প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র; উদ্দেশ্য-কাজে অমিল

11

 

হাসান মুন্না

 

সারা দেশের প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যকেন্দ্রগুলোতে সহজ প্রবেশের সুযোগ নেই প্রতিবন্ধী মানুষেরই। কেন্দ্রগুলো পরিচিতি পেয়েছে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও যৎসামান্য সহায়ক উপকরণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। যদিও অভিযোগ রয়েছে উপকরণের আবেদন দীর্ঘদিন ধূলোয় গড়ায়।

 

অডিওমিটার থাকলেও অডিওলজিস্টের ব্যাপক অভাব দেশজুড়ে। এদিকে দক্ষ কর্মী সংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন সেবা গ্রহীতাগণ। বেশিরভাগ কেন্দ্রে র‌্যাম্প নেই। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব নয় কেন্দ্রগুলোর একটি টয়লেটও। ফলে যে উদ্দেশ্যকে লক্ষ্য করে সরকার এই কেন্দ্রগুলো প্রতিষ্ঠা করেছে তা ব্যহত হচ্ছে। অপরদিকে মধ্যবর্তী দালাল, প্রভাবশালীদের কর্তৃত্ব, সর্বোপরি বিভিন্ন প্রকারের রাজনৈতিক চাপ ইত্যাদি প্রতিহত করা দরকার মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। সারা দেশের প্রতিনিধিদের সরেজমিন পরিদর্শন শেষে পাঠানো প্রতিবেদনে জানা যায়, ঢাকার মিরপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, নীলফামারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা, গোপালগঞ্জ ইত্যাদি কিছু কেন্দ্রে ইতোমধ্যে র‌্যাম্প যুক্ত করা হয়েছে। তবে চট্টগ্রাম, সিলেট, কুমিল্লা, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, মেহেরপুর, ময়মনসিংহ, রুপসা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরায় তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। নরসিংদীতে র‌্যাম্প, প্রবেশগম্য টয়লেট থাকলেও তা যথাযথ নিয়ম মেনে করা হয় নি। গোপালগঞ্জের টয়লেটটি প্রবেশ উপযোগী হলেও নোংরা থাকার কারণে তা ব্যবহারের অনুপযোগী। একই সমস্যা অন্যান্য বেশিরভাগ জেলার কেন্দ্রগুলোতেই দেখা গেছে।

 

মিরপুর কেন্দ্রের সিনিয়র কনসালটেন্ট (ফিজিওথেরাপি) ডাঃ তাহমিনা সিদ্দিকা জানালেন, প্রতিদিন গড়ে পঞ্চাশ থেকে পঞ্চান্নজন সেবা নেয়। পুরনো চল্লিশ জনের সাথে নতুন ১৫ জন সেবা নিলে গড়ে সাত জনই ঝুঁকিপূর্ণ হয়। তার মাঝে প্রাপ্ত বয়স্কের সংখ্যাই বেশি। অটিজম, সেরিব্রাল পালসি এমন রোগীও চিকিৎসা নিতে আসেন। তবে তিনি জানান মিরপুর কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অডিওলজিস্ট আছে।

জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ বিষয়ে বলেন, সেবা কেন্দ্রে নির্দেশনা রয়েছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সেবা আগে দিয়ে পরে ঝুঁকিপূর্র্ণ ব্যক্তিরা যেন সেবা পায়। আমাদের এই কেন্দ্রগুলো কিন্তু সকলের জন্যে। কেন্দ্রের শুধুমাত্র হাতে গোণা কমিটিতেই প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা থাকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটি কমিটিতে প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা, বাকিগুলোতে সবই সমাজসেবা অধিদফতরের কর্মকর্তারা আছেন। উপজেলা কমিটিতে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রয়েছেন কিন্তু আমাদের অন্যান্য কমিটি যেমন জাতীয় নির্বাহী কমিটিতে নাই।

 

এদিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রের কনসালটেন্ট ডা. শামীমা নাসরিন জানান, র‌্যাম্প করার জন্য বাড়ির মালিকের সাথে কথাবার্তা চলছে। সিলেট কেন্দ্রের পরিচালক জানান, ভাড়া বাসায় থাকার কারণে র‌্যা¤প করা সম্ভব হয় নি। বাড়ির মালিককে বলা হলেও তিনি সহযোগিতা করছেন না। অধিকাংশ কেন্দ্র কর্মকর্তার অভিযোগ ভাড়া বাসা হবার কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব হিসেবে তৈরি করা যাচ্ছে না।

একদিকে কেন্দ্রগুলোতে কর্মী সংকট অন্যদিকে যারা রয়েছেন তাদের কারোরই নেই যথাযথ প্রশিক্ষণ। ফলে সমস্যার মধ্যে পড়েন সেবা নিতে আসা প্রতিবন্ধী মানুষেরা। অডিও মিটার  চালানোর দক্ষ কর্মীর অভাবে শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষেরা একেবারেই বঞ্চিত হচ্ছেন সেবা প্রাপ্তি থেকে। তাদের শ্রবণ মাত্রা নিরূপণ ও সেবা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। অন্যান্য যন্ত্রপাতিও অব্যবহৃত রয়ে যাচ্ছে সেগুলোর ব্যবহার স¤পর্কে জ্ঞান না থাকার দরুণ। ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, উক্ত কেন্দ্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে নিয়ম বহির্ভূতভাবে অনেক উপকরণ সমাজের প্রভাবশালীদের দ্বারা বিতরণ করা হচ্ছে। অনেক সময় এখানে কর্মরত প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন প্রকারের রাজনৈতিক চাপের শিকার হতে হয়। কেন্দ্রের অফিস ফ্রেম, কর্ণার চেয়ার, স্ট্যান্ডিং ফ্রেম, স্ট্যান্ডিং স্টিক, টেইলার ব্রেস ইত্যাদি উপকরণগুলো বছর তিনেক আগে একবারই দেয়া হয়, তারপর আর বরাদ্দ আসে নি। মেহেরপুর জেলার পাঠানো প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সেখানকার কর্মকর্তারা জানেই না পরিচালনা কমিটিতে প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা অন্তর্ভূক্ত রয়েছেন কিনা।

 

কেন্দ্রগুলো মূলত ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার ওপরই ভর করে চলছে। আচমকা কেউ প্রতিবন্ধিতার সম্মুখীন হলে শুধু চিকিৎসা নয় শিক্ষা, উপার্জনক্ষম হয়ে উঠার পথ দেখানোর পরামর্শ প্রদান বা অন্যান্য অধিকারভিত্তিক সেবা প্রদান ইত্যাদি বিষয়গুলোতে তারা তেমন গুরুত্ব দেন না। স্বল্প দৃষ্টি ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষ, শ্রবণ ও বাক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও তেমন কোন ব্যবস্থা নেই।

বান্দরবন কেন্দ্রে অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ও ¯িপচ এন্ড ল্যাক্সগুয়েজ থেরাপিস্ট একজন করে থাকার কথা থাকলেও নেই। থেরাপি সহকারীর দুইটি পদই দীর্ঘদিন ধরে খালি। কুমিল্লা প্রতিনিধি জানায়, সেবা প্রদানকারী কর্মকর্তারা সময়মত অফিসে আসেন না এমন অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবেদক উক্ত সেবা কেন্দ্রে গিয়ে দেখতে পান ৯ কর্মকর্তার মধ্যে ৬ জনই অনুপস্থিত। তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও প্রকটভাবে লক্ষণীয়।

 

কেন্দ্রের পরিচালনা কমিটিতে প্রতিবন্ধী মানুষের প্রতিনিধিত্ব নেই। নীলফামারী, নরসিংদী সেবা কেন্দ্রের পরিচালনা কমিটিতে একজন করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সদস্য থাকলেও ঢাকার মিরপুর, কুমিল্লা, মেহেরপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা, রূপসা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, বান্দরবনের প্রতিবন্ধী মানুষের কোন প্রতিনিধিত্ব নেই। যে সব সংগঠন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করে তাদের সাথে সেভাবে স¤পর্ক রাখা হয় না অনেক কেন্দ্রেই। বরঞ্চ এড়িয়ে চলার প্রবণতা রয়েছে এমনও অভিযোগ উঠছে বেশ কিছু কেন্দ্রের বিরুদ্ধে। অবহেলা করে কাজে না লাগানোয় বড় বড় বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার অভিযোগও আছে। কেন্দ্রগুলো থেকে দাবী করা হয় প্রশাসনের অন্যান্য বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, লিফলেট বিতরণ, জরিপ চালানোর মাধ্যমে সেবাকেন্দ্রের প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু সরেজমিনে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। সেবা প্রয়োজন এমন অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি সেবা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শুধু মাত্র সেবা কেন্দ্রের অবস্থান না জানার কারণে। অথচ দিবস ভিত্তিক না হয়ে কিছু সময় পর পর প্রচারণা চালালে অনেকে কেন্দ্রের খোঁজ পেয়ে সেবা নিতে আসতে পারতো।

 

অন্যদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় সাধারণ জনগণের জন্য নানা প্রকল্প গৃহীত হলেও প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্য কেন্দ্র কেন এই খাতের অন্তর্ভূক্ত নয় তা জানা যায় নি। ইতোমধ্যে উপজেলা পর্যায়ে ৬৮টি জেলাতে এবং ৩৯টি উপজেলাতে এই সেবা সাহায্য কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী সব উপজেলাতে এ রকম সেবা সাহায্য কেন্দ্রের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা আছে।