বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকারের কথা

4

 

জামালপুর জেলায় জওয়াহেরুল ইসলাম মামুনের ভরপুর সংসার। ১৯৭৭ সালে যখন প্রথম মেয়ের জন্ম, আর সব পিতার মত তিনিও খুশি। আস্তে আস্তে মেয়ে বড় হতে লাগলো। আর তখনই তার আচরণগত ত্রুটি দেখা দেয়।

 

কুসংস্কারের কারণে কবিরাজ, ঝাড় ফুঁক, জ্বীন ভূত, হাতুড়ে ডাক্তার দিয়ে চিকিৎসা ও তাবীজ কবজ করেছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। জওয়াহেরুল ইসলাম বলেন, ‘সাড়ে চার বছর বয়সেও মেয়ের ব্যবহারে অস্বাভাবিকতা। মারমুখী আচরণ, থুথু দেয়া, দাঁড়িয়ে টয়লেট করে কাপড়-চোপড় নষ্ট করা ইত্যাদি। ৩৯ বছর আগে তখন এই বিষয়গুলো মানুষ বুঝতো না, মনস্তাত্বিক সমস্যা নিয়ে তেমন চিন্তাও করতো না।

মেয়ের জন্মের ৪ বছর পর দুই যমজ ছেলে হলে তিনি ছেলেদের এবং মেয়ের বুদ্ধিমত্তার পার্থক্য ধরতে পারেন। বয়োজ্যেষ্ঠ বন্ধু আ্যাডভোকেট জাহিদ আনোয়ারের পরামর্শে একটি স্কুলে গিয়ে সাইকোলজিস্টদের সাথে কথা বলেন। এসময় তিনি নিশ্চিত হন মেয়ের বুদ্ধিমত্তা কম। তাকে বিশেষ শিক্ষা দিতে হবে। সাইকোলজিস্টদের পরামর্শে মেয়েকে তখন এস.সি.ই.এম.আর (সোসাইটি ফর দি কেয়ার এন্ড এডুকেশেন ফর দি মেনটালি রিটার্ডেড, বাংলাদেশ) নামক স্কুলে ভর্তি করান, যা বর্তমানে সুইড বাংলাদেশ পরিচিত।

 

হোস্টেলে শিশুরা পিতামাতার আদর-স্নেহ থেকে বঞ্চিত হন বলে ঢাকা থেকে জামালপুরে ফিরেন জওয়াহেরুল। সেখানে বন্ধু জাহিদ আনোয়ার সহ আরও বেশ কয়েকজন বন্ধু মিলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে স্কুল চালু করলেন। বিভিন্ন সময় অনেক সাধারণ স্কুলে ভর্তির ব্যর্থ চেষ্টা শেষে মেয়েকেও ভর্তি করালেন সেখানে। তখন থেকে তাকে বর্ণমালা, বাক্য বিন্যাস শিখানোর চেষ্টাও তারা করেন নি। শুধু আচরণবিধি পরিবর্তন, নাচ গান শিখানো কিংবা বিনোদনমূলক কাজের মধ্যে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা করেছেন।

ধীরে ধীরে তার আচরণে পরিবর্তন এলেও অস্থিরতা, আচরণগত সমস্যা রয়েই গেছে। তবুও তিনি সব ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মেয়েকে নিয়ে যেতেন এবং সে খুব উপভোগ করতো। কিন্তু রেগে গেলে অপ্রিয় ঘটনার সৃষ্টি হবে তাই তারা সতর্ক থাকতেন।

আমাদের সমাজে বিশেষত গ্রামের লোকজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখলেও প্রভাবশালী পরিবার হওয়ার কারণে আমার মেয়েটা নিগৃহিত হয় নি। এমন কি প্রতিবেশীরাও বাঁকা দৃষ্টিতে দেখে নি জানান তিনি। কিন্তু তার স্ত্রী বলেন, ‘প্রথম দিকে সবাই খুব বিরক্ত হত। কেউ নিজের সন্তানদের সঙ্গে মিশতে দিতে চাইত না। পরে আমরা বোঝাতে সক্ষম হলে অন্যরা তাকে মেনে নেয়।”

 

জওয়াহেরুল ইসলাম মনে করেন, ঘরের কোণে রেখে দিলে প্রতিবন্ধী শিশুদের সমস্যা আরও বাড়বে। অভিভাবকের ওপরও চাপ পড়বে। এর চেয়ে তাদের যদি সামাজিক অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া, সবার সাথে মিশতে দেয়া হয়, তবে সে মানুষকে জানতে পারবে, বুঝতে পারবে।

নিজের মৃত্যুর পর তাদের প্রতিবন্ধী শিশুরা কিভাবে নিরাপদে জীবন-যাপন করবে, আত্মনিভরশীল হবে এমন চিন্তা অনেক অভিভাবকই করে থাকেন। যেহেতু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী সন্তান হিসেবে সে বঞ্চিত হচ্ছে। এজন্য সরকারি কাঠামোর আওতায় যদি কোন কমিটি থাকে- যেখানে অভিভাবকের প্রতিনিধি, সরকারের প্রতিনিধি মিলে একটি ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠান থাকবে, যা এই শিশুদের পিতামাতার অবর্তমানে দেখবে। কিন্তু এর সমাধান এখনও বাংলাদেশে হয় নি। এমনটাই মতামত জওয়াহেরুল ইসলামের।

 

সুইড বাংলাদেশে এমন কিছু গড়ে তোলা হয়েছে, যার নাম হলো টুইট (ট্রাস্ট ফর দি ওয়েলফেয়ার অব দি ইনটেলেকচুয়াল)। এটি করাই হয়েছে বয়স্ক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী যারা বিশেষ শিক্ষা গ্রহণ করছে, বয়স্ক হয়ে গেছে, তাদের কর্মস্থান ও পুনর্বাসন করা। কিন্তু ট্রাস্ট চালানোর জন্য কোন হৃদয়বান লোক পাওয়া মুশকিল। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষদের যতœ-আÍি তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম দেখাশোনার কাজ করতে সহজে কেউ চায় না।

দারিদ্রতার কারণে অনেকেই তাদের প্রতিবন্ধী শিশুদের বিশেষ স্কুলে ভর্তি করাতে পারেন না। যেহেতু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও এদেশের নাগরিক এবং অন্য সকলের মত তাদেরও শিক্ষার সাংবিধানিক অধিকার আছে, যা পূরণ করা সরকারের দায়িত্ব। এই ক্ষেত্রে সরকার যা করতে পারে সেই বিষয়ে তিনি বেশ কিছু পরামর্শও দেন, প্রথমত, অনগ্রসর জনগোষ্ঠিকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সুস্থ জীবনের গ্যারান্টি সরকারকে দিতে হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা আছেন তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে।

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলো যেমন সুইড বাংলাদেশ ১৯৭৭ সাল থেকেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করছে। জওয়াহেরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের অধিকাংশ সংগঠনই ঢাকা কেন্দ্রিক। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জরিপে ৬ লাখ ২১ হাজার জনের পরিসংখ্যান এসেছে যেখানে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অটিস্টিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, মস্তিষ্ক পক্ষাঘাত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এরমধ্যে আছে। এই মানুষেরা শহরে বাস করে না, তারা থাকে গ্রামে। অন্য সবাই গ্রাম থেকে শহরে এসে পড়াশোনা করতে পারলেও কিন্তু বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষেরা তা পারে না। তাদের স্কুল হতে হবে বাড়ির কাছে। যদিও আপাতত সেই ব্যবস্থা নেই।’

 

সুইড বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে জওয়াহেরুল ইসলাম বললেন, ‘১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. সুলতানা সরোয়ার আমেরিকায় মেন্টাল লিটারেসি-এর উপর পিএইচডি করেন। তিনি দেশে ফিরে এসে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার নাম দেন সোসাইটি ফর দি কেয়ার এন্ড এডুকেশন ফর দি মেন্টালি রিটারডেড চিলড্রেন (এসসিইইএমসি)।

তিনি জানান, উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষক রাধা বল্লভ সাহা তার স্কুলের একটি রুম দিলেন। সেখানেই সাত জন শিশু নিয়ে কাজ শুরু। সাথে ছিলেন জোহরা রহমান, সালমা হক, কাজী আমিনুল হক, দেব প্রিয় পাল এবং রাধা বল্লভ সাহা। ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে এটি সমাজসেবার নিবন্ধন পেল।

 

১৯৮২ সালে একটি নরওয়ের সংগঠন এসে আমাদের কাজ দেখে খুশি হয়ে চুক্তি করল। তাদের সহযোগিতায় সুইড বিস্তৃত হতে হতে আজ বাংলাদেশে আমাদের ১২৪ টি স্থানে স্কুল, সমিতি, শাখা ইউনিট আছে। আমাদের পরিকল্পনা প্রতি দশ কিলোমিটার পর পর স্কুল করার। সমিতি ইউনিট হয় এবং ৬ লাখ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে সেবা দিতে গেলে কমপক্ষে সাড়ে পাঁচ হাজার স্কুল লাগবে।

সরকারি সহযোগিতা প্রাপ্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘১৯৯৬ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫০ টি স্কুলের শিক্ষক, কর্মচারী, প্রধান কার্যালয়ে সাইকোলজিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট তাদের শতভাগ বেতন ভাতা আমরা সরকার থেকে পাই। যা শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালে।

 

বুদ্ধি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিনের কাজের সফলতা সম্পর্কে জওয়াহেরুল ইসলাম বলেন, ‘বিষয়টা দুইভাবেই দেখা যায়। আমরা ১৯৭৭ সালে যখন শুরু করি তখন আমাদের কথাই কেউ শুনতো না। সেই তুলনায় সরকার এখন আমাদের কথাগুলো শুনছে, ভাবছে, বেতন ভাতা দিচ্ছে। যেখানে কোন আইন-কানুন ছিলো না সেখানে এখন সরকার প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আইন তৈরি করেছে। যারা স্কুল কলেজে পড়ছে তাদের উপবৃত্তি দেয়া হচ্ছে। সে হিসেবে আমরা অনেকটা সফল। আবার যদি সারা দেশের ৬ লাখ মানুষের কথা চিন্তা করি তাহলে তো একেবারে কম।

সবশেষে, বাংলাদেশের নাগরিক অধিকার বঞ্চিত প্রতিবন্ধী সন্তানের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘নিজের জন্য প্রথমে নিজেকেই চেষ্টা করতে হবে। সেই চেষ্টায় কোন ত্রুটি রাখা যাবে না। সরকারি যা সুযোগ সুবিধা আছে তার খোঁজ খবর নিতে হবে। সরকার যেন আরও বেশি তৎপর হয় সেজন্য সরকারের সাথে কাজ করতে হবে। কারণ আইন যতই থাকুক বাবা মাকেই সে অনুযায়ী পদক্ষেপ ফেলতে হবে। সবাই মিলেমিশে একত্রে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

 

সাক্ষাৎকার – সৈয়দ কামরুজ্জামান রিপন

অনুলিখন – সাজিয়া আফরিন