক্রম করা গেলে হয়তো করা সম্ভব হত। একটা কেয়ার হোম করতে হলে তাও লুকিয়ে করতে হচ্ছে। সরকার তো অনুমতি দেবেই না, সমাজও দেয় না। সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। সবাই একত্র হয়ে কাজ করতে পারলেই বাধা থাকবে না, প্রতিবন্ধী মানুষদেরও উন্নয়ন হবে।

 

 

 

আশরাফুন্নাহার মিষ্টি

নির্বাহী পরিচালক, উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটি ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন

 

যখনই অপরাজেয় এর কোন একটি সংখ্যা আমাদের হাতে আসে তখনই প্রতিবন্ধী মানুষের কিছু অধিকার, কিছু দাবী, কিছু লড়াইয়ের বিষয়বস্তুু নতুন করে আলোড়িত করে। হয়তো কোন কোন ঘটনার সাথে ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা বহু বছর আগে হতে; কিছুু লড়াই হয়তো আমরা প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য লড়ছি চলমান আন্দোলনের হাত ধরে।

অপরাজেয় মানুষের চোখ খুলে দেয়! মনে করিয়ে দেয় প্রতিবন্ধী মানুষেরা জেগে উঠেছে। প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার ও বাস্তব ভিত্তিক চাহিদাগুলোকে দেশের মানুষদের সামনে আনে। যা প্রতিবন্ধী মানুষের আন্দোলনের পথকে শাণিত করে।

 

এককভাবে অধিকার অর্জন সম্ভব নয় কখনোই, তাই প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা সংগঠনগুলোকে সংগঠিত হতে হবে। তারা যদি একতাবদ্ধ না হন, তাহলে কোন দাবীই পূর্ণ হবে না। সংগঠিত হতে না পারার পিছনে বাধা হল আমাদের এখানকার কু-রাজনীতি। বেশিরভাগেরই নিজস্ব ব্যক্তি সত্তাকে সামনে নিয়ে আসার প্রবণতা থাকে। অপপ্রচারণা বা স্বীয় স্বার্থ থেকে বেড়িয়ে এসে সবাই একযোগে কাজ করতে পারলেই প্রতিবন্ধী মানুষের বিশাল উন্নয়ন সম্ভব। বাংলাদেশে কিছু ডিপিও নেটওয়ার্ক থাকা সত্ত্বেও ভিন্ন ভিন্ন ধারার আরও নেটওয়ার্কিং সংগঠন ভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে এই দেশে অবস্থান করছে। ন্যাডপো ও পিএনএসপি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরই সংগঠনের নেটওয়ার্ক। এডিডি এর দুইটা সংগঠন- এনজিডিও, এনসিডিডব্লিউ এরাও ডিপিও নেটওয়ার্ক। তাহলে চারটি একই ধরনের নেটওয়ার্কিং সংগঠন কাজ করছে। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে এমন যতগুলো সংগঠন আছে তাদের এক হয়ে অভিন্ন ধারায় কাজ করা উচিত। এই সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব প্রতিবন্ধী মানুষেরাই দিচ্ছে। এই মানুষগুলোই যদি এক না হয় সবার লক্ষ্যও এক হবে না। লক্ষ্য এক থাকলেই মূলত সব দাবী বা অধিকারগুলো অর্জন সম্ভব।

 

 

মহুয়া পাল

সহ-সভাপতি, এ্যাকসেস বাংলাদেশ

 

দাবী বা অধিকার অর্জনে প্রতিবন্ধী মানুষকে একসাথে একজোট হতে হবে। আমরা বা ডিপিও সংগঠনগুলো যদি একত্রিত হতে পারি তাহলেই এটা সহজ হবে। অনেক সময় আশঙ্কা থাকে, আমরা ডিপিওরা দরিদ্র। আমরা কিভাবে প্রতিবন্ধী মানুষের উন্নয়নে কাজ করব! কিন্তু আমাদের সবার কন্ঠ একত্রিত হলে এই দারিদ্রতা কমানো সম্ভব। অধিকার অর্জনের পথে সকল বাধাকে পেরিয়ে আমাদেরকেই নিজেদের উন্নয়ন করতে হবে, অন্যের আশায় বসে থাকলে চলবে না। আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো নেই। আমরা হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীরা চলতে পারব এমন একটাও প্রবেশযোগ্য পরিবহন নেই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে যে বা যারা যেই করুক না কেন সবার লক্ষ্য থাকতে হবে আমরাই (প্রতিবন্ধী মানুষেরা) করেছি। আমরা হয়তো আলাদা ভাবে কাজ করছি কিন্তু লক্ষ্য থাকতে হবে একটাই। তা হলো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়ন। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত যা কাজ হয়েছে/হচ্ছে তা আমরা প্রতিবন্ধী মানুষেরাই দিন-রাত পরিশ্রম করে করছি। আমিত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই সংগঠিত হওয়া সম্ভব। এভাবেই আমাদের অধিকার অর্জনে বড় বাধাগুলো পেরুনো সম্ভব হবে।

 

 

নাসিমা আক্তার

সভাপতি, জাতীয় তৃণমূল প্রতিবন্ধী সংস্থা 

 

আমি মনে করি প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত হওয়াটা দারুণ মহতী উদ্যোগ। প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে হলে তাদের অবশ্যই সংগঠিত হতে হবে। একার পক্ষে কখনোই অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে, যে সংগঠনে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে সেসব সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা বেশি। অ-প্রতিবন্ধী মানুষ প্রতিবন্ধী মানুষের দু:খ বোঝে না। তাই প্রতিবন্ধী মানুষকেই প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। আর যে জায়গাতে অ-প্রতিবন্ধী ও প্রতিবন্ধী মানুষ একসাথে যুক্ত হবে সেখানে প্রতিবন্ধী মানুষদের অস্তিত্বই থাকে না। সংগঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে প্রথমত বাধা পরিবার। পরিবার আমাদের ঘরে বন্দী করে রাখতে চায়। আমাদের অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে একজন আরেকজনের প্রতি হিংসাকেও বাড়িয়ে তুলি। অনেকে মনে করে আমার প্রতিষ্ঠানই সব করছে। অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কিছুই করে না। আমরা যারা প্রতিবন্ধী মানুষদের নিয়ে কাজ করি আগে আমাদেরকে একত্র হতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সংগঠনগুলো একত্র হয়ে অধিকার নিয়ে কাজ করতে পারে। যতদিন পর্যন্ত এক প্রতিষ্ঠান আরেক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা তৈরি করতে না পারবে ততদিন একত্রে কিছুই করা সম্ভব না। সুতরাং একমাত্র সংগঠিত হতে পারলেই সব অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।

 

 

সাত্তার দুলাল

নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতি (বিপিকেএস)

 

পৃথিবীতে ১০০ কোটিরও বেশি প্রতিবন্ধী মানুষ, সেই অনুপাতে বাংলাদেশে ১৫ ভাগের বেশি এই সংখ্যা। এত বিপুল পরিমান প্রতিবন্ধী মানুষদের সংগঠিত করতে না পারলে তাদের উন্নয়ন সম্ভব নয়। অধিকার বাস্তবায়নও সম্ভব নয়। সংগঠিত হতে হলে ডিপিও সংগঠনের মাধ্যমেই হতে হবে। সংগঠনগুলোর ক্ষমতায়নে তাদেরকেই থাকতে হবে। আমাদের দেশে যার যার সুবিধামত ডিপিওগুলোর ব্যাখ্যা করা হয়ে থাকে। ডিপিওদের শাসন ব্যবস্থা পরিপূর্ণভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে। যদিও কিছু কিছু সংগঠন নিজেদের সুবিধা মত ডিপিও এর সংজ্ঞা দেয়। তবে সংজ্ঞাটা হতে হবে, শতভাগ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত সংগঠন।

এই ধরণের সংগঠনের মাধ্যমেই সংঘবদ্ধ হওয়া যায়। কিন্তু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজেরাই বড় বাধা। কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থ লাভের জন্য সামগ্রিকভাবে প্রতিবন্ধী মানুষদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিবন্ধিতা কোনো পন্য নয় এটা উপলব্ধি করতে হবে সবাইকে। অনেক সংগঠনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদেরই অধিকার নেই। কোথাও শুধুমাত্র অফিসের অভ্যর্থনা কর্মী বানিয়ে রাখা হয় তাদের। কথা বলার বা সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা নেই।

 

প্রতিবন্ধী মানুষেরা যতদিন পর্যন্ত একত্রিত হতে না পারবে ততদিন পর্যন্ত অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা যাবে না। অধিকার অর্জন কোন আপোষ-মিমাংসায় হয় না। অধিকার অর্জনের জন্য আন্দোলন করতে হয়। কোন দাতা সংগঠনের অর্থায়নে আমরা কাজ করলে, এতে হয়তো সচেতনতা তৈরি হবে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে সব কিছুতে নিজেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। মূল কথা সবাইকে একত্রিত হতে হবে। তাহলেই সামগ্রিকভাবে অধিকার অর্জন সম্ভব।